• Categories

  • Archives

  • Join Bangladesh Army

    "Ever High Is My Head" Please click on the image

  • Join Bangladesh Navy

    "In War & Peace Invincible At Sea" Please click on the image

  • Join Bangladesh Air Force

    "The Sky of Bangladesh Will Be Kept Free" Please click on the image

  • Blog Stats

    • 313,975 hits
  • Get Email Updates

  • Like Our Facebook Page

  • Visitors Location

    Map
  • Hot Categories

বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব

মেজর ফারুক (অবঃ)

ভূমিকা

 

নির্দিষ্ট সীমান্ত একটি রাস্ট্রের মৌলিক বৈশিষ্টের কয়েকটির মধ্যে অন্যতম। সুনির্দিষ্ট সীমান্ত বিহীন কোন রাস্ট্রের অস্তিত্বই কল্পনা করা যায়না। এজন্য একটি রাস্ট্রের পক্ষে – সীমান্ত চিহ্নিত করে তার যথাযথ সংরক্ষন যেমন জরুরী, তেমনি জরুরী – সে সীমান্তের মধ্য দিয়ে যে কোন বহিঃশক্তির আগ্রাসন, অনুপ্রবেশ, অবাধ চলাচল, চোরাচালান, মানব পাচার ইত্যাদি প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রন করা।

 

সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের ভূখন্ডকেই আমরা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর থেকে স্বাধীন ভূমি হিসেবে লাভ করেছি।

https://i1.wp.com/newsleaks.in/wp-content/uploads/2011/05/Indo-Bangladesh-flag.jpg

১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা স্বাক্ষরিত সীমান্ত চুক্তি মোতাবেক বাংলাদেশের বেরুবাড়ী ছিটমহলটি সংবিধান সংশোধন করে ভারতকে হস্তান্তর করা হয়; বিনিময়ে ভারত বাংলাদেশকে তার ছিটমহল আংগরপোতা-দহগ্রামে যাবার জন্য ৩ বিঘা করিডোর হস্তান্তরের কথা ছিল; কিন্তু গত ৪০ বছরেও ভারত সেই ৩ বিঘা করিডোর বাংলাদেশকে হস্তান্তর করেনি।

https://i0.wp.com/www.thedailystar.net/forum/2007/october/tin06.jpg

https://i2.wp.com/exclave.info/Tin-Bigha/tinbighamap.jpg

 

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চুক্তি স্বাক্ষর করেও সে চুক্তিকে অমান্য করা এবং প্রতিবেশী দেশের উপর অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, প্রাকৃতিক, সামরিক, রাজনৈতিক, কুটনৈতিক ইত্যাদি নানাবিধ বৈরী আচরন করে লক্ষ্যস্হ প্রতিবেশীকে তার নিয়ন্ত্রনে রাখার কৌশল অবলম্বন – ভারতের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্য চানক্য কুটনীতির বিষয় বলেই প্রতীয়মান।

 

আর ভৌগোলিকভাবে ৩ দিক থেকেই ভারত দ্বারা পরিবেষ্টিত বিধায় ভারতের বৈরী আচরন ও আগ্রাসনের শিকার বাংলাদেশ।

 

সীমান্তে আগ্রাসন

 

সীমান্তে ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশ যে সব বৈরী আচরণের শিকার হচ্ছে- তার কিছু উদাহরন হলোঃ

 

(১) সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশী মানুষ হত্যা করা।

(২) সীমান্ত দিয়ে মাদক দ্রব্য ও বেআইনী অস্ত্র পাচার করা।

(৩) সীমান্ত দিয়ে ব্যাপক চোরাচালান।

(৪) সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ করে অপহরণ, ধর্ষণ, নির্যাতন ইত্যাদি অপরাধ করা।

(৫) বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নিরাপত্তা চৌকিতে হামলা করা যেমন- রৌমারীতে তকালীন বিডিআর পোস্টে আক্রমন করা হয়েছিল।

(৬) বাংলাদেশের সীমান্ত সংলগ্ন ভূমি দখল করা।

(৭) বাংলাদেশের সমূদ্র সীমায় জাগরিত তালপট্টি দীপ দখল করন।

(৮) বাংলাদেশের সমূদ্র সীমার দুই-তৃতীয়াংশ জুড়ে ভারতের অবৈধ দাবী উত্থাপন।

(৯) বছরে প্রায় ২২০০০ নারী ও শিশুকে পাচার করে তাদেরকে ভারতের বিভিন্ন পতিতালয়ে এবং কল-কারখানায় দাস হিসেবে ব্যবহার করা।

(১০) বেরুবারীর বদলে তিন বিঘা করিডোর হস্তান্তর না করা-ইত্যাদি।

 

বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে আঘাত স্বরুপ যে-সব কর্মকান্ড ভারত এ যাবত গ্রহণ করেছে সেগুলো হলোঃ

 

(১) ১৯৭১ সালেই মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারত বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারকে বাধ্য করে ৭ দফা চুক্তি স্বাক্ষরে- যার মাধ্যমে বাংলাদেশের মর্যাদা একটি সার্বভৌমত্বহীন রাস্ট্রে নামিয়ে আনা হয়।

 

(২) ১৯৭১ সালে ৯ মাস  ব্যাপী মুক্তিযুদ্ধে আমাদের লক্ষাধিক মুক্তিসেনা এবং পুরো জাতি যে সংগ্রাম ও ত্যাগ তিতীক্ষা বরন করেছে তাকে অস্বীকার করে পাকিস্তানী বাহিনীকে পরাজিত করার একক দাবীদার হিসেবে ভারত নিজেকে আবির্ভূত করে । কিন্তু বাস্তবতা হলো এই যে- বাংলাদেশের লক্ষাধিক মুক্তিযোদ্ধা এবং পুরো জাতি মিলে পাকিস্তানী বাহিনীকে পর্যুদস্ত না করলে এবং যৌথ বাহিনীকে সমর্থন না করলে – ভারত কোন দিনই পাকিস্তানী বাহিনীকে পরাস্ত করতে পারতো না।

 

(৩) মুজিব-ইন্দিরা স্বাক্ষরিত ২৫ বছরের গোলামী চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও পররাস্ট্র নীতি ভারতের উপর নির্ভরশীল করা হয়েছিল।

 

(৪) ভারত ১৯৭৫ সালের পর কাদেরীয়া বাহিনীকে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় দীর্ঘদিন যাবত হামলা পরিচালনায় সহায়তা দিয়েছে।

 

(৫) ভারতের কোলকাতায় বসে ‘বঙ্গভুমি আন্দোলন’ নামক বাংলাদেশ বিরোধী বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ মিটিং মিছিল ও সভা–সমাবেশ করে, যাদের দাবী – বাংলাদেশের দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলে একটি হিন্দু রাস্ট্র গঠন করা।

 

(৬) ভারত বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী চাকমা সন্ত্রাসীদেরকে দীর্ঘদিন যাবত অস্ত্র, গোলাবারুদ, রসদ, আশ্রয় ও প্রশিক্ষণ দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় ৩৫০০০ মানুষকে হত্যা করতে সহায়তা করেছে। ভারতের মাটিতে বসে তারা আজো বাংলাদেশ বিরোধী প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে। বাস্তবে এটি হলো বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের প্রক্সি যুদ্ধ।

 

(৭)  ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী কর্তৃক পাখির মত গুলি করে বাংলাদেশী নাগরিকদের হত্যা করা হয়। মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী – ২০০০ সালের জানুয়ারীর প্রথম থেকে চলতি ২০১১ সালের আগষ্টের ৩১ তারিখ পর্যন্ত ভারত ৯৯৮ জনকে হত্যা, ৯৯৬ জনকে আহত,  ৯৫৭ জনকে অপহরন, ২২৬ জনকে গ্রেফতার এবং ১৪ জনকে ধর্ষণ করেছে।

 

(৮) ভারত বাংলাদেশকে কাঁটাতারের বেড়া দ্বারা ঘিরে ফেলে পৃথিবীর বৃহত্তম কারাগারে পরিণত করেছে।

 

(৯) ভারত বাংলাদেশে প্রবেশকারী ৫৪ টি আন্তর্জাতিক নদীর উপর বাঁধ নির্মাণ করেছে এবং টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে- যা বাংলাদেশের বৃহত্তম সিলেট অঞ্চলকে মরুভুমিতে পরিণত করবে।

 

(১০) ভারত ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে গঙ্গা নদীর পানি উজানে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী সরকার গ্যারান্টি ক্লজ ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্ততার বিধান ছাড়াই গঙ্গা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে কিন্তু এযাবত কোন বছরেই ভারত বাংলাদেশকে পানির ন্যায্য হিস্যা দেয়নি। এছাড়া, একসাথে ফারাক্কার সবগুলো গেইট খুলে দিয়ে প্রতি বছর বাংলাদেশে কৃত্রিম বন্যা সৃষ্টি করছে। ফারাক্কা বাঁধের কারনে বাংলাদেশের নদীতে নাব্যতা কমে অনেক নদী সরু খালে পরিনত হয়েছে; উত্তরাঞ্চলে দেখা দিয়েছে মরুকরণ,আর্সেনিকে আক্রান্ত হয়েছে প্রায় অর্ধ কোটি মানুষ।

 

(১১) ভারত হাসিনা সরকারের সহায়তায় বাংলাদেশকে তার গোয়েন্দা বাহিনীর বিচরণ ক্ষেত্রে পরিণত করেছে; বাংলাদেশের ভিতর থেকেই ‘র’ এর সদস্যরা এখন হরহামেশা মানুষ ধরে নিয়ে যায়।

 

(১২) ভারত ‘ব্যাগ ভরতি টাকা এবং মন্ত্রনা’ দিয়ে বাংলাদেশের গত নির্বাচন তথা রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছে বলে লন্ডনের ‘ইকোনোমিষ্ট’ পত্রিকা তথ্য বের করেছে।

 

(১৩) ভারত জেএমবি নামক উগ্রবাদী গোষ্ঠী তৈরীতে মদদ দিয়ে বাংলাদেশকে তথাকথিত ইসলামী জঙ্গীদের দেশ হিসেবে বহিঃর্বিশ্বে উপস্থাপন করতে চায়।

(১৪) ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল বলে ভারতীয় লেখকেরাই এখন স্বীকার করছেন।

https://i0.wp.com/www.zyzyo.com/wp-content/uploads/2010/11/Research-and-Analysis-Wing-of-India.jpg

ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা 'র'

(১৫) বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বিরোধী করিডোর সুবিধা আদায়ের উদ্দেশ্যে ভারত  ‘সহযোগিতার জন্য কাঠামো চুক্তি’ স্বাক্ষর করেছে এবং বাংলাদেশের সকল সেক্টরে অনুপ্রবেশের সুযোগ হাতিয়ে নিয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব দারুনভাবে ব্যাহত হবে।

 

(১৬) ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের স্বাধীনতা আন্দোলন দমন এবং বিতর্কিত অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে চীনের সাথে সম্ভাব্য সংঘর্ষে বাংলাদেশের ভূমিকে ব্যবহার করার পরিকল্পনা নিয়ে তার সামরিক কার্যক্রমে বাংলাদেশকে জড়িয়ে ফেলার পরিকল্পনা নিয়েছে- এবং এ উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের বুক চিড়ে তার সামরিক বহর চলাচলের জন্য করিডোর সুবিধা আদায় করেছে।

 

(১৭) বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশী নাগরিকদের হত্যা করা হলেও সেসব হত্যাকান্ডকে স্বাভাবিক মৃত্যু বলে আক্ষায়িত করার জন্য ভারতীয় বিএসএফ প্রধান ঢাকায় বসে নছিহত করে গেছেন।

 

সরকারের প্রতি প্রস্তাবিত আহবানঃ

 

ভারতের উপরোল্লেখিত আচরনের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য সরকারের প্রতি নিম্নোক্ত আহবান জানানো জরুরীঃ

 

(ক) সীমান্তে হত্যা, নির্যাতন, অপহরন, ধর্ষণ ইত্যাদি মানবাধিকার লংঘনের বিরুদ্ধে শক্ত কুটনৈতিক প্রতিবাদ জানানো এবং এসব অপরাধ বন্ধ না হলে জাতিসংঘের শরণাপন্ন হওয়া;

https://i1.wp.com/www.shahidulnews.com/wp-content/uploads/2011/01/felani.jpg

(খ) সীমান্তে ভূমি দখল, সশস্ত্র আগ্রাসন এবং সামরিক স্থাপনা নির্মান থেকে ভারতকে বিরত রাখা এবং কোন ভূমি ভারতের কাছে হস্তান্তরকরণ থেকে বিরত থাকা;

 

(গ) বাংলাদেশের অর্থনীতি, কৌশলগত নিরাপত্তা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব পরিপন্থী করিডোর প্রদানের কার্যক্রম থেকে ফিরে আসা;

 

(ঘ) গঙ্গা পানি চুক্তি অনুসারে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহন, টিপাইমূখ বাঁধ নির্মানে ভারতকে বিরত রাখা, স্থল ও সমূদ্র সীমানায় ভারতকে অন্যায্য দাবী-দাওয়া তোলা থেকে বিরত রাখা এবং ফারাক্কা বাঁধের কারনে ক্ষতিপূরন আদায়ের ব্যবস্থা নেয়া;

https://i0.wp.com/beaverdamsss.com/wp-content/uploads/2011/09/Tipaimukh-Dam.jpg

প্রস্তাবিত টিপাইমূখ বাঁধ

 https://i2.wp.com/www.globalwebpost.com/farooqm/writings/bangladesh/farakka/farakka.jpg

(ঙ) মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি অনুযায়ী ১৯৭৪ সালে বেরুবাড়ী হস্তান্তরের বিনিময়ে ৩ বিঘা করিডোর সম্পূর্নভাবে বিনিময় করতে এবং তালপট্টি দ্বীপ ভারতের দখলমুক্ত করতে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহন;

https://wakeupbd.files.wordpress.com/2011/10/location.gif?w=226

(চ) সীমান্তে চোরাচালান ও মানব পাচার বন্ধকরণ; এযাবত বিএসএফ এর হাতে ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য আন্তর্জাতিক নিয়মানুসারে ক্ষতিপূরন আদায়ের ব্যবস্থা করন;

 

(ছ) ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যসমূহে চলমান স্বাধীনতা আন্দোলন দমনে এবং চীনের সাথে ভারতের সম্ভাব্য কোন সামরিক সংঘর্ষে বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহারের ভারতীয় পরিকল্পনার অংশ হওয়া থেকে বিরত থাকা;

 

(জ) পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদীদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা দান থেকে বিরত থাকতে প্রতিবেশী রাস্ট্রের সাথে দক্ষ কুটনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহন;

 

(ঝ) তিস্তার পানি বন্টন চুক্তিকে করিডোর প্রদানের সাথে সম্পরকিত না করা এবং ভবিষ্যতে তিস্তা চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার ব্যবস্থা রাখা;

 

(ঞ) পিলখানায় ৫৭ জন অফিসারকে হত্যার পেছনের ষড়যন্ত্রকারীদেরকে সনাক্ত করতে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহন এবং সীমান্তের ৮ কিঃ মিঃ এলাকা থেকে পুলিশ-র‍্যাব তুলে এনে সীমান্তকে আরো অরক্ষিত করা থেকে বিরত থাকা;

 

( ট) বাংলাদেশে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর সকল কার্যক্রম বন্ধ করা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীন রাজনীতিতে ‘ব্যাগভরতি টাকা ও শলাপরামর্শ’ দিয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে ভারতকে বিরত রাখা।

 

(ঠ) সদ্য স্বাক্ষরিত ‘সহযোগিতার জন্য কাঠামো চুক্তি’ অনুসারে বাংলাদেশের সকল সেক্টরে ভারতীয় অনুপ্রবেশের সুযোগ সৃষ্টিকরন থেকে বিরত থাকা।

 

তারিখঃ ১৬ অক্টোবর ২০১১।

ইমেইলঃ farukbd5@yahoo.com

//  

 

ট্রানজিট-করিডোর : আঞ্চলিক সংযোগ নয়, বিচ্ছিন্নকরণের নীলনকশা

ড. আবুল কালাম আযাদ

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার ভারতীয় উপমহাদেশ ত্যাগের আগে কেবিনেট মিশন পরিকল্পনা নামে স্বাধীন ভারতবর্ষের জন্য যে স্বশাসন প্রস্তাব পেশ করেছিল তাতে সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশকে একটি ফেডারেল সরকারের অধীনে অ, ই ও ঈ—এই তিনটি ভাগে ভাগ করার কথা বলা হয়েছিল। অ অঞ্চল নির্ধারিত হয়েছিল বর্তমান পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত এলাকা, ই অঞ্চলের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল বর্তমান ভারতের পশ্চিমাঞ্চল এবং ঈ অঞ্চলের মধ্যে রাখা হয়েছিল ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বর্তমান বাংলাদেশসহ সমগ্র বঙ্গ ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ‘সাতবোন’ নামে খ্যাত সাতটি
রাজ্য। এই বিভক্তির প্রস্তাব করা হয়েছিল অঞ্চলগুলোর ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক নৈকট্যের (geographic and economic integration) বিবেচনায়।
কিন্তু নেহরু-প্যাটেলের একগুঁয়েমির কারণে ‘কেবিনেট মিশন পরিকল্পনা’ ভণ্ডুল হয়ে গেলে ভারত বিভক্তি যখন অনিবার্য হয়ে পড়ে, তখন এই পরিকল্পনায় প্রস্তাবিত ঈ অঞ্চলকেও ভাগ করে বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ ও উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্যকে বর্তমান বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। এর ফলে উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্য বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাদের আমদানি-রফতানির জন্য পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা বন্দরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে; কিন্তু বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ে কলকাতা বন্দর উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্য থেকে ১৫০০ কিলোমিটারের অধিক দূরত্বে অবস্থিত এবং সংযোগ পথও খুবই সংকীর্ণ ও দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল। ফলে কার্যত উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্য ভূমি বেষ্টিত বা খধহফ ষড়পশবফ হয়ে পড়ে। যে চট্টগ্রাম বন্দর ছিল উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্যের স্বাভাবিক গন্তব্য (Natural destination) এবং যে বাংলাদেশ ছিল এই রাজ্যগুলোর অর্থনৈতিক সহযোগী (Economic partner), ভারতের শাসকরা সুচিন্তিত নীতিমালা, সুপরিকল্পিত কৌশল ও সাম্প্রদায়িক প্রচারণার মাধ্যমে উত্তর-পূর্ব ভারতের এই সাতটি রাজ্য ও বাংলাদেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিভাজনের জন্য কেবল সব ধরনের ব্যবস্থাই গ্রহণ করেনি; বরং এই বিভাজনকে স্থায়ীরূপ দেয়ার জন্য নিত্যনতুন কৌশল উদ্ভাবন এবং প্রয়োগও করেছে। বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্য ও বাংলাদেশের মধ্যে অর্থনৈতিক যোগাযোগকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য তাদের গৃহীত বিভিন্ন কর্মপন্থার কয়েকটি চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স ও ত্রিপুরা চেম্বার অব কমার্সের যৌথ সমীক্ষায় (Enhancing the Trade and Investment between Bangladesh and Northeast India) উদ্ধৃত করা হয়েছে। এখানে অবশ্য উল্লেখ্য, তত্কালীন পাকিস্তানি শাসকদের প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় বাংলাদেশ (তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান) সীমান্তের এ পাশ থেকেও ভারতীয় শাসকদের ঔপনিবেশিক নীতির পরিপূরক নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্য ও বাংলাদেশের বৃহত্তর জনসমষ্টি অর্থনৈতিক বিভাজনের শিকার হয়ে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আমরা জানি, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের স্থিতি অনুযায়ী বাংলাদেশে ভারতের তিন বিলিয়ন ইউএস ডলারের অধিক রফতানির বিপরীতে ভারত বাংলাদেশ থেকে আমদানি করে মাত্র তিনশ’ মিলিয়ন ইউএস ডলারের দ্রব্যসামগ্রী—অর্থাত্ বাংলাদেশে ভারতের প্রতি ১০০ টাকা রফতানির বিপরীতে তারা আমাদের দেশ থেকে আমদানি করে মাত্র ১০ টাকার পণ্যসামগ্রী। পূর্বোল্লিখিত চট্টগ্রাম ও ত্রিপুরা চেম্বারের যৌথ সমীক্ষায় আরও অস্বাভাবিক যে বিষয়টি আমাদের গোচরে এসেছে তা হলো উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্য, যেগুলো অর্থনৈতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশের চেয়ে অনগ্রসর, যে রাজ্যগুলো বাংলাদেশের Natural Hinterland হিসেবে পরিগণিত হয় সেই সাত রাজ্যের সঙ্গেও বাংলাদেশের বাণিজ্য শুধু নগণ্যই নয়; বাণিজ্যের স্থিতিও বাংলাদেশের পাঁচ/ছয় গুণ প্রতিকূলে—অর্থাত্ বাংলাদেশের ১ টাকার সামগ্রী রফতানির পরিবর্তে ‘সাতরাজ্য’ থেকে বাংলাদেশে আসে ৬ টাকার পণ্য। এই তথ্য পরিসংখ্যান থেকে এ বিষয়টি স্পষ্ট যে, ভারতীয় নীতি-নির্ধারকরা বাংলাদেশকে শুধু ঔপনিবেশিক বাজারের মতোই গণ্য করে না, বাংলাদেশের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্যের ভৌগোলিকভাবে যে অর্থনৈতিক সংযোগ ব্রিটিশ শাসনের কাল থেকে বিদ্যমান ছিল তাকে সুকৌশলে বিচ্ছিন্ন করেছে, যাতে এই রাজ্যগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংযোগটা (Economic Integration) কোনোক্রমেই নিবিড় না হয়। বলাবাহুল্য, ভারতীয় নীতি-নির্ধারকদের এই দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের স্বাধীনতা উত্তরকালেও বহাল ছিল এবং আজও আছে। চট্টগ্রাম ও ত্রিপুরা চেম্বারের যৌথ সমীক্ষায় উল্লিখিত অনেক উদাহরণ থেকে মাত্র একটি উল্লেখ করলেই এই বক্তব্যের যৌক্তিকতা প্রতিপন্ন হবে। বাংলাদেশ থেকে আমদানির জন্য উত্তর-পূর্ব ভারতের সাত রাজ্যের আমদানিকারকদের L/C Margin দিতে হয় ২০, ৫০ এমনকি ১০০ পার্সেন্টও নয়; বরং ১১০% এবং ভারতীয় আমদানিকারকদের উরত্বপঃড়ত্ এবহবত্ধষ ড়ভ ঋড়ত্বরমহ ঞত্ধফব ঙভভরপব থেকে Import-export Code Number সংগ্রহ করতে হয়। গৌহাটি ও শিলংয়ে সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য এ রকম দুটি অফিস থাকলেও বাংলাদেশ সংলগ্ন ত্রিপুরা রাজ্যকে এই অফিসগুলোর আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। এই রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় এই রাজ্যের আমদানিকারকদের DGFT-এর কলকাতা অফিসের অধীনে রাখা হয়েছে যাতে ত্রিপুরার আমদানিকারকরা বাংলাদেশ থেকে আমদানির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়ে নিরুত্সাহিত (Discouraged) হয়।
বাংলাদেশের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতরাজ্যের সহজাত অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাধাগ্রস্ত করার এই ভারতীয় নীতির অর্থনৈতিক মাশুল গুনছে এই রাজ্যগুলোর সাধারণ জনগণ এবং পরোক্ষভাবে বাংলাদেশও। তবে এত কিছুর পরও নিছক ভৌগোলিক কারণে উত্তর-পূর্ব ভারতের অর্থনীতিকে ভারতের মূল অর্থনীতির সঙ্গে দৃঢ়ভাবে সংযুক্ত করা সম্ভব হয়নি। আর তাই ভারতের প্রয়োজন বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে একটি করিডোর কিংবা ট্রানজিটের ব্যবস্থা। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ট্রানজিট সুবিধা অর্জনের জন্য ভারত জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে চক্রান্তের জাল বিস্তার করেছে। এশিয়ান হাইওয়ের রুট ভারতের পশ্চিমাঞ্চল থেকে বাংলাদেশের চট্টগ্রামের মধ্য দিয়ে যাতে মিয়ানমারে যেতে না পারে সে জন্য ভারত রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে মিয়ানমারকে দিয়ে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করিয়েছে। ফলে এশিয়ান হাইওয়ের রুট নির্ধারিত হয়েছে ভারতের পশ্চিমাঞ্চল থেকে বাংলাদেশের বেনাপোল হয়ে সিলেটের তামাবিল পয়েন্ট দিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের দুর্গম পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে মিয়ানমারকে সংযুক্ত করার মাধ্যমে। এর ফলে এশিয়ান হাইওয়ে থেকে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম বাদ পড়লেও ভারতের পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতরাজ্যকে যুক্ত করার ভারতের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করার পথ উন্মুক্ত হয়েছে। আর আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব Regional Connectivity’র দোহাই দিয়ে এই প্রস্তাবে সায় দিয়েছে। কিন্তু Regional Connectivity’র এই যুক্তি যে নিছক ভাঁওতাবাজি তার প্রমাণ মিলেছে যখন চীনের মধ্যস্থতায় মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে চীনের কুনমিং থেকে চট্টগ্রাম হয়ে কলকাতাকে সংযুক্ত করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে তাতে ভারত ঘোরতর রকমের আপত্তি জানিয়েছে।
উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্যকে সমুদ্রপথে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত করার জন্য ভারত চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশকে হাজার কোটি ডলারের আয়ের লোভও দেখানো হয়েছে। কিন্তু ভারতকে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করতে দিয়ে হাজার কোটি টাকা সার্ভিস চার্জস্বরূপ আয়ের স্বপ্ন যারা দেখেছিলেন তাদের আশার গুড়ে বালি ছিটানো হয়েছে ১০ জানুয়ারি ২০১০ নয়াদিল্লিতে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-ভারত সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে। ভারতকে এশিয়ান হাইওয়ের নামে ট্রানজিট সুবিধা আগেই দেয়া হয়েছে, আর ১০ জানুয়ারির চুক্তির মাধ্যমে ভারতকে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে বস্তুত করিডোর দেয়া হয়েছে। ভারতের জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ নদীবন্দরকে পোর্ট-অব-কল নির্ধারণ করা হয়েছে। বন্দর হিসেবে আশুগঞ্জের উন্নয়নের জন্য এবং আশুগঞ্জকে মাত্র পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরবর্তী ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য সংযোগপথ নির্মাণের বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ভারতীয় জাহাজ মেঘনা নদী হয়ে আশুগঞ্জে ভিড়বে, সেখান থেকে কন্টেইনার ভর্তি পণ্যসামগ্রী সংযোগ সড়কের মাধ্যমে ত্রিপুরা সীমান্তে পৌঁছে দেয়া হবে। আবার উত্তর-পূর্ব ভারতের পণ্যসামগ্রী আশুগঞ্জ বন্দর থেকে কলকাতা বন্দর হয়ে বহির্বিশ্বে এবং ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে পৌঁছে দেয়া হবে। আশুগঞ্জ ও কলকাতা বন্দরের মধ্যে একটি ফিডার সার্ভিসের মাধ্যমে উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্য শুধু ভারতের পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গেই যুক্ত হবে না বরং সারা বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত হবে। সারা পথে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী ও কাস্টমসের সংশ্লিষ্টতা থাকবেই না কিংবা থাকলেও তা হবে খুব সামান্য। এতদিন উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্যকে আমরা খধহফ ষড়পশবফ ভূখণ্ড হিসেবেই জানতাম, ১০ জানুয়ারি ২০১০ চুক্তির মাধ্যমে সেই ভূখণ্ডটি এখন বহির্বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত হবে। চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্যের নির্ভরতা আর থাকবে না। ভারত বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করবে না। অতএব চট্টগ্রাম বন্দরের সেবা (Service) বিক্রি করে ভারতের কাছ থেকে হাজার কোটি টাকা আয়ের স্বপ্ন যারা দেখেছিলেন তাদের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে বলে আমি আশঙ্কা করছি। আর ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে বাংলাদেশ থেকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার ভারতীয় ঔপনিবেশিক পরিকল্পনাও পাকাপোক্ত হবে। ফলে ভারতের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি ভবিষ্যতে কমার পরিবর্তে বরং আরও আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাবে।
লেখক : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান
E-mail:abulkalamazad1952@yahoo.com
Source : Amardesh
%d bloggers like this: