• Categories

  • Archives

  • Join Bangladesh Army

    "Ever High Is My Head" Please click on the image

  • Join Bangladesh Navy

    "In War & Peace Invincible At Sea" Please click on the image

  • Join Bangladesh Air Force

    "The Sky of Bangladesh Will Be Kept Free" Please click on the image

  • Blog Stats

    • 315,259 hits
  • Get Email Updates

  • Like Our Facebook Page

  • Visitors Location

    Map
  • Hot Categories

বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব

মেজর ফারুক (অবঃ)

ভূমিকা

 

নির্দিষ্ট সীমান্ত একটি রাস্ট্রের মৌলিক বৈশিষ্টের কয়েকটির মধ্যে অন্যতম। সুনির্দিষ্ট সীমান্ত বিহীন কোন রাস্ট্রের অস্তিত্বই কল্পনা করা যায়না। এজন্য একটি রাস্ট্রের পক্ষে – সীমান্ত চিহ্নিত করে তার যথাযথ সংরক্ষন যেমন জরুরী, তেমনি জরুরী – সে সীমান্তের মধ্য দিয়ে যে কোন বহিঃশক্তির আগ্রাসন, অনুপ্রবেশ, অবাধ চলাচল, চোরাচালান, মানব পাচার ইত্যাদি প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রন করা।

 

সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের ভূখন্ডকেই আমরা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর থেকে স্বাধীন ভূমি হিসেবে লাভ করেছি।

https://i1.wp.com/newsleaks.in/wp-content/uploads/2011/05/Indo-Bangladesh-flag.jpg

১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা স্বাক্ষরিত সীমান্ত চুক্তি মোতাবেক বাংলাদেশের বেরুবাড়ী ছিটমহলটি সংবিধান সংশোধন করে ভারতকে হস্তান্তর করা হয়; বিনিময়ে ভারত বাংলাদেশকে তার ছিটমহল আংগরপোতা-দহগ্রামে যাবার জন্য ৩ বিঘা করিডোর হস্তান্তরের কথা ছিল; কিন্তু গত ৪০ বছরেও ভারত সেই ৩ বিঘা করিডোর বাংলাদেশকে হস্তান্তর করেনি।

https://i0.wp.com/www.thedailystar.net/forum/2007/october/tin06.jpg

https://i2.wp.com/exclave.info/Tin-Bigha/tinbighamap.jpg

 

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চুক্তি স্বাক্ষর করেও সে চুক্তিকে অমান্য করা এবং প্রতিবেশী দেশের উপর অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, প্রাকৃতিক, সামরিক, রাজনৈতিক, কুটনৈতিক ইত্যাদি নানাবিধ বৈরী আচরন করে লক্ষ্যস্হ প্রতিবেশীকে তার নিয়ন্ত্রনে রাখার কৌশল অবলম্বন – ভারতের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্য চানক্য কুটনীতির বিষয় বলেই প্রতীয়মান।

 

আর ভৌগোলিকভাবে ৩ দিক থেকেই ভারত দ্বারা পরিবেষ্টিত বিধায় ভারতের বৈরী আচরন ও আগ্রাসনের শিকার বাংলাদেশ।

 

সীমান্তে আগ্রাসন

 

সীমান্তে ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশ যে সব বৈরী আচরণের শিকার হচ্ছে- তার কিছু উদাহরন হলোঃ

 

(১) সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশী মানুষ হত্যা করা।

(২) সীমান্ত দিয়ে মাদক দ্রব্য ও বেআইনী অস্ত্র পাচার করা।

(৩) সীমান্ত দিয়ে ব্যাপক চোরাচালান।

(৪) সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ করে অপহরণ, ধর্ষণ, নির্যাতন ইত্যাদি অপরাধ করা।

(৫) বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নিরাপত্তা চৌকিতে হামলা করা যেমন- রৌমারীতে তকালীন বিডিআর পোস্টে আক্রমন করা হয়েছিল।

(৬) বাংলাদেশের সীমান্ত সংলগ্ন ভূমি দখল করা।

(৭) বাংলাদেশের সমূদ্র সীমায় জাগরিত তালপট্টি দীপ দখল করন।

(৮) বাংলাদেশের সমূদ্র সীমার দুই-তৃতীয়াংশ জুড়ে ভারতের অবৈধ দাবী উত্থাপন।

(৯) বছরে প্রায় ২২০০০ নারী ও শিশুকে পাচার করে তাদেরকে ভারতের বিভিন্ন পতিতালয়ে এবং কল-কারখানায় দাস হিসেবে ব্যবহার করা।

(১০) বেরুবারীর বদলে তিন বিঘা করিডোর হস্তান্তর না করা-ইত্যাদি।

 

বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে আঘাত স্বরুপ যে-সব কর্মকান্ড ভারত এ যাবত গ্রহণ করেছে সেগুলো হলোঃ

 

(১) ১৯৭১ সালেই মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারত বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারকে বাধ্য করে ৭ দফা চুক্তি স্বাক্ষরে- যার মাধ্যমে বাংলাদেশের মর্যাদা একটি সার্বভৌমত্বহীন রাস্ট্রে নামিয়ে আনা হয়।

 

(২) ১৯৭১ সালে ৯ মাস  ব্যাপী মুক্তিযুদ্ধে আমাদের লক্ষাধিক মুক্তিসেনা এবং পুরো জাতি যে সংগ্রাম ও ত্যাগ তিতীক্ষা বরন করেছে তাকে অস্বীকার করে পাকিস্তানী বাহিনীকে পরাজিত করার একক দাবীদার হিসেবে ভারত নিজেকে আবির্ভূত করে । কিন্তু বাস্তবতা হলো এই যে- বাংলাদেশের লক্ষাধিক মুক্তিযোদ্ধা এবং পুরো জাতি মিলে পাকিস্তানী বাহিনীকে পর্যুদস্ত না করলে এবং যৌথ বাহিনীকে সমর্থন না করলে – ভারত কোন দিনই পাকিস্তানী বাহিনীকে পরাস্ত করতে পারতো না।

 

(৩) মুজিব-ইন্দিরা স্বাক্ষরিত ২৫ বছরের গোলামী চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও পররাস্ট্র নীতি ভারতের উপর নির্ভরশীল করা হয়েছিল।

 

(৪) ভারত ১৯৭৫ সালের পর কাদেরীয়া বাহিনীকে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় দীর্ঘদিন যাবত হামলা পরিচালনায় সহায়তা দিয়েছে।

 

(৫) ভারতের কোলকাতায় বসে ‘বঙ্গভুমি আন্দোলন’ নামক বাংলাদেশ বিরোধী বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ মিটিং মিছিল ও সভা–সমাবেশ করে, যাদের দাবী – বাংলাদেশের দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলে একটি হিন্দু রাস্ট্র গঠন করা।

 

(৬) ভারত বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী চাকমা সন্ত্রাসীদেরকে দীর্ঘদিন যাবত অস্ত্র, গোলাবারুদ, রসদ, আশ্রয় ও প্রশিক্ষণ দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় ৩৫০০০ মানুষকে হত্যা করতে সহায়তা করেছে। ভারতের মাটিতে বসে তারা আজো বাংলাদেশ বিরোধী প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে। বাস্তবে এটি হলো বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের প্রক্সি যুদ্ধ।

 

(৭)  ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী কর্তৃক পাখির মত গুলি করে বাংলাদেশী নাগরিকদের হত্যা করা হয়। মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী – ২০০০ সালের জানুয়ারীর প্রথম থেকে চলতি ২০১১ সালের আগষ্টের ৩১ তারিখ পর্যন্ত ভারত ৯৯৮ জনকে হত্যা, ৯৯৬ জনকে আহত,  ৯৫৭ জনকে অপহরন, ২২৬ জনকে গ্রেফতার এবং ১৪ জনকে ধর্ষণ করেছে।

 

(৮) ভারত বাংলাদেশকে কাঁটাতারের বেড়া দ্বারা ঘিরে ফেলে পৃথিবীর বৃহত্তম কারাগারে পরিণত করেছে।

 

(৯) ভারত বাংলাদেশে প্রবেশকারী ৫৪ টি আন্তর্জাতিক নদীর উপর বাঁধ নির্মাণ করেছে এবং টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে- যা বাংলাদেশের বৃহত্তম সিলেট অঞ্চলকে মরুভুমিতে পরিণত করবে।

 

(১০) ভারত ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে গঙ্গা নদীর পানি উজানে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী সরকার গ্যারান্টি ক্লজ ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্ততার বিধান ছাড়াই গঙ্গা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে কিন্তু এযাবত কোন বছরেই ভারত বাংলাদেশকে পানির ন্যায্য হিস্যা দেয়নি। এছাড়া, একসাথে ফারাক্কার সবগুলো গেইট খুলে দিয়ে প্রতি বছর বাংলাদেশে কৃত্রিম বন্যা সৃষ্টি করছে। ফারাক্কা বাঁধের কারনে বাংলাদেশের নদীতে নাব্যতা কমে অনেক নদী সরু খালে পরিনত হয়েছে; উত্তরাঞ্চলে দেখা দিয়েছে মরুকরণ,আর্সেনিকে আক্রান্ত হয়েছে প্রায় অর্ধ কোটি মানুষ।

 

(১১) ভারত হাসিনা সরকারের সহায়তায় বাংলাদেশকে তার গোয়েন্দা বাহিনীর বিচরণ ক্ষেত্রে পরিণত করেছে; বাংলাদেশের ভিতর থেকেই ‘র’ এর সদস্যরা এখন হরহামেশা মানুষ ধরে নিয়ে যায়।

 

(১২) ভারত ‘ব্যাগ ভরতি টাকা এবং মন্ত্রনা’ দিয়ে বাংলাদেশের গত নির্বাচন তথা রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছে বলে লন্ডনের ‘ইকোনোমিষ্ট’ পত্রিকা তথ্য বের করেছে।

 

(১৩) ভারত জেএমবি নামক উগ্রবাদী গোষ্ঠী তৈরীতে মদদ দিয়ে বাংলাদেশকে তথাকথিত ইসলামী জঙ্গীদের দেশ হিসেবে বহিঃর্বিশ্বে উপস্থাপন করতে চায়।

(১৪) ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল বলে ভারতীয় লেখকেরাই এখন স্বীকার করছেন।

https://i0.wp.com/www.zyzyo.com/wp-content/uploads/2010/11/Research-and-Analysis-Wing-of-India.jpg

ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা 'র'

(১৫) বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বিরোধী করিডোর সুবিধা আদায়ের উদ্দেশ্যে ভারত  ‘সহযোগিতার জন্য কাঠামো চুক্তি’ স্বাক্ষর করেছে এবং বাংলাদেশের সকল সেক্টরে অনুপ্রবেশের সুযোগ হাতিয়ে নিয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব দারুনভাবে ব্যাহত হবে।

 

(১৬) ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের স্বাধীনতা আন্দোলন দমন এবং বিতর্কিত অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে চীনের সাথে সম্ভাব্য সংঘর্ষে বাংলাদেশের ভূমিকে ব্যবহার করার পরিকল্পনা নিয়ে তার সামরিক কার্যক্রমে বাংলাদেশকে জড়িয়ে ফেলার পরিকল্পনা নিয়েছে- এবং এ উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের বুক চিড়ে তার সামরিক বহর চলাচলের জন্য করিডোর সুবিধা আদায় করেছে।

 

(১৭) বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশী নাগরিকদের হত্যা করা হলেও সেসব হত্যাকান্ডকে স্বাভাবিক মৃত্যু বলে আক্ষায়িত করার জন্য ভারতীয় বিএসএফ প্রধান ঢাকায় বসে নছিহত করে গেছেন।

 

সরকারের প্রতি প্রস্তাবিত আহবানঃ

 

ভারতের উপরোল্লেখিত আচরনের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য সরকারের প্রতি নিম্নোক্ত আহবান জানানো জরুরীঃ

 

(ক) সীমান্তে হত্যা, নির্যাতন, অপহরন, ধর্ষণ ইত্যাদি মানবাধিকার লংঘনের বিরুদ্ধে শক্ত কুটনৈতিক প্রতিবাদ জানানো এবং এসব অপরাধ বন্ধ না হলে জাতিসংঘের শরণাপন্ন হওয়া;

https://i1.wp.com/www.shahidulnews.com/wp-content/uploads/2011/01/felani.jpg

(খ) সীমান্তে ভূমি দখল, সশস্ত্র আগ্রাসন এবং সামরিক স্থাপনা নির্মান থেকে ভারতকে বিরত রাখা এবং কোন ভূমি ভারতের কাছে হস্তান্তরকরণ থেকে বিরত থাকা;

 

(গ) বাংলাদেশের অর্থনীতি, কৌশলগত নিরাপত্তা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব পরিপন্থী করিডোর প্রদানের কার্যক্রম থেকে ফিরে আসা;

 

(ঘ) গঙ্গা পানি চুক্তি অনুসারে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহন, টিপাইমূখ বাঁধ নির্মানে ভারতকে বিরত রাখা, স্থল ও সমূদ্র সীমানায় ভারতকে অন্যায্য দাবী-দাওয়া তোলা থেকে বিরত রাখা এবং ফারাক্কা বাঁধের কারনে ক্ষতিপূরন আদায়ের ব্যবস্থা নেয়া;

https://i0.wp.com/beaverdamsss.com/wp-content/uploads/2011/09/Tipaimukh-Dam.jpg

প্রস্তাবিত টিপাইমূখ বাঁধ

 https://i2.wp.com/www.globalwebpost.com/farooqm/writings/bangladesh/farakka/farakka.jpg

(ঙ) মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি অনুযায়ী ১৯৭৪ সালে বেরুবাড়ী হস্তান্তরের বিনিময়ে ৩ বিঘা করিডোর সম্পূর্নভাবে বিনিময় করতে এবং তালপট্টি দ্বীপ ভারতের দখলমুক্ত করতে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহন;

https://wakeupbd.files.wordpress.com/2011/10/location.gif?w=226

(চ) সীমান্তে চোরাচালান ও মানব পাচার বন্ধকরণ; এযাবত বিএসএফ এর হাতে ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য আন্তর্জাতিক নিয়মানুসারে ক্ষতিপূরন আদায়ের ব্যবস্থা করন;

 

(ছ) ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যসমূহে চলমান স্বাধীনতা আন্দোলন দমনে এবং চীনের সাথে ভারতের সম্ভাব্য কোন সামরিক সংঘর্ষে বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহারের ভারতীয় পরিকল্পনার অংশ হওয়া থেকে বিরত থাকা;

 

(জ) পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদীদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা দান থেকে বিরত থাকতে প্রতিবেশী রাস্ট্রের সাথে দক্ষ কুটনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহন;

 

(ঝ) তিস্তার পানি বন্টন চুক্তিকে করিডোর প্রদানের সাথে সম্পরকিত না করা এবং ভবিষ্যতে তিস্তা চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার ব্যবস্থা রাখা;

 

(ঞ) পিলখানায় ৫৭ জন অফিসারকে হত্যার পেছনের ষড়যন্ত্রকারীদেরকে সনাক্ত করতে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহন এবং সীমান্তের ৮ কিঃ মিঃ এলাকা থেকে পুলিশ-র‍্যাব তুলে এনে সীমান্তকে আরো অরক্ষিত করা থেকে বিরত থাকা;

 

( ট) বাংলাদেশে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর সকল কার্যক্রম বন্ধ করা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীন রাজনীতিতে ‘ব্যাগভরতি টাকা ও শলাপরামর্শ’ দিয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে ভারতকে বিরত রাখা।

 

(ঠ) সদ্য স্বাক্ষরিত ‘সহযোগিতার জন্য কাঠামো চুক্তি’ অনুসারে বাংলাদেশের সকল সেক্টরে ভারতীয় অনুপ্রবেশের সুযোগ সৃষ্টিকরন থেকে বিরত থাকা।

 

তারিখঃ ১৬ অক্টোবর ২০১১।

ইমেইলঃ farukbd5@yahoo.com

//  

 

অবৈধ আয় হারাবে বলে পুলিশ র‍্যাবে আসতে চায় না: বারী

https://i2.wp.com/www.bdreport24.com/wp-content/uploads/2010/12/wikileaksEditB201012041557132.jpg

আড়াই লাখ মার্কিন তারবার্তা ফাঁস করেছে উইকিলিকস। মার্কিন কূটনীতিকদের ভাষ্যে এসব তারবার্তায় বেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশের রাজনীতি ও ক্ষমতার অন্দরমহলও

সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের সাবেক কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল চৌধুরী ফজলুল বারী বলেছিলেন, ঘুষসহ অন্যান্য আয়ের সুযোগ কমে যাবে বলে পুলিশ থেকে র‍্যাব বাহিনীতে আসার আগ্রহ কম।

[prabasher_news_06102009_0000001_gen_bari.png]

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল চৌধুরী ফজলুল বারী

২০০৬ সালে ডিজিএফআইএর কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর পরিচালক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে এক সম্মেলনে যোগদানের সময় মার্কিন এক কর্মকর্তাকে এ কথা বলেছিলেন ব্রিগেডিয়ার বারী। উইকিলিকসের ফাঁস করা মার্কিন দূতাবাসের কূটনৈতিক তারবার্তায় এ কথা বলা হয়েছে। ফাঁস হওয়া ওই তারবার্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালের এপ্রিলে হাওয়াইতে অনুষ্ঠিত পিএএসওসি সম্মেলন চলার সময় মূল অনুষ্ঠানের বাইরে সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী দূতাবাস কর্মকর্তার সঙ্গে বারীর খোলামেলা কথাবার্তা হয়। বারী এ সময় র‍্যাব গঠনের সময় থেকে এ বাহিনীর বিষয়ে তাঁর বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ও জঙ্গিগোষ্ঠী জেএমবির তৎপরতা নিয়ে কথা বলেন। প্রসঙ্গত, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বারী একসময় র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) উপপ্রধান ছিলেন।

তারবার্তার তথ্যমতে, মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনায় বারী উল্লেখ করেন, র‍্যাব গঠনের প্রাথমিক পরিকল্পনার সময় তিনিও উপস্থিত ছিলেন। প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল র‍্যাব সামরিক বাহিনী থেকে ৪৪ শতাংশ, পুলিশ বাহিনী থেকে ৪৪ শতাংশ ও বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) থেকে ১২ শতাংশ জনবল নেওয়া হবে। কিন্তু পুলিশ বাহিনীতে এই কোটা পূরণে অনীহা ছিল। কারণ, ঘুষ ও অন্যান্য অবৈধ কার্যকলাপের মাধ্যমে তারা ‘বাইরে থেকে আরও বেশি অর্থ আয় করে’। বারী দাবি করেন, জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তারা তাঁদের দপ্তরে বসে থাকতেই বেশি আগ্রহী।

https://i2.wp.com/media.somewhereinblog.net/images/sammobadiblog_1260524740_1-rab.jpg

র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব)

বারী বলেন, পুলিশ বাহিনী একটি ‘বিশাল পিরামিড স্কিমের’ মতো কাজ করে, যাতে মাঠপর্যায়ের কর্মীরা অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে পৌঁছে দেন। জেএমবির প্রধান শায়খ আবদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করতে পুলিশের ব্যর্থ হওয়ার একটি কারণ দুর্নীতি বলে মন্তব্য করেন তিনি। বারী অভিযোগ করেন, র‍্যাবে অনেক সময় পুলিশের এমন জনবল দেওয়া হয়, যাঁদের সঠিকভাবে গুলি চালানোর মতো মৌলিক দক্ষতাও নেই। বিশেষ অভিযানের জন্য তাঁদের নেই কোনো প্রশিক্ষণ। অনেকে শারীরিকভাবেও উপযুক্ত নন।

https://i1.wp.com/www.sonarbangladesh.com/blog/uploads/Tirzok201107231311415065_nnb2195147.jpg

বাংলাদেশ পুলিশ

তারবার্তায় আরও বলা হয়, এর আগে ২০০৫ সালের জুন মাসে মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় বারী বলেছিলেন, ক্রসফায়ার ‘দরকারি এবং স্বল্প মেয়াদে উপযোগী এক কৌশল’। তারবার্তায় বলা হয়, বারী জানান, তিনি ডিজিএফআইয়ের কর্মকর্তা হিসেবে জেএমবির নেতা শায়খ আবদুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় অনেকবার উপস্থিত ছিলেন। তিনি জেএমবি প্রসঙ্গে মার্কিন কর্মকর্তাকে বলেন, এর নেতা শায়খ আবদুর রহমান পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের কাছে বিস্ফোরক তৈরি এবং একে ৪৭ রাইফেল চালনার প্রশিক্ষণ নেন। আইএসআই শায়খ রহমানকে কাশ্মীরে ব্যবহার করতে চেয়েছিল।

https://i1.wp.com/samakal.com.bd/admin/news_images/676/image_676_152160.jpg

বারী জানান, জিজ্ঞাসাবাদে শায়খ রহমান ১৭ আগস্ট দেশব্যাপী বোমা হামলা প্রসঙ্গে বলেন, ‘পটকাবাজির বিরুদ্ধে কোনো আইন নেই। এসব বোমার ভেতরে কোনো স্প্লিন্টার ছিল না, কীভাবে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনবেন?’ তারবার্তায় বলা হয়, শায়খ রহমানের এই যুক্তিতে সহানুভূতি প্রকাশ করে বারী মার্কিন কর্মকর্তাকে বলেন, বিস্ফোরণের আঘাতে নয়, ওই দিন আতঙ্কিত হয়ে দুজন নিহত হয়।

বারী আরও বলেন, দেশব্যাপী বোমা হামলার ঘটনায় ৭০ জনকে গ্রেপ্তার করা হলে জেএমবির নেতা-কর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়। এর জবাব দেওয়ার জন্য প্রচণ্ড চাপ আসে শায়খ রহমানের ওপর। এর পরিপ্রেক্ষিতেই অক্টোবরে আদালতে হামলা চালায় জেএমবি।

পুলিশের বিষয়ে ব্রিগেডিয়ার বারীর কথিত এই অভিযোগের ব্যাপারে গতকাল পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) হাসান মাহমুদ খন্দকারের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।

সূত্রঃ

https://i2.wp.com/www.prothom-alo.com/secured/theme/public/newdesign/style/images/prothom-alo-logo.jpg

Britain complicit in extreme torture

Source : PressTV

British authorities have collaborated with Bangladeshi security forces to hunt British nationals and interrogate them outside the country in secret bases where inmates are known to have died under torture.

Guardian quoted sources in both countries as saying London used Bangladeshi intelligence agencies and police forces to cross-examine suspects with dual British-Bangladeshi nationality in operations during which a number of detainees became victims of extreme forms of abuse.

In one of the meetings between British and Bangladeshi officials, former Home Secretary Jacqui Smith met officials of Bangladeshi Directorate-General of Forces Intelligence (DGFI) which was criticized for its human rights record by the Human Rights Watch just about two months earlier.

According to a DGFI officer, Smith, whose department had earlier reported prevalent torture in Bangladesh, privately called on the agency, during the meeting, to examine the case of several people whom she described as suspicious.

Reports said a number of British suspects became subject to torture in the secret interrogation center known as the Task Force for Interrogation cell (TFI).

The inmates reported horrific torture methods including being forced to stand still for six days with their hands chained to bars above their heads, receiving electric shocks and even being strapped to a chair while a drill was slowly driven into their bodies.

This is while Smith’s own department had mentioned the very torture methods used on the victims as commonplace practice by the DGFI.

MI-6

MI-5

Reports claimed of MI6 and MI5’s complicity in the interrogation and torture cases sanctioned by senior government officials including Smith, former foreign secretary David Miliband and former Home Secretary Alan Johnson.

RAB

This comes as earlier WikiLeaks cables revealed the British government trained the Bangladeshi rapid action Battalion (RAB), also involved in the torture cases.

RAB, which were described as a “death squad” by the Human Rights Watch, were blamed for hundreds of extra-judicial killings and human rights violation cases before receiving training by Britain.

AMR/HE

Britain trains Bangladeshi torturers: New evidence

Source : Socialist Worker Online

Further evidence has come to light of the relationship between British governments and a Bangladeshi paramilitary death squad.

A leaked US embassy cable showed that the Rapid Action Battalion (RAB), responsible for hundreds of murders, received British training in “investigative interviewing techniques”.

It has emerged that British authorities passed information about British nationals to the group—while they were held at a secret interrogation centre where inmates have died under torture.

Gulam Mustafa, from Birmingham, was beaten and tortured with electric shocks.

According to the Guardian newspaper, Bangladeshi police officers say his arrest had been at the request of MI6.

Former Labour ministers Jacqui Smith, Alan Johnson and David Miliband all have questions to answer over torture in Bangladesh.

The foreign office says the British government continues to “provide a range of human rights assistance” in the country.

বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং বিদেশে বাংলাদেশের ইমেজ

Source : Bangladeshi-Americans Living in New England

অবশেষে কি মার্কিন কূটনীতিতে সূর্যোদয় হলো? বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষী বাহিনীগুলোর হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যা বিগত দু’বছরে বিশ্বব্যাপী একটি বহুল আলোচিত প্রসঙ্গ। লন্ডন-ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্খা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, নিউইয়র্ক-ভিত্তিক হিউম্যান রাইটওয়াচ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং দেশী ও বিদেশী মানবাধিকার সংস্খাগুলো এবং কর্মীরা মূলত র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র‌্যাবের হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যার সমালোচনা করেছেন এবং প্রতিকার দাবি করেছেন। এমনকি মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক বার্ষিক রিপোর্টেও এসব হত্যার সমালোচনা করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিকার কিছু হয়নি।

ঢাকার সরকারের মন্ত্রীরা, বিশেষ করে দুর্মুখ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বারবার মিথ্যা কথা বলেছেন, দাবি করেছেন যে বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যার কোনো ঘটনা ঘটেনি এবং ঘটছে না। কিন্তু দৈনিক পত্রিকাগুলোতে প্রায় প্রতিদিনই তথাকথিত ক্রসফায়ারে হত্যার খবর বেরোচ্ছে। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী র‌্যাবের ক্রসফায়ারে মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে গেছে। র‌্যাবও এ জাতীয় প্রায় সাড়ে ৬০০ হত্যার কথা স্বীকার করেছে। কিন্তু যেসব বিদেশী শক্তি নানা ধরনের মদদ দিয়ে বর্তমান সরকারকে গদিতে বসিয়েছে এবং টিকিয়ে রাখছে এসব অবৈধ হত্যা বন্ধ করতে সরকারকে বাধ্য করার কোনো চেষ্টা তারা করেনি। বস্তুত কোনো রকম উচ্চবাচ্যই তারা করেনি।

এমতাবস্খায় হঠাৎ করে মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি মুখ খুলেছেন। রোববার ২ জানুয়ারি তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, র‌্যাব ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষী বাহিনীর হাতে যারা মারা গেছে, তাদের বিষয়ে মানুষের জানার অধিকার আছে, সরকারের উচিত এসব হত্যাকাণ্ড সম্বন্ধে তদন্ত করা।

বাংলাদেশে যে এসব বিচারবহির্ভূত হত্যা ঘটছে, রাষ্ট্রদূত মরিয়ার্টি কি সেটা নতুন করে আবিষ্কার করলেন? বাংলাদেশের ইংরেজি দৈনিক পত্রিকাগুলোতেও নিয়মিত এসব খবর প্রকাশিত হচ্ছে। তা ছাড়া ভরসা করে বলতে পারি, ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে খবরাদি ইংরেজিতে অনুবাদ করার জন্যও যথেষ্ট কর্মচারী আছেন। মার্কিন দূতাবাস ও মার্কিন সরকার যদি যথেষ্ট চাপ দিত, তাহলে বাংলাদেশ সরকার যে তাতে কান দিত না, এমন কথা বিশ্বাস করা কঠিন। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধান দু’টি সমর্থক দেশের একটি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। তা ছাড়া যে প্রক্রিয়ায় এ সরকার ক্ষমতা পেয়েছে তাতে জেমস মরিয়ার্টি ও তার পূর্বসূরি হ্যারি টমাস ভারতের দুই হাইকমিশনার বীনা সিক্রি ও পিনাক চক্রবর্তীর সাথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন বলে বাংলাদেশের মানুষের জানা আছে।

বাংলাদেশের মানুষের অবশ্যই সন্দেহ হবে, মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এই আকস্মিক বোধোদয়ের পেছনে অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে। উইকিলিকস ব্লগ সম্প্রতি ফাঁস করে দিয়েছে, ২০০৮ সাল থেকে ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা র‌্যাবকে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের জেরা করার টেকনিক সম্বন্ধে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে এবং এ ব্যাপারে মার্কিন কর্মকর্তারাও ভূমিকা রাখছেন।

আরো কিছু তথ্য এ ব্যাপারে প্রাসঙ্গিক হবে। ব্রিটেনের সর্বোচ্চ আদালত গত বছর বিনইয়ামিন মোহাম্মদ এবং আরো কয়েকজনকে কয়েক লাখ পাউন্ড করে ক্ষতিপূরণ মঞ্জুর করেছে। বিনইয়ামিন মোহাম্মদের জন্ম ইথিওপিয়ায়। তিনি ব্রিটেনে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেন এবং স্খায়ী বসতির অনুমতি পান। ২০০২ সালে পাকিস্তানে বেড়াতে গেলে তাকে গ্রেফতার করা হয়। বিনইয়ামিন অভিযোগ করেন যে, তাকে জেরা করার সময় ব্রিটিশ গোয়েন্দা বাহিনীর কর্মকর্তাদের উপস্খিতিতে তার ওপর দৈহিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। পরে তাকে মার্কিন গোয়েন্দা বাহিনীর হাতে সোপর্দ করা হয়। প্রথমে মরক্কোয় সিআইএ’র গোপন ঘাঁটিতে তাকে জেরা ও তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। পরে তাকে কিউবার উপকূলে গুয়ানতানামো মার্কিন বন্দিশিবিরে আটক রাখা ও নির্যাতন করা হয়।

মোট সাত বছর বন্দী থাকার পর সন্ত্রাসী কার্যকলাপের প্রমাণের অভাবে তাকে মুক্তি দেয়া হয় এবং বিনইয়ামিন ব্রিটেনে ফিরে আসেন। তার মতো অন্য আরো যে ডজনখানেক লোক ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন তাদের অভিজ্ঞতাও অনুরূপ। সবাই অভিযোগ করেছেন, সন্ত্রাসী সন্দেহে তাদের গ্রেফতার ও নির্যাতন করা হয়, কিন্তু তারা সন্ত্রাসী কার্যকলাপে লিপ্ত ছিলেন বলে প্রমাণ করা যায়নি। তাদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, তাদের ওপর নির্যাতনের ব্যাপারে ব্রিটিশ গোয়েন্দারা যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ’র গোয়েন্দাদের সাথে সহযোগিতা করেছিল।

অতীতের বহু অপকর্ম

মার্কিন ও ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব মধ্যপ্রাচ্যে সনাতনী। এ এলাকার সামরিক গুরুত্ব এবং জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য এ দু’টি শক্তি অতীতে বহু অপকর্ম করেছে। বিশেষ করে ১৯৫৩ সালে ইরানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ড. মোসাদ্দেকের সরকারকে উৎখাত করে শাহের স্বৈরশাসন ফিরিয়ে আনার জন্য ইরানিরা কখনো ব্রিটিশ ও মার্কিন ভূমিকাকে ক্ষমা করতে পারেনি। ইরানে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবকে নস্যাৎ করার লক্ষ্যে ওয়াশিংটনের সাহায্য আর উসকানিতেই সাদ্দাম হোসেন ১৯৮০ সালে ইরান আক্রমণ করেছিলেন বলে ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয়। আট বছর স্খায়ী এ যুদ্ধে প্রায় এক কোটি ইরানি মারা গিয়েছিল। কিন্তু ২০০৩ সালের ২০ মার্চ আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন ইরাক আক্রমণ করে। সে অবৈধ যুদ্ধের দুটো কারণ ছিল। প্রথমত, ওয়াশিংটন ইরাকি তেলের নিয়ন্ত্রণ সুনিশ্চিত করতে চেয়েছিল। দ্বিতীয়ত, ইসরাইল মনে করছিল যে, সাদ্দাম হোসেন তাদের আধিপত্যবাদের প্রতি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তাই তেলআবিব আর ওয়াশিংটন সাদ্দাম হোসেনকে গদিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেয়।

আরব বিশ্বে মার্কিনবিরোধী মনোভাব সর্বজনীন হয়ে দাঁড়ায় ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে দখল করা ফিলিস্তিনি ভূমি থেকে সরে যেতে ইসরাইলের অস্বীকৃতি এবং এ ব্যাপারে ইসরাইলের প্রতি মার্কিন সরকারের অন্ধ সমর্থনের কারণে। দীর্ঘদিনের ব্যর্থ প্রতিবাদ অরণ্য রোদনে পরিণত হওয়ায় সত্তর দশকের শুরুতে ফিলিস্তিনিদের একাংশ ইসরাইল ও মার্কিনবিরোধী সন্ত্রাস শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রে এবং ইউরোপে জায়োনিস্ট লবি ও তাদের দোসররা প্রকৃত কারণ চাপা দিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রচার চালায় যে, ইসলাম ধর্মের ইহুদি ও খ্রিষ্টানবিরোধী বৈরিতাই এসব সন্ত্রাসের জন্য দায়ী। তারা অন্তর্নিহিত সমস্যাটির সমাধানের পরিবর্তে ক্রমেই আরো বেশি ইসলামবিরোধী তৎপরতা চালায়। বিচিত্র নয় যে, আরব বিশ্বের ক্রোধ আর ঘৃণা ক্রমেই বেড়ে চলেছে।

ইসলামবিরোধী যুদ্ধ

নিউইয়র্ক আর ওয়াশিংটনে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের (৯/১১) সন্ত্রাসের পরপরই ইসরাইলের দু’জন নেতা এহুদ বারাক আর বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু ইউরোপ আর আমেরিকায় প্রচার করে বেড়ান যে, ‘ইসলামি সন্ত্রাস জুডিয়ো-খ্রিষ্টান সভ্যতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে’। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ আর তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার সে মিথ্যা বিশ্লেষণ লুফে নেন। ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর আফগানিস্তান আর ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন এবং তাদের বশংবদ দেশগুলো ‘ইসলামি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে’ যুদ্ধ ঘোষণা করে। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেনে ও ইউরোপের আরো কোনো কোনো দেশে মুসলিম নির্যাতন শুরু হয়ে যায়। ইসলামবিরোধী রাজনীতিকরা ইসলামের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রচারণা শুরু করেন। কোনো কোনো দেশে হিজাব ও নিকাব পরিধান নিষিদ্ধ করা হয়, টুপি-দাড়ি পরিহিতদের অকারণে নির্যাতন ও হয়রানি শুরু হয়।

পাকিস্তান, আফগানিস্তান, এমনকি পূর্ব আফিন্সকার কোনো কোনো দেশে সফররত ব্রিটিশ মুসলিম নাগরিকদের গ্রেফতার ও নির্যাতন করা হয়, ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের সহযোগিতায় সিআইএ বিভিন্ন দেশে তাদের গুপ্ত নির্যাতন ঘাঁটিতে নিয়ে গিয়ে তাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন করে। সংশ্লিষ্টদের অনেককে পরে গুয়ানতানামো শিবিরে নিয়ে বছরের পর বছর বিনাবিচারে আটক রাখা ও নির্যাতন করা হয়। বহু ক্ষেত্রে অভিযোগ হয়েছে যে, আটক ব্যক্তিদের নির্যাতনের ব্যাপারে ব্রিটিশ গোয়েন্দারা মার্কিনিদের ছাড়াও পাকিস্তান ও উত্তর আফিন্সকার কোনো কোনো দেশের গোয়েন্দা বাহিনীকে মদদ দিয়েছে।

নাইন-ইলেভেনের জের ধরে যুক্তরাষ্ট্র তার অনুগত বহু দেশের সাথে ‘ইসলামি সন্ত্রাস’ দলন করার চুক্তি করেছে। ধর্মীয় রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্খা নেয়ার বিনিময়ে সেসব দেশকে মোটা অঙ্কের অর্থ এবং অস্ত্রশস্ত্র দেয়া হচ্ছে। সেসব দেশে এর পরিণতি হচ্ছে মারাত্মক।

নজির মোটেই ভালো নয়

নিকৃষ্টতম দৃষ্টান্ত হচ্ছে পাকিস্তান। মাঝে মাঝে দুয়েকটা নির্বাচিত সরকার হলেও পাকিস্তান প্রায় সময়ই সামরিক শাসনাধীন ছিল। রাজনীতিকদের অনেকে সামরিক শাসকদের সাথে সহযোগিতাকে লাভজনক বিবেচনা করেছেন। সংগঠনের অভাবে অন্যদের গণতান্ত্রিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু জমিয়তে ওলামা এবং আরো দুয়েকটি ধর্মীয় দল দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী সুসংগঠিত হয় এবং দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হয়ে দাঁড়ায়। জেনারেল পারভেজ মোশাররফের দীর্ঘ সামরিক শাসনের সময় ধর্মীয় দলগুলোর শক্তি সবচেয়ে বেশি বেড়ে যায়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ এই ধর্মীয় দলগুলোকে ইসলামি সন্ত্রাসের সাথে সমার্থক করে দেখেন। এ শক্তিগুলোকে দমনের উদ্দেশ্যে বুশ প্রশাসন পারভেজ মোশাররফের সরকারকে ১২ বিলিয়ন (১২০০ কোটি) ডলার অর্থ ও অস্ত্র সাহায্য দেয়। মোশাররফ সরকার ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর নির্যাতন শুরু করে, এমনকি সেনা ও বিমান বাহিনীকেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে। কিন্তু তাতে হিতে বিপরীত হয়েছে। ধর্মীয় দল ও গোষ্ঠীগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়। আফগানিস্তানের তালেবান ও আলকায়েদা গোষ্ঠীগুলো তাদের সাথে হাত মেলায়। পরিস্খিতি এখন পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীগুলোর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। গত তিন-চার বছরে মার্কিন হেলিকপ্টার বহর এবং পাইলটবিহীন ড্রোন বিমান প্রায়ই পাকিস্তান সীমান্তের ভেতরে ঢুকে আক্রমণ চালাচ্ছে। কিন্তু বিদ্রোহীদের তৎপরতা তাতে বেড়েছে, কমেনি।

বিশ্বের আরো কয়েকটি দেশে মার্কিন তাগিদে ধর্মীয় দলগুলোর ওপর সরকারি অভিযান সমাধানের বদলে জটিলতর সমস্যা সৃষ্টি করেছে। একটা দৃষ্টান্ত আলজেরিয়া। সে দেশে ১৯৯২ সালের সাধারণ নির্বাচনে ইসলামপন্থী দলগুলো জয় লাভ করে। কিন্তু মার্কিন তাগিদে সরকার নির্বাচন বাতিল করে এবং ধর্মীয় দলগুলোকে নিষিদ্ধ করে। সেসব দল তখন সন্ত্রাসের আশ্রয় নেয়। ১৮ বছর ধরে আলজেরিয়ায় ধর্মীয় সন্ত্রাসীদের সাথে সরকারি সেনাবাহিনীর খণ্ডযুদ্ধ চলছে এবং তাতে এক লাখেরও বেশি প্রাণহানি হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর আত্মপ্রতারণা

বাংলাদেশেও এখন ইঙ্গ-মার্কিন (এবং ভারতীয়) প্রভাবে সরকার ধর্মীয় দল ও গোষ্ঠীগুলোর ওপর অঘোষিত যুদ্ধ শুরু করেছে। সে যুদ্ধে র‌্যাব একটা প্রধান ভূমিকা নিচ্ছে বলে মনে হয়। সুতরাং বিচিত্র কিছু নয় যে, র‌্যাবকে প্রশিক্ষণ (হয়তো বা অস্ত্র সরবরাহে) যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন সাহায্য দেবে। পাকিস্তান, আলজেরিয়া প্রভৃতি দেশে পশ্চিমাদের এবং তাদের স্খানীয় আজ্ঞাবহদের উদ্দেশ্য সফল হয়নি, বাংলাদেশেও হবে বলে আশা করার কারণ নেই। ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়ে গেছে, সরকার সব রাজনৈতিক বিরোধিতা নির্মূল করার কাজে র‌্যাবকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে। বিচারবহির্ভূত হত্যা ছাড়াও রিমান্ডের নামে র‌্যাব সরকারবিরোধীদের ওপর চরম নির্যাতন চালাচ্ছে। সাংবাদিক মাহমুদুর রহমান, বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী প্রমুখদের ওপর নির্যাতন এখন আমেরিকা আর ইউরোপে সমালোচিত ও নিন্দিত হচ্ছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ইউরোপ-আমেরিকার মানবাধিকার সংস্খাগুলো অবৈধ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল থেকেই বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সমালোচনা করে আসছে। উইকিলিকসে র‌্যাবের প্রশিক্ষণে ব্রিটিশ-মার্কিন ভূমিকা ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর বিষয়টি আরো ব্যাপকভাবে সমালোচিত হচ্ছে। এমনকি সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী প্রমুখদের নির্যাতনের পরিপ্রেক্ষিতে র‌্যাবের প্রশিক্ষণে ব্রিটিশ সরকারের ভূমিকা সম্বìেধ সর্বোচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়েছে। বিষয়টির শুনানি যখন শুরু হবে তখন নিশ্চয়ই বহু লোক বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে।
আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলে বেড়ান, একমাত্র বিএনপি তার সরকারের সমালোচনা করছে এবং সারা বিশ্ব তার ও তার সরকারের প্রশংসা করছে। প্রকৃতপক্ষে প্রধানমন্ত্রী শুধু দেশবাসীকেই নয়, নিজেকেও প্রতারণা করছেন। বিচারবহির্ভূত হত্যার ব্যাপারে ইউরোপ-আমেরিকার নিন্দা-সমালোচনার কথা আগেই বলা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলার অনুপস্খিতি, আওয়ামী লীগের অঙ্গসংস্খাগুলোর দুর্বৃত্তায়ন এবং বিরোধী দলগুলোর ওপর সরকার ও শাসক দলের নির্যাতনের সমালোচনা বিগত বছরাধিক সময়ে খুবই বেড়ে গেছে। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং ইউরোপে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংকের অসংখ্য বন্ধু ও সমর্থক আছেন। গ্রামীণ ব্যাংক ও ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের আক্রোশের ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়ে গেছে। এমন জল্পনাও শোনা যাচ্ছে যে, গ্রামীণ ব্যাংক ও গ্রামীণফোন প্রতিষ্ঠান দুটো বেহাত করে নেয়া হচ্ছে সরকারের গোপন উদ্দেশ্য।

সারা বিশ্বে এখন বাংলাদেশ সরকার কিংবা বাংলাদেশী নীতিনির্ধারকদের প্রশংসাকারী বিশেষ চোখে পড়ছে না­ শুধু ভারতে ছাড়া। যারা সাগ্রহে দিল্লির হুকুম মেনে চলেন, ভারতের মনোরঞ্জনের যথাসাধ্য চেষ্টা করেন তারা বাহবা পান। অনেকের মতে, ২০২৫ সালের মধ্যে আবারো ভারতবর্ষকে অখণ্ড করার একটি ভারতীয় কর্মসূচিতে এদেরই কেউ কেউ এখন ইচ্ছুক খেলোয়াড়। সুতরাং ভারতে যে তাদের প্রশংসা হবে, সেটা ধরেই নেয়া যায়। কিন্তু ভারত যে বিশ্ব নয়, সে কথা হয়তো তারা ভুলে গেছেন।

***********************************************************************

পাল্টেছে হত্যাকান্ডের ধরন ও গল্প

Source : সাপ্তাহিক ২০০০

আব্দুল্লাহ্ নূহ

undefined
একটি সাম্প্রতিক ঘটনা
১০ অক্টোবর কুষ্টিয়ার পাটিকাবাড়ির নলকোলায় ৪ চরমপন্থিকে স্থানীয় জনগণ পিটিয়ে হত্যা করে। সচরাচর বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারে সন্ত্রাসী নিহত হয়। কিন্তু ১১ অক্টোবর প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকার বরাতে পাওয়া এ হত্যাকা-ের ঘটনার গল্পটি একটু ভিন্ন। এখানে গল্পটি এ রকমÑ ‘পুলিশ জানায় গতকাল রাতে নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থি এমএল জনযুদ্ধের ১৫ থেকে ২০ জনের একটি সশস্ত্র দল পোড়াদহ এলাকার এক কাপড় ব্যবসায়ীকে আইলচারা মোড় থেকে অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছিল। খবর পেয়ে স্থানীয় লোকজন চরমপন্থিদের ধাওয়া

করে। সাগর, রবিউল, সিরাজুল ও রেজাউল নামের চার চরমপন্থিকে পাটিকাবাড়ি এলাকায় ধরে গণপিটুনি দেয় এবং মেরে ফেলে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে আটটি হাতবোমা, একটি দেশি বন্দুক, একটি এলজি গান ও বন্দুকের চার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে।’
ঘটনাস্থল
সংবাদটি প্রকাশের পর ঘটনাস্থল সম্পর্কে তথ্য নিয়ে জানা গেছে, পোড়াদহের আইলচারা মোড় থেকে পাটিকাবাড়ির দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার। স্থানীয় জনগণ জানিয়েছেন, কেউই জানেন না কারা এ ‘গণপিটুনি’ দ্বারা হত্যা করার ঘটনায় জড়িত ছিল। ঘটনাটি আসলে কী জানতে চাইলে করিম মৃধা নামের আইলচারার স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, ‘কী কইরি বুইলবো আমাগের কেউই তো যাইনি। কেমুন কইরি, কারা মাইরলু তা কিডা জানে? এসব পুলিশিরই সাজানো আরেকটা গল্প হবি।’ গ্রামবাসীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে গ্রামবাসী কীভাবে ১৫ কিলোমিটার ধাওয়া করে এসে গণপিটুনি দিল? তারা কেন এতটা পথ পুলিশের সাহায্য না নিয়ে তাড়া করল? কেন পুলিশকে খবর দিল না? বোমা, এলজির মতো অস্ত্র যাদের হাতে তাদের বিরুদ্ধে নিরস্ত্র গ্রামবাসী এগিয়ে যাওয়ার সাহসই বা কীভাবে পেল? এমন সব অস্ত্র হাতে থেকেও চরমপন্থিরা প্রতিরোধ করল না কেন? কেউ আহত হলো না কেন? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আরো একটি প্রশ্ন জাগে, ‘এটাও কি তবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের সাজানো গল্পের একটি ভিন্ন রূপ?’

ক্রসফায়ারের দুটি গল্প
এদিকে ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধের নামে র‌্যাব ও পুলিশের দ্বারা সংঘটিত হত্যাকা-ের কয়েকটি ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কিছু হত্যাকা- র‌্যাব, পুলিশের ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি কিংবা আক্রোশ মেটানোর জন্য করা হয়েছে। যেমনÑ

ঘটনা-১
৩ মে ২০১০-এ কুষ্টিয়া জেলার মিরপুর থানার কলাবাড়িয়া গ্রামের মৃত নুরউদ্দিন বিশ্বাসের ছেলে আব্দুল আলীমের হত্যাকা-। নিহত আব্দুল আলীম কুষ্টিয়া জগতি চিনিকলের মওসুমি শ্রমিক ছিলেন এবং কৃষিকাজ করে তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। তিনি তিন বছর বয়সী একটি কন্যা ও এগারো বছর বয়সী একটি পুত্রের জনক। আব্দুল আলীমের হত্যাকা-ের কয়েকদিন পর তার স্ত্রী আনজু বেগম একটি মানবাধিকার সংস্থার কাছে অভিযোগ করে বলেছিলেন, এএসআই গোলাম মোস্তফা প্রায়ই তার স্বামীর কাছে অনৈতিকভাবে টাকা দাবি করত। আব্দুল আলীম টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে তাকে ভয় দেখানো হতো, মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে ক্রসফায়ারে দেওয়া হবে। এমন একটি পরিস্থিতিতে গোলাম মোস্তফার দাবি করা ২ লাখ টাকার মধ্যে  দরিদ্র কৃষক আব্দুল আলীম ধার-দেনা করে অনেক কষ্টে ৪০ হাজার টাকা জোগাড় করে গোলাম মোস্তফাকে দেন। অবশিষ্ট টাকা তার দেওয়ার সাধ্য নেই বলে অক্ষমতা প্রকাশ করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। কিন্তু গোলাম মোস্তফা অবশিষ্ট টাকার দাবি ধরে রেখে হুমকি অব্যাহত রাখে। বাধ্য হয়ে আব্দুল আলীম প্রতিকার পাওয়ার আশায় মিরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ কে এম মেহেদী হাসানকে ঘটনাটি জানিয়ে সাহায্য প্রার্থনা করেন। কিন্তু ওই কর্মকর্তা এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেন না। উপরন্তু তিনিও গোলাম মোস্তফার দাবিকৃত টাকা পরিশোধের তাগিদ দেন। সেই সঙ্গে বলে দেন টাকা না দিলে যা হবে বলা হয়েছে তা হবে এবং এজন্য প্রস্তুত থাকতেও বলে দেন।
তারপরের ঘটনা র‌্যাবের বন্দুকযুদ্ধের গল্পের দৌলতে পত্রিকার মাধ্যমে আমাদের জানা। কিন্তু আনজু বেগমের দাবি ছিল পুলিশ তার স্বামীকে হত্যা করে নাটক সাজিয়েছে এবং এ মর্মে বিচার দাবি করে আনজু বেগম ১৯ জুলাই ২০১০-এ কুষ্টিয়ার সিনিয়র চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন। আদালত তার আবেদনের প্রেক্ষিতে দ-বিধির ৩০২/৩৪ ধারায় অভিযোগ নথিভুক্ত করেন।

ঘটনা-২
২৬ জুলাই ২০০৮ নাটোরের সিংড়া থানার সার ব্যবসায়ী আনসার আলীকে পুলিশ হত্যা করে ক্রসফায়ারের নামে। আনসার আলীর পিতা রজব আলীর ১৭ আগস্ট ২০০৮-এ দায়েরকৃত মামলার প্রেক্ষিতে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগে গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘খুনের ঘটনা ধামাচাপা দিতে অন্যসব ঘটনার মতো ক্রসফায়ারের গল্প সাজানো হয়েছে।’ নিহত আনসার আলীর পিতা রজব আলীর দায়েরকৃত এই মামলায় তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আশিক সাইদ, সহকারী পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আশরাফুল হক এবং সিংড়া থানার অফিসার ইনচার্জ আবু বক্করসহ ২১ জনকে আসামি করা হয়। মামলায় অভিযোগ করা হয়, আনসার আলীকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করে ক্রসফায়ারের নামে মিথ্যা তথ্য প্রচার করা হয়েছে। অতিরিক্ত মুখ্য হাকিম মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান মামলাটি গ্রহণ করে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুল হাসানকে বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিলে তদন্তকালে প্রতিবেদনে বের হয়ে আসে ক্রসফায়ারের সাজানো গল্পের সত্যতা।
তদন্তে জানা যায়, ২৩ জুলাই ২০০৮ রাত ৯টা-১০টার দিকে সার ব্যবসায়ী আনসার আলীকে পুলিশ তার নিজের বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে সিংড়া থানায় নিয়ে যায়। ২৬ জুলাই সন্ধ্যা পর্যন্ত বাবা রজব আলীসহ অন্য আত্মীয়রা থানায় গিয়ে আনসার আলীর সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করেন। ওই সময় অফিসার ইনচার্জ সবাইকে বলেন, ২৭ জুলাই আনসার আলীকে আদালতে চালান দেওয়া হবে।
আত্মীয়রা চলে আসার পর ওই রাতেই থানা থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে কাকিয়ান জঙ্গলে নিয়ে আনসার আলীকে গুলি করে ও ধারালো অস্ত্র দ্বারা আঘাত করে হত্যা করা হয়। পরদিন সিংড়া থানার এএসআই জসিমউদ্দিন বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। সেখানে বর্ণনা করা হয় এভাবে, ‘পুলিশের একটি টহল দল কাকিয়ান জঙ্গলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আনসারসহ অন্য ডাকাতরা তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে টহল দলের সদস্যরাও তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে আনসার মারা যায়।’ কিন্তু আনসার যে আগে থেকেই থানা হেফাজতে ছিলেন এ তথ্য গোপন করা হয় মামলাতে।
বিচার বিভাগীয় তদন্তে বলা হয় আনসারকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে থাকা অবস্থাতেই হত্যা করে লাশ কাকিয়ান জঙ্গলে ফেলা হয়েছিল। আনসার ক্রসফায়ারে মৃত্যুবরণ করেননি। বরং তাকে গ্রেফতারের পর থানা হেফাজতে নির্যাতনের মাধ্যমে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে বিস্ময় প্রকাশ করে বলা হয়েছিল, ‘পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় আনসার ২৫ কিলোমিটার দূরে কাকিয়ান জঙ্গলে অন্য ডাকাতদের সঙ্গে মিলিত হলেন কীভাবে?’


সুন্দরবনের বনদস্যুদের সেকাল-একাল

Source : সাপ্তাহিক ২০০০

শুভ্র শচীন


ভারত-পাকিস্তান পৃথক রাষ্ট্র হিসাবে আবির্ভূত হলে সীমান্তের ওপারের ডাকাত এপারে ডাকাতি করে পালিয়ে যায়। আর এপারের ডাকাত ওপারে ডাকাতি করে নিরাপদে ঘরে ফেরে। এ যেন সীমানাবিহীন অন্য এক পৃথিবী। অতীতে ডাকাতরা জেলে-বাওয়ালিদের তেমন অত্যাচার করত না। পাকিস্তান আমলে দেিণর সুন্দরবন সংলগ্ন ধনীশ্রেণীর কৃষক এবং চোরাকারবারিরা ছিল ডাকাতদের প্রধান শিকার। ১৯৪৭ সালের পর ঢাকা জেলার দরবার ডাকাতের নিষ্ঠুরতা ছিল সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। দরবার ডাকাতের ঘাঁটি ছিল সুন্দরবনের দণি-পশ্চিম অঞ্চলে বেয়ালা কয়লা নামক দুর্গম স্থানে। দরবার ডাকাত কাঠের ঘেরিদার, চোরাকারবারিসহ গ্রাম অঞ্চলে ডাকাতি করত। ওই সময়েই সে বন বিভাগের পেট্রলবোট আক্রমণ করে দুটি রাইফেল হাতিয়েছিল। ডাকাতরা সে সময় ব্যবহার করত বন্দুক, দেশি গাঁদা বন্দুক, রামদা, কুড়াল, কাতরা, কালি, ঢাল-সরকি জাতীয় অস্ত্র। দরবার ডাকাতের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড বাসির ওরফে বাসের ডাকাতও প্রতিপরে হাতে নিহত হয়। দরবার ডাকাতের সমসাময়িক ডাকাতরা হলো : পুলিশ কনস্টেবল হয়ে নিজেকে দারোগা হিসাবে জাহিরকারী দারোগা ডাকাত, মোকসেদ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বর্ধমান জেলায় বর্মা ও পিরোজপুরের সৈয়দ আলী। দরবার ডাকাত খুন হলে বাসির ওরফে বাসের সুন্দরবনের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে পড়ে।
খুলনার পাইকগাছা উপজেলায় জন্ম নেয়া বাসির ডাকাত ছিল অনেকটা কিংবদন্তির ডাকাত চরিত্রের মতো। গরিব মানুষদের অকাতরে সাহায্যকারী হিসাবে তার খ্যাতি ছিল। বন বিভাগের নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের সঙ্গে তার ছিল দহরম-মহরম। স্থায়ীভাবে নিবাস গড়েছিলেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বসিরহাট জেলায়। ছেলেমেয়েদেরও পড়াশোনা করিয়েছেন। বাসির ডাকাতের দলে নৈতিকতা কঠোরভাবে মানা হতো। মেয়েদের ওপর অত্যাচার হলে সে নিজেই তার বিচার করত। এমনই বিচারে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় সে আপন বোনের ছেলেকে হত্যা করে। ডাকাত বাসির সবসময় বড় জোতদার বাড়িতে হামলা করত। চোরাকারবারিদের সঙ্গে তার চুক্তি ছিল। মালামাল অনুযায়ী টাকা দিতে হতো তাকে। খুলনার বহুল আলোচিত হাজি বাড়ির মালিক হাজি রায়েজউদ্দিনের মালিকানাধীন ‘রাহেজউদ্দিন বিড়ি কোম্পানি’ বাসেরকে চাঁদা দিয়ে ভারত থেকে চোরাইপথে বিড়িপাতা আনত। এছাড়া চোরাকারবারি, পাক ওয়াটার ওয়েজের মালিক চাউলা হাসান ও মুসলিম লীগের নেতা, পরবর্তীকালে আইয়ুব সরকারের যোগাযোগমন্ত্রী সবুর খানের  কাছ থেকে বাসির ডাকাত নিয়মিত টাকা আদায় করত বলে জানা যায়।
১৯৬৭ সালে নিজ গ্রামে এক আত্মীয়ের বিশ্বাসঘাতকতায় ডাকাত সর্দার বাসের ধরা পড়ে। তার সমসাময়িক ডাকাত ছিল ফর্সা চেহারার বাগেরহাট জেলার শরণখোলা উপজেলার রায়েন্দার রাঙ্গা আছেদ, মতিউল্লাহ, কালে খাঁ, গনি মিয়া, মন্টু প্রমুখ। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় কিছু ডাকাত মুক্তিবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। এদের অধিকাংশই ডাকাতি ছাড়তে বাধ্য হয়।
পরবর্তীকালে ১৯৭৩ সালের দিকে গণবাহিনীর কিছু সদস্য সুন্দরবনে আশ্রয় নেয়। ১৯৭৪ সালে দণি অঞ্চলে দুর্ভি ছড়িয়ে পড়লে পুনরায় ডাকাতের উপদ্রব শুরু হয়। তখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে রান্না করা ভাত পর্যন্ত ডাকাতি হতো। সাতীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার বড়দলের ধামরাইল্যা এলাকার ডাকাত ওসমান খাঁর নাম বেশ আলোচিত ছিল। ১৯৭৬ সালের দিকে সে ডাকাতি ছেড়ে বাড়িতে থাকা শুরু করে। পুলিশের হাতে আটকের পর ৭ বছর জেল খেটে আবার পুরনো পেশায় ফিরে যায়। ম্যাট্রিক পাস এই ডাকাত সুন্দরবনের পশ্চিম বন বিভাগের বড়দল, আশাশুনি, এলাকার অনেক ডাকাতির পর আবার ধরা পড়ে জেলে যায়। ডাকাতির আগে সে গরানকাটা বাওয়ালির কাজ করত।
রাজনৈতিক প্রভাব আর অত্যাধুনিক অস্ত্রের বলে ডাকাতরা এখন সুন্দরবন বন বিভাগের সমান্তরালে ওই এলাকার শাসন চালাচ্ছে। শোষণ করছে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের কয়েকশ কোটি টাকার সম্পদ। ৬শ বর্গকিলোমিটার আয়তনের সুন্দরবন রার জন্য বন বিভাগের রয়েছে ১২শর মতো বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মচারী, প্রায় দেড়শ বিভিন্ন ধরনের জলযান আর বনরীদের হাতে রয়েছে মান্ধাতা আমলের আগ্নেয়াস্ত্র। বর্তমানে অবস্থা আরো ভয়াবহ। দণি-পশ্চিম অঞ্চলসহ সারা দেশের অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসীর নিরাপদ আশ্রয় এখন সুন্দরবন। যে কোনো ধরনের অপকর্ম করে তারা আশ্রয় নেয় সুন্দরবনে।
২০০১ সালে ডাকাতদের হাতে অপহৃত হয়েছিল মৌয়াল মোশাররফ। ১০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পেয়েছিল। সেদিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানালেন, সুন্দরবনের দোবেকির দুইবাঁক দেিণ মালঞ্চ নদীতে তাদের নৌকা ১০-১২ জন ডাকাত দখল করে নেয়। তিন দিনের মধ্যে মোশাররফের সহযোগীরা ১০ হাজার টাকা দিয়ে তাকে উদ্ধার করে  নেবে এই শর্তে তাকে রেখে দেয়  ডাকাতরা। এ খবর পেয়ে কোস্টগার্ডের টহল জোরদার হলে ডাকাতরা তাদের স্থান পরিবর্তন করে।
সোহরাব হাজি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দোসর ‘পিস কমিটি’র সদস্য। একসময় জামায়াতের রাজনীতি করলেও এখন বিএনপির স্থানীয় নেতা। ২০০৪ সালের জুলাই মাসের দিকে যৌথবাহিনী তার বাড়ি থেকে ৪০ লাখ টাকার চোরাই কাঠ উদ্ধার করে। তার দোসর মালেক নামের এক খোঁড়া ডাকাত। সোহরাব এক সময় বাওয়ালি গোমস্তা ছিল। গোলখালির পিস কমিটির চেয়ারম্যান হয় ১৯৭১ সালে। এরপর বাঘ-কুমিরের চামড়া বিক্রি, খুন, রাহাজানি, জমি দখল তার পেশায় পরিণত হয়। বাওয়ালি ও মৌয়াল দলের মহাজন হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কেউ প্রমাণ হাজির করতে সাহসী হয় না। নবতিপর এই অপরাধী এখনও সক্রিয়।
বৈদ্যমারী এলাকার ভয়ঙ্কর প্রকৃতির ডাকাত মকিম। ৪০-এর দশকে সে ডাকাতি শুরুর পর  থেকে ৭০-এর দশকে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত সে প্রবল প্রভাবের সঙ্গে ডাকাতি করে গেছে। বাওয়ালি কূপ মুক্তিপণ আদায়, বনে আগুন লাগিয়ে বন বিভাগের জমি দখল, হিন্দুদের জমি দখলের মতো অপকর্মে সে সিদ্ধহস্ত ছিল। এসব কারণে সে কয়েকবার জেলও খেটেছে। তার সঙ্গী হিসাবে ছিল কালু ডাকাত, আয়ুব আলী, সাত্তার, নওয়াব আলী প্রমুখ। এর মধ্যে কালু নিজেই একটি বাহিনী তৈরি করে এখন সুন্দরবনে ডাকাতি করে বেড়ায়। রায়েন্দার তাফালবাড়ি এলাকার ডাকাত কালু সর্দারের নৃশংসতার উদাহরণ হলো বলেশ্বর নদীর মোহনায় ইলিশ ধরা ট্রলারে ডাকাতি করার পর সহযোগীদের চোখের সামনে কোনো একজন জেলেকে হত্যার পর উৎসব করে তার লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া। এছাড়াও সে জ্ঞানপাড়ায় হরিণ শিকারিদের সঙ্গে মাসোহারা চুক্তি করে হরিণের চামড়া বিক্রির পর কমিশন নেয়। ২০০৩ সালে কালুবাহিনীর প্রধান কালু ডাকাত ধরা পড়লেও তার সঙ্গীরা প্রতাপের সঙ্গে এখনো ডাকাতি করে চলেছে। এর আগে সে ১৯৯০ সালে একবার ধরা পড়লেও দুর্বল সা্েযর কারণে জেল থেকে বেরিয়ে আসে। তার টাইগার বাহিনীতে মেয়ে সদস্য ছিল বলেও জানা গেছে।
সুন্দরবনের বানিয়াখালী রেঞ্জ এলাকায় স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহাবুদ্দিন ও তার ভাই দীর্ঘদিন ধরে ডাকাত দল পোষে। এছাড়া খুলনার দাকোপ উপজেলার নলিয়ান রেঞ্জ এলাকার মন্টু বৈদ্যের সঙ্গে ডাকাতদের সখ্য রয়েছে বলে জানা গেছে। একই উপজেলার শাহাবুদ্দিন মোল্লা ছাড়াও সুন্দরবন সংলগ্ন কয়েকটি উপজেলার বেশ কয়েকজন জনপ্রতিনিধি ও চিংড়িঘের মালিকের বিরুদ্ধে লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্র ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। খুলনা সিটি করপোরেশনের লবণচরা এলাকার কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন মুক্তার আগ্নেয়াস্ত্র সুন্দরবনে ভাড়ায় ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফাঁসিতে মৃত শীর্ষ খুনি এরশাদ শিকদার, র‌্যাব হেফাজতে ক্রসফায়ারে নিহত খুলনার খালিশপুরের বিএনপি নেতা আরিফুল আলম আক্কাসের মালিকানাধীন আগ্নেয়াস্ত্র এখন হাতবদল হয়ে সুন্দরবনে ডাকাতিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। আক্কাসের স্ত্রী এখন সুন্দরবনকেন্দ্রিক অস্ত্র ব্যবসা পরিচালনা করছে বলে জানা গেছে।
১৯৮৮ সালের দিকে পিরোজপুরের রাজাপুর গ্রামের বাসিন্দা বাদল পেয়াদা, ডাকাত সর্দার খালেক, মানিক ও রুস্তম গড়ে তোলে দোয়েল বাহিনী। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জ এলাকায় বন বিভাগের মরাভোলা কূপের দুই কর্মীকে হত্যা করে রাইফেল লুটের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ ঘটে এই দোয়েল বাহিনীর। এই বাহিনীর স্থায়ী অবস্থান ছিল লাঠিমারা কোকিলবুনিয়া এলাকায়। বন বিভাগের তাম্বুলবুনিয়া টহল ফাঁড়ির কাছাকাছি এই বাহিনী কয়েকটি বাইন গাছে উঁচু মাচা তৈরি করে আস্তানা গড়ে। পুলিশ ও বন বিভাগের যৌথ অভিযানে মারা পড়ে এক ডাকাত। নষ্ট হয় বাদল বাহিনীর আস্তানা। উদ্ধার করা হয় ১২ বস্তা চাল, আটা, বিস্কুটসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি। বাদলের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে তার নিজের গ্রামের লোকজন তার দুচোখ উপড়ে ফেলে।
সুন্দরবনের দুবলারচরের নারকেলবাড়িয়া বনের আরেক জমিদার কবিরাজ তালুকদার। জঙ্গলে ডাকাতি, মাছধরা ট্রলার মেরে দেওয়া, বহিঃসমুদ্রে জেলেদের ওপর হামলা, কাঠ চুরি, হরিণ ধরে চামড়া ও মাথা বিক্রি, মাছ চুরিতে সিদ্ধহস্ত ছিল তার বাহিনী।
সুন্দরবনের পশ্চিম বিভাগের সাতীরা এলাকায় ‘মোতালেব বাহিনী’প্রধান মোতালেবের বাড়ি বাগেরহাট জেলার মংলা উপজেলার চাঁদপাই গ্রামে। তার বিরুদ্ধে ১১টি অস্ত্র মামলা রয়েছে।  মোতালেবের বর্তমান ঠিকানা নড়াইল সদর থানায়। সেখানে তার বউ-ছেলেমেয়ে থাকে। মোতালেবের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড আনসার ওরফে বাকি বিল্লাহর বাড়ি খুলনার দিঘলিয়া থানার লাখোহাটি গ্রামে। মোতালেব
বাহিনীর অন্য সদস্যরা হচ্ছে মোশারফ হোসেন ওরফে মীর মল্লিক ওরফে কপি ভাই। বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল থানার ঝনঝনিয়া গ্রামে। মোঃ ইসমাইল ওরফে কালু, বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল থানার শ্রীফলতলা গ্রামে। মোঃ সুলতান, মোহাম্মদ হোসেন, মোঃ মনসুর এই তিন বনদস্যুর বাড়িও বাগেরহাটের রামপালে। বাকি ওরফে যুবরাজ, সিরাজুল, আমজাদ হোসেন ওরফে বাপ্পির বাড়ি সাতীরার শ্যামনগরে। মোঃ ফজলুর রহমান ওরফে ফজলে, ইমান ফকির, মাহবুব ফকির, হায়দার ফকিরের বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল থানার চন্দ্রখালী গ্রামে। মতি চেয়ারম্যান, করিম, বারিকের বাড়ি খুলনার কয়রা উপজেলায়।
থানা সূত্রের দাবি, মোতালেব বাহিনীর বর্তমান অস্ত্র সরবরাহকারী খুলনা শহরের মোঃ মাসুদ ওরফে গলাকাটা মাসুদ ওরফে ডাকবাংলোর মাসুদ। এ মাসুদ খুলনার দৌলতপুর কলেজের এক পিয়নের ছেলে। এ ছাড়া খুলনার বাগমারার কামরুল ইসলাম, খালিশপুরের পাখি, খানজাহান আলী থানার মোঃ মেহেদি হাসান ডালিম ওরফে রাশেদ অস্ত্র সরবরাহ করে বলেও বিভিন্ন সূত্র দাবি করেছে। মোতালেবের অস্ত্র জোগানদাতা বেশ কয়েকজন ইতিমধ্যে ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, খুলনা সিটি করপোরেশনের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার আসাদুজ্জামান লিটু। কমিশনার  লিটুর লোকজন সরাসরি স্পিডবোটযোগে সুন্দরবনের ডাকাত মোতালেব বাহিনীকে অস্ত্র পৌঁছে দিত। এছাড়া আরেক অস্ত্র সরবরাহকারী বেড়ে বাবু ও খুলনার মোঃ টগর ডিবি পুলিশের হাতে ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে। মোতালেবের স্ত্রী টগর  বেগমের হাতে বর্তমানে মোতালেব বাহিনীর সব অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ। উল্লেখ্য, মোতালেব ২০০৩ সালে যৌথবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। তার অপর সহযোগীদের ধরতে ব্যর্থ হয় যৌথবাহিনী। সে সময় স্বীকারোক্তিতে মোতালেব জানায়, সুন্দরবনের পারকোষ্টা ক্যাম্পে বন বিভাগের টহল ফাঁড়িতে তার কিছু অস্ত্র রাখা আছে। এ খবরের ভিত্তিতে যৌথবাহিনী মোতালেবের ৩৫টি ভারী অস্ত্রের মধ্যে ১১টি উদ্ধার করে। যৌথবাহিনীর সদস্যরা চলে গেলে মোতালেব বাহিনীর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড তার জামাই হাফিজ বন বিভাগের পারকোষ্টা ক্যাম্পের ইনচার্জসহ অন্য কর্মচারীদের বেধড়ক মারপিট করে।
সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জ এলাকার করমজল ঢাংমারি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রাজু বাহিনী। বাগেরহাট জেলার মংলা উপজেলার আমতলা গ্রামের মরহুম জালাল মোল্লার ছেলে মোঃ ওলি ওরফে রাজুর বাহিনীতে ২০ থেকে ৩০ জন সদস্য রয়েছে। এর মধ্যে মংলার আমতলার মোঃ ওয়াহিদ মোল্লা, মোঃ জুলফিকার আলী ওরফে গামা, বাকি বিল্লাহ, বাগেরহাটের রামপাল থানার মোঃ মিজান, মওলা ফকির, কালাম ফকির, শুকুর, খোরশেদ, হারুন, মোঃ জাহাঙ্গীর, মোঃ বাবুল অন্যতম।
জানা গেছে, এই বাহিনীর অস্ত্র সরবরাহকারী খুলনার কামরুল ইসলাম, তরিকুল ইসলাম, রিংকু, শহীদুল মেম্বার। এই বাহিনী দিনের বেলায় অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেয়। আর রাতের যে কোনো সময় মন চাইলে টহল অফিসে ঢুকে বন বিভাগের লোকজনকে বের করে দিয়ে ঘুমায়। বনকর্মীদের রান্না করা খাবার খায়। বন বিভাগের কেউ এসব অত্যাচারের প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না। সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের মরাভোলা টহল ফাঁড়ির দুই বনরী প্রতিবাদ করায় ডাকাত বাহিনী তাদের ওপর বৃষ্টির মতো গুলি চালায়। এতে আফছার উদ্দীন নামের একজন বনরী নিহত ও শাহআলম নামের একজন বনরী গুলিবিদ্ধ হন। গুলিবিদ্ধ শাহআলম এখনো সুস্থ হননি।
চাঁদপাই-শরণখোলা রেঞ্জ এলাকায় বিডিআর তমিজউদ্দীন বাহিনী রাজত্ব কায়েম করেছে। বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ থানার ঘুলষেখালি গ্রামের লাল মিয়ার ছেলে তসলিমউদ্দীন বিডিআরে চাকরি করত। বিডিআরের চাকরি ছেড়ে সুন্দরবনের বনদস্যু হয়ে যায়। গড়ে তোলে বাহিনী। এই বাহিনী বিডিআর বাহিনী হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। সে র‌্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হওয়ার পর এই বাহিনীর দায়িত্ব নিয়েছে  সেকেন্ড-ইন-কমান্ড জুলফিকার ওরফে জুলফু।
বাগেরহাটের মংলা থানার জয়মনি গ্রামের হাবিব মাতুব্বরের ছেলে জুলফু ‘বিডিআর বাহিনী’র দায়িত্ব নেয়ার পর এদের দলে নতুন সদস্য যোগ দিয়েছে। জানা গেছে, বিডিআর বাহিনীর সদস্যরা হচ্ছে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের ঘুলষেখালির মোঃ সোহরাব, রামপালের মল্লিকেরবেড় গ্রামের মোঃ বেথার তালুকদার, লিটন তালুকদার, শরণখোলার তালবাড়িয়া গ্রামের মানিক, মোরেলগঞ্জের অর্জনবহর গ্রামের নমির, ছমির, মান্নান, খুলনার রূপসা থানার নিকারিপাড়ার আমির হোসেন ওরফে রাঙ্গা, আফজাল, মোতালেব, সজল, কেরামত, মংলার দেলোয়ার হোসেন। এই বাহিনীর অস্ত্র সরবরাহকারী মোরেলগঞ্জের ফুলহাতা গ্রামের মনিরুজ্জামান, খুলনার দোলখোলা এলাকার টপি, ফারাজিপাড়ার মিঠু।
এদিকে জুলফু বাহিনীর গুলিতে আকাশ বাবু বাহিনীর প্রধান আকাশ বাবু নিহত হলে সেকেন্ড-ইন-কমান্ড অভিজিত আকাশ বাবু বাহিনীর দায়িত্ব নেয়। এই বাহিনী ছাড়াও কাশেম বাহিনী, জহির বাহিনী সুন্দরবনের কালাবগি, নলিয়ান, দাকোপ নিয়ন্ত্রণ করছে। ইতিমধ্যে এসব বাহিনীর বেশ কয়েকজন যৌথ বাহিনীর হাতে আটক হয়ে জেলহাজতে রয়েছে। বনদস্যুতায় ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র ভা-ার এখনো অত।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সুন্দরবনে কর্মরত একজন বন কর্মকর্তা জানান, সরকার যদি তাদের পুলিশ ও র‌্যাবের মতো ক্রসফায়ার দেওয়ার অনুমতি দিত তাহলে ডাকাতের অত্যাচার থেকে রা পাওয়া যেত। প্রাণ বাঁচানোর জন্য কোনো বনরী গুলি চালালে যদি ডাকাত দলের সদস্য নিহত হয়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে জেলে হিসাবে প্রচার করা হয়। তারা উল্টো ফরেস্টারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে।
ওই বন কর্মকর্তা আরো বলেন, আমি যে বিটে দায়িত্ব পালন করছি, এখানে ডাকাতরা এসে আমাদের লোকজনকে ধরে পিটিয়ে বের করে দিত। তারা ক্যাম্প দখল করে বিশ্রাম নিত এবং রান্নাবান্না করে খেত। আমি দায়িত্ব নেয়ার পর ডাকাতরা একবার আমার ক্যাম্পে এসেছিল। আমি তাদের বলে দিয়েছি সিডরে দুবলার চরে ছিলাম। মরতে মরতে বেঁচে গেছি। এখন আমার জীবন হচ্ছে বোনাস। তাই কাউকে ভয় পাই না। আমার এখানে এলে গুলি করে মাথার খুলি উড়িয়ে দেব। এরপর থেকে এখানে আর ডাকাতরা আসেনি। কিন্তু মোবাইলে রাতদিন হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। বন বিভাগের মীরগামারি, নন্দবালা, হারবাড়িয়াসহ বেশ কয়েকটি টহল অফিসে ডাকাতরা বিশ্রাম নেয়। বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো কিছু বলার সাহস নেই।
জানা গেছে, বনদস্যুদের পেছনেও রয়েছে রাজনৈতিক ছত্রছায়া। বন থেকে লুটে আনা টাকার ভাগ প্রশাসন, পুলিশ, কোস্টগার্ড, রাজনৈতিক নেতাকর্মীর পকেট পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তাই বনদস্যুরা কাউকে পরোয়া করে না। বন বিভাগের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীও বনদস্যুদের টাকার ভাগ পেয়ে থাকে। বন রায় কারও একটু মায়াও যেন নেই। গাছ কেটে সাবাড় করছে, তারপরও বন বিভাগ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। বনের ভেতর দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে বনদস্যুরা। কোনো প্রতিকার নেয়ার উদ্যোগ নেই।
বন বিভাগ, কোস্টগার্ড, র‌্যাব, বিজিবি, পুলিশ প্রশাসন কখনো পৃথকভাবে কিংবা যৌথভাবে বনদস্যু দমনে অভিযান চালালেও তা পুরোপুরিভাবে সফল হচ্ছে না। প্রশাসনের কাছে বনদস্যুদের পূর্ণাঙ্গ কোনো তালিকাও নেই। বন বিভাগ ও কোস্টগার্ড সূত্রে জানা গেছে, তাদের যে লোকবল ও জলযান রয়েছে তা সুন্দরবনের বিশাল এলাকার জন্য পর্যাপ্ত নয়। যে কারণে  বনদস্যুদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় না। র‌্যাব-৬-এর ভাষ্যমতে, নিজস্ব কোনো জলযান না থাকায় তারাও সুন্দরবনে অভিযান চালাতে গিয়ে সমস্যার সম্মুখীন হন।
খুলনা রেঞ্জ পুলিশের ডিআইজি মোঃ হিমায়েত হোসেন জানান, তাদের কাছে বনদস্যুদের কোনো তালিকা নেই। তবে বনদস্যুদের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

মুক্তিপণের আধুনিক পথ ‘অনলাইন ব্যাংকিং’

সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরের ডাকাতদের দৌরাত্ম্য উপকূলের মৎস্য আহরণ সঙ্কটে পড়েছে। চলতি শুঁটকি মওসুমে দুবলারচরসহ সুন্দরবন উপকূলের শুঁটকি ব্যবসা ক্রমান্বয়ে ডাকাতদের দখলে চলে যাচ্ছে। ডাকাতরা জেলেদের ওপর হামলা চালিয়ে টাকা লুটে তাদের এজেন্টদের দিয়ে শুঁটকি ব্যবসায় বিনিয়োগ করছে। মুক্তিপণ আদায়ে তারা বেছে নিয়েছে ‘অনলাইন ব্যাংকিং’।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারি দলের স্থানীয় একশ্রেণীর প্রভাবশালী নেতার ছত্রছায়ায় খুলনা, সাতীরা, বাগেরহাটের মংলা ও রামপালভিত্তিক প্রধান প্রধান বনদস্যু বাহিনী এ এলাকার কিছু উঠতি মৎস্য ব্যবসায়ীর মাধ্যমে মাছ ব্যবসায় টাকা খাটাতে শুরু করেছে। একই এলাকার বাসিন্দা হওয়ায় ডাকাত ও তথাকথিত ব্যবসায়ীদের মাঝে গড়ে উঠেছে আঁতাত। খুলনা ও মংলার এই নব্য মৎস্য ব্যবসায়ীরা বনদস্যুদের সহায়তায় সুন্দরবনের দুবলার চর এলাকার আলোরকোল দ্বীপকে তাদের ঘাঁটি হিসাবে গত দুবছরে অবস্থান শক্তিশালী করেছে। চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলের বহরদার ও মৎস্য ব্যবসায়ীদের দীর্ঘকাল ধরে দুবলার চরে যে আধিপত্য ছিল তা ডাকাতরা অনেকাংশে দুর্বল করে ফেলেছে। ফলে সুন্দরবনের শুঁটকি ব্যবসা হাতবদল হয়ে এখন চলে গেছে ডাকাত ও তাদের দোসর তথাকথিত ওই নব্য মৎস্য ব্যবসায়ীদের হাতে।
জানা যায়, দুবছর সুন্দরবনের ডাকাতবিরোধী অভিযান বন্ধ থাকার পর আবার শুরু হয়েছে। গত কয়েক মাসে লোকালয় থেকে দুএকজন ডাকাত ধরা পড়লেও তাদের বিরুদ্ধে ডাকাতি আইনে মামলা না হওয়ায় বনদস্যুদের দাপট বেড়েই চলছে।
গত সেপ্টেম্বরের প্রথমদিকে রাজু
বাহিনীর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড শহীদুল বাগেরহাটের মংলার দিগরাজ থেকে গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া পুলিশ তাকে দ-বিধির ৫৪ ধারায় আদালতে সোপর্দ করলে সে এক মাস পর মুক্তি পায়। কথিত রয়েছে, শহীদুলের মুক্তির ব্যাপারে মংলার একটি প্রভাবশালী মহল তদবির করায় তার বিরুদ্ধে পপাতিত্বমূলক পুলিশি তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হয়।
সুন্দরবনে মাঝে মাঝে আইন-শৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে দুএকজন ডাকাত নিহত হওয়ার ঘটনার পাশাপাশি রয়েছে দুএকজনকে বনদস্যু গ্রেফতারের পর মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ। গত আগস্ট মাসে বাগেরহাটের মংলার অদূরে দাকোপ উপজেলার ঢাংমারি বন অফিসের পাশে বানিশান্তা গ্রাম থেকে আটক ডাকাত সর্দারকে কোটি টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে একটি এলিট বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।
বছর ধরেই সাগর ও সুন্দরবনে জেলেরা ডাকাতদের হুমকির মুখে থাকে। চাঁদা, মুক্তিপণ ও নানা উপঢৌকন দিয়ে উপকূলের মৎস্যজীবীরা সশস্ত্র দস্যু বাহিনীর হাত থেকে জান-মাল বাঁচিয়ে সাগর ও জঙ্গলের নদী-খালে মাছ ধরার সুযোগ পায়। পশ্চিম উপকূলের বিশাল সুন্দরবন, পাথরঘাটা, দণি উপকূলের মহিপুর, কুয়াকাটা, সোনারচর, ভোলা থেকে পূর্ব উপকূলের হাতিয়া, সন্দ্বীপ, বাঁশখালী, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, কক্সবাজার, টেকনাফ, সোনাদিয়া, শাহপুরা এ বিরাট অঞ্চলে হাজার হাজার জেলে মাছ শিকারে ব্যস্ত থাকে। নিরাপত্তার অভাবে জেলেদের সাগর মোহনায়, নদী এবং সুন্দরবনে মাছ ধরা ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, লোকালয়ের প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহল, প্রশাসন, পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রাকারী বাহিনী এবং বন প্রশাসনের প্রত্য ও পরো সহযোগিতায় সাগর-নদী-বনে ডাকাতরা এখন বেপরোয়া।
কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে পশ্চিম সুন্দরবনের রায়মঙ্গল মোহনা পর্যন্ত ডাকাতদের অবাধ রাজত্ব। বিশ্বঐতিহ্য সুন্দরবন এখন ডাকাতদের অভয়াশ্রম। বিভিন্ন মৎস্যবন্দর, লোকালয়ের জেলেপল্লী, শীত মওসুমে সুন্দরবনের দুবলার চর ও সন্নিহিত অস্থায়ী জেলে বসতি এবং খুলনা-সাতীরা-বাগেরহাটের মংলা-রামপাল-শরণখোলা-পিরোজপুরের জিয়ানগর-ভা-ারিয়াসহ উপকূলের শহর-বন্দর-গ্রামগুলোতে এখন সক্রিয় ডাকাত
বাহিনীগুলোর এজেন্টরা। এসব এলাকায় এখন সুন্দরবনে ঢুকতে বন বিভাগের পাশাপাশি বনদস্যুদের এজেন্টদের দেওয়া টোকেন বিক্রি হচ্ছে ৫ থেকে ৫০ হাজার টাকায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চলতি বছর উপকূল এলাকার তিন হাজার ফিশিং বোট থেকে টোকেন দিয়ে ২০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা নেয়া হয়েছে। সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরে ১৫-১৬টি ছোট-বড় বনদস্যু বাহিনী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এর মধ্যে রাজু বাহিনী, জুলফিকার বাহিনী, মোতালেব বাহিনী, আব্বাস বাহিনী, কৃষ্ণ-সাগর বাহিনী, গামা বাহিনী, বাদল বাহিনী সবচেয়ে বেশি তৎপর। এসব বাহিনী স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রসহ রাইফেল, বিদেশি বন্দুক, দেশি পাইপগান ইত্যাদি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত।
কক্সবাজার থেকে সুন্দরবন উপকূল পর্যন্ত বিভিন্ন লোকালয়ের জেলেদের অপহরণের পর সুন্দরবনের ভেতরে জিম্মি করে রেখে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করা হয়। নগদ অর্থ, স্বর্ণালঙ্কার, মোবাইল সেট, খাদ্য, ফল, সিগারেট, ওষুধ, মিনারেল ওয়াটার, কোমলপানীয় এমনকি মদও মুক্তিপণ তালিকায় থাকে। সুন্দরবনে সরাসরি অর্থসহ দ্রব্যাদি গ্রহণ করা ছাড়াও ব্যাংকের অনলাইনে ও টিটির মাধ্যমে মুক্তিপণের অর্থ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর ১শ ৭ জেলেকে গত নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে অপহরণ করা হয়েছিল। তাদের ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে তিনজন ট্রলার মালিক ডাকাতদের হাত থেকে মুক্ত করেন। অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে খুলনায় এ টাকা পাঠানো হয় বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ট্রলার মালিকরা জানান।
সর্বশেষ খবর হচ্ছে, সুন্দরবনের দুবলার চরের শুঁটকিপল্লীসহ বিভিন্ন চরে ২৩ ডিসেম্বর থেকে তিনদিন ধরে বনদস্যু জুলফিকার বাহিনী ও গামা বাহিনী বেপরোয়া তা-ব চালিয়েছে। এ সময় দস্যুদের হামলায় শতাধিক জেলে-বহদ্দার ও বনজীবী আহত হন। বনদস্যুরা কোটি টাকা মুক্তিপণের দাবিতে  কক্সবাজারের বিশিষ্ট হোটেল ব্যবসায়ী ‘হোটেল সেন্টমার্টিন’-এর মালিকের ছেলে দিদারুল ইসলামসহ দুবহদ্দার ও ১৫ জেলেকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে। এ সময় বনদস্যুরা জেলেদের ব্যবহৃত প্রায় ৫০ লাখ টাকার মালামাল লুট করার ঘটনায় দুবলাসহ ওই এলাকার ৯টি চরে শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণে নিয়োজিত সহস্রাধিক জেলে-বহদ্দারের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
দুবলা ফিশারম্যান গ্র“পের চেয়ারম্যান মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন জানান, গত ২৩ ডিসেম্বর থেকে ২৫ ডিসেম্বর সুন্দরবনের শুঁটকিপল্লী দুবলার চর, শ্যাওলার চর, নারকেলবাড়িয়া, আলোরকোল, মেহেরআলীর চর, মাঝেরখাল, অফিসকেল্লাসহ বিভিন্ন শুঁটকিপল্লীতে বনদস্যু জুলফিকার বাহিনী ও গামা বাহিনীর কয়েক দফা হামলায় শতাধিক জেলে ও বনজীবী আহত হয়। এদের মধ্যে পিরোজপুর জেলার তুষখালীর সোহরাব এবং খুলনার পাইকগাছা উপজেলার অলিয়ার ও কৃষ্ণপদের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাদের খুলনার একটি বেসরকারি কিনিকে ভর্তি করা হয়েছে। এ ঘটনার পর দস্যুরা আলোরকোল ও মেহেরআলীর চর জেলেপল্লীতে হামলা চালিয়ে জেলেদের গণপিটুনি দিয়ে মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। এ সময় দস্যুরা মৎস্য ব্যবসায়ী শিবপদ বিশ্বাসের কাছ থেকে নগদ সাড়ে ৬ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় এবং মৎস্য ব্যবসায়ী খোকনের ম্যানেজার কুতুবউদ্দিনকে বেধড়ক মারপিট করে আহত করে। পরে তারা ‘দুবলা ফিশারম্যান গ্র“পের’ অফিসে হামলা চালিয়ে কর্মচারীদের মারধর করে মালামাল নিয়ে যায়। এছাড়া এক সপ্তাহের মধ্যে শুঁটকিপল্লীর প্রতিটি ঘর থেকে ৩০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেছে।
দুবলা শুঁটকিপল্লীর বহদ্দার সিরাজুল ইসলাম জানান, বনদস্যুদের হামলা ও গণডাকাতির পর তাদের কয়েক কোটি টাকার পুঁজি খাটিয়ে স্থাপিত দুবলার শুঁটকিপল্লীতে আতঙ্ক ও হতাশার ছায়া নেমে এসেছে। এদিকে অব্যাহত তা-বে দুবলা শুঁটকিপল্লীর কয়েক হাজার জেলে ও বহদ্দার তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে তিনি জানান।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মিহির কুমার দে জানান, সম্প্রতি সুন্দরবনের গহিনের চর এলাকাগুলোর শুঁটকিপল্লীতে বনদস্যুদের বেপরোয়া মারপিটে অনেক জেলে-বহদ্দার আহত ও দিদারুল ইসলাম নামের কুতুবদিয়া এলাকার এক বহদ্দারকে অপহরণ করেছে বলে তিনি সংবাদ পেয়েছেন।
কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের স্টাফ অফিসার লে. বদরুদ্দোজা জানান, দুবলার চরের শুঁটকিপল্লীসহ বিভিন্ন এলাকায় তিনশতাধিক জেলের ঘরে বনদস্যুরা ডাকাতি, লুটপাট, হামলা ও অপহরণের খবর পেয়ে কোস্টগার্ডের একটি টিম সিজিএস-বগুড়া নামের একটি জাহাজ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বনদস্যুদের দমনে অভিযান শুরু করেছে।
কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের কমান্ডার মোঃ শহীদ জানান, সুন্দরবনের শুঁটকিপল্লীতে হামলার ঘটনা জানতে পেরে তাদের একটি দল ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছেন। পরিস্থিতি মোকাবেলায় দুবলার চরে তাদের
আরেকটি ইউনিট বাড়ানো দরকার বলে তিনি জানান।

%d bloggers like this: