• Categories

  • Archives

  • Join Bangladesh Army

    "Ever High Is My Head" Please click on the image

  • Join Bangladesh Navy

    "In War & Peace Invincible At Sea" Please click on the image

  • Join Bangladesh Air Force

    "The Sky of Bangladesh Will Be Kept Free" Please click on the image

  • Blog Stats

    • 277,638 hits
  • Get Email Updates

  • Like Our Facebook Page

  • Visitors Location

    Map
  • Hot Categories

৭ই মার্চের ভাষণ— “জয় পাকিস্তান” বিতর্ক

আমরা এখানে দুই জনের বক্তব্য তুলে ধরবো। তাদের এক জন হলেন নির্মল সেন এবং অপর জন হলেন মোহাম্মদ তাজাম্মুল হোসেন (আমাদের প্রাপ্ত তথ্যমতে উনি গত বছরে ইন্তেকাল করেছেন)। উনারা দু’জনেই রেস্কোর্স ময়দানে উপস্থিত থেকে নিজ কানে ভাষণ সুনেছিলেন।

  • লেখক : সাংবাদিক ও রাজনীতিক…নির্মল সেন

১ মার্চ ১৯৭১ সাল। প্রেস ক্লাবে বসেছিলাম। হঠাৎ শুনলাম একটি কণ্ঠ। সেই কণ্ঠের অধিকারী প্রেস ক্লাবে ঢুকেই বলল, ‘সর্বনাশ হো গিয়া’। আমি তার দিকে তাকালাম। সে লোকটি আর কেউ না, পাকিস্তান ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আসরার আহমদ। তখন সারা পাকিস্তানে এই ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নই একমাত্র অবিভক্ত ছিল। আমি আসরারের দিকে তাকালাম, বললাম ‘কেয়া হুয়া?’ আসরার সবেমাত্র পিআইএ বিমানে রাওয়ালপিন্ডি থেকে ঢাকায় পৌঁছেছে। সে বলল, পাকিস্তানে প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া জাতীয় সংসদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে। এর ফল যে ভালো হবে না তা সবাই জানে। ৭ ডিসেম্বর নির্বাচন হয়েছে, শেখ মুজিবুর রহমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। তারই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া নানা টালবাহানা করে শেখ সাহেবকে মন্ত্রিসভা করতে ডাকছেন না। কারণ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অন্য একটি ধারণা এবং পরিকল্পনা ছিল। সেনাবাহিনী ভেবেছিল, শেখ সাহেব নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। বাকি দলগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। তাই তাদের কাছে নির্বিঘ্নে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। কিন্তু জনতার রায় ছিল ভিন্ন। তারা শেখ সাহেবকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিল। কিন্তু সামরিক বাহিনী শেখ সাহেবকে ক্ষমতা দিতে রাজি নয়। তাই নানা টালবাহানা শুরু করেছিল। সর্বশেষ ইয়াহিয়া বলেছিল, ৩ মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসবে। কিন্তু সেই অধিবেশন না বসার খবর নিয়েই বিভ্রান্ত হয়ে আসরার ঢাকায় এসেছিল।

এছাড়া আসরারের ঢাকা আসার অন্যতম কারণ ছিল, এ পরিস্থিতিতে কি করা যায়, তা পরামর্শ করতে হবে। তার সাধারণ সম্পাদক মিনহাজ বার্না পাকিস্তান টাইমসের প্রতিনিধি। তিনি ঢাকায় থাকেন। তার সঙ্গে আলাপ করতে হবে। আর ইউনিয়নের প্রধান নেতা হলো খন্দকার গোলাম মোস্তফা, যিনি সমধিক কেজি মোস্তফা নামে পরিচিত। তার সঙ্গে পরামর্শ না করে ইউনিয়ন চলতে পারে না। এই দুই কারণে আসরার ঢাকায় এসেছিল। কেজি মোস্তফা যে সারা পাকিস্তানের সাংবাদিকদের মধ্যে এত জনপ্রিয় তা বোঝাতে হলে একটি ঘটনার কথা বলি।

পাকিস্তানের শেষ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সম্মেলন বসেছে ইসলামাবাদে। তখন ইউনিয়নে আলোচনা চলছিল, প্রুফ রিডার ও কাতিবদের ইউনিয়নে সদস্য পদ দেওয়া হবে কি-না। পূর্ব পাকিস্তানে প্রুফ রিডাররা আগেই ইউনিয়নের সদস্য ছিল। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানে কাতিবরা ছিল না। রাওয়ালপিন্ডি সম্মেলনে আমি একটি প্রস্তাব তুললাম, এবারে কাতিবদের ইউনিয়নের সদস্যপদ দেওয়া হোক। পশ্চিম পাকিস্তানের সদস্যরা একযোগে চিৎকার করে উঠল, না হবে না। আমি বললাম আপনারা কি জানেন আমার প্রস্তাবের সমর্থক কেজি মোস্তফা। এ কথা শুনে সবাই চুপ করে গেল। সবাই পরে বলল তোমার প্রস্তাব এক বছরের জন্য স্থগিত থাক। শুধু কেজি মোস্তফা নামের গুণে এটা সম্ভব হয়েছিল। এ ধরনের ছিল সারা পাকিস্তানের সাংবাদিকদের মধ্যে কেজি মোস্তফার জনপ্রিয়তা। আজকে কেজি মোস্তফা ঢাকায় থাকেন। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখি করেন। তবে ইয়াহিয়ার ঘোষণায় যে প্রতিক্রিয়া হলো তা আমরা অচিরেই টের পেলাম। সেদিন দুপুরে হোটেল পূর্বাণীতে আওয়ামী লীগের সংবাদ সম্মেলন ছিল। সে সম্মেলন ছাত্র এবং জনতা, অফিস কর্মচারীসহ সবাই ঘেরাও করল। তাদের দাবি এখনি বাংলাদেশ স্বাধীন করতে হবে। সমস্ত বাংলাদেশে আকাশ-বাতাস মথিত হলো একটি শ্লোগানে। সেই শ্লোগানটি হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাই; স্বাধীন বাংলা চাই। অবাঙালিদের সঙ্গে আমরা থাকব না। সেদিন বুঝিয়ে-সুঝিয়ে জনতাকে শেখ সাহেব নিবৃত্ত করলেন। বলা হলো, রেসকোর্সে ৭ মার্চ শেখ সাহেব ভাষণ দেবেন। আমরা সেই ৭ মার্চের ভাষণের জন্য গভীর প্রতীক্ষায় ছিলাম। এর মধ্যে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ স্বাধীনতা ঘোষণা পাঠ করেছে। স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেছে। শেষ পর্যন্ত ৭ মার্চ এলো। তারপর ৭ মার্চ রেসকোর্স লোকে লোকারণ্য। দক্ষিণ রমনা কালীবাড়ি, উত্তরে ঢাকা ক্লাব, মানুষ যেন উপচে পড়ছে। চারদিক মানুষ যেন আসছে আর আসছে। সবার হাতে লাঠি। এ যেন রেসকোর্সে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন করবে। সবার কণ্ঠে স্বাধীনতা চাই। আজকে এ মুহূর্তে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা চাই, মঞ্চে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা। তাদের কণ্ঠে আমাদের নেতা পাকিস্তানের পার্লামেন্টে যাবেন না। শেখ মুজিব পাঞ্জাবিদের পার্লামেন্টে যাবেন না। পাঞ্জাবিদের পার্লামেন্ট মানি না মানি না, সবাই হাতে অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর।

শেখ সাহেব জনসভায় আসার আগেই জনসভা মুখরিত হয়ে উঠল। এক দফা এক দাবি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা। আমাদের নেতা পাঞ্জাবিদের পার্লামেন্টে যাবেন না।

এর মধ্যে শেখ সাহেব জনসভায় এসে পৌঁছলেন। তখন লাখ জনতার কণ্ঠে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবি, তারা বারবার বলছে, পাঞ্জাবিদের পার্লামেন্টে আমাদের নেতা যাবেন না। এরপর বজ্রনির্ঘোষের মতো গগনবিদারী কণ্ঠে তার ভাষণ শুরু করলেন। এমন সুলিখিত ভাষণ কোনোদিন শুনিনি। কি ভাষণ? আর শেখ সাহেবের কি গগনবিদারী কণ্ঠ? গোটা জনসভায় এক উন্মাদনা সৃষ্টি করল। শেখ সাহেবের ভাষণের মাঝে মাঝে পেছনের দিকে তাকাচ্ছিলেন। পেছনে ছিল ছাত্রলীগ নেতারা। তিনি এবারের সংগ্রাম, মুক্তি সংগ্রাম বলে একটু থামলেন এবং পেছনে ছাত্রলীগ নেতা সিরাজুল আলম খানের কাছে কি যেন জিজ্ঞাসা করলেন। তারপর তিনি বললেন, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান। শেখ সাহেবের মঞ্চে সামনের সারিতে চেয়ারে আমি ও আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী বসে ছিলাম, যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো। শেখ সাহেবের ভাষণের প্রতিটি অক্ষর গোগ্রাসে গিলছিলাম। এরপর সভা ভাঙল। জনতার একটি অংশের মনে যেন কিছু না পাওয়ার ক্ষোভ থেকে গেল। তারা সবাই ওইদিনই চেয়েছিল শেখ সাহেব স্বাধীনতা ঘোষণা করুক। কিন্তু তা শেখ সাহেবের পক্ষে আদৌ সম্ভব ছিল না। তিনি অনুভব করেছিলেন, সংগ্রামের সময় উপস্থিত না-ও থাকতে পারেন। এই দুরদৃষ্টির ফলে তিনি বলেছিলেন আমি যদি নির্দেশ দিতে না পারি তাহলে তোমাদের কাছে নির্দেশ রইল যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করবে। এরচেয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আর কি নির্দেশ থাকতে পারে? আজকে যারা বলেন, শেখ সাহেব সেদিন স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি, তারা কি বলতে পারেন এর চেয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা বেশি কী হতে পারে? আজকেও একদল লোক বলেন, জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই স্বাধীনতার ঘোষক সম্পর্কে আমি বলতে চাই, স্বাধীনতার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নির্মাণ করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি সব তৈরি করে গিয়েছিলেন এবং সে ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান নিশ্চয়ই সাহস দেখিয়েছেন। কিন্তু সে সাহস হলো একজন বেতার ঘোষকের সাহস। তার আগে এবং পেছনে সবকিছু প্রস্ট‘ত করে রেখেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তবে একথা সত্য, শেখ সাহেব ৭ মার্চের বক্তব্যের শেষদিকে বলেছিলেন, ‘জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান’।

আমি জানি, আমার এ বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক আছে, কানাডা থেকে একদল ছেলে লিখে জানিয়েছেন, আপনি মিথ্যা লিখেছেন। কানাডা কেন? ঢাকারও অধিকাংশ লোকের বিশ্বাস আমি মিথ্যা বলেছি। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমার স্মৃতি আমাকে বিভ্রান্ত করেনি। এবং আমার মতে, সেদিন জয় পাকিস্তান বলে শেখ সাহেব সঠিক কাজ করেছিলেন। একজন বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। ৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কে আমি একটি ভিন্ন কথা শুনেছি। বিশেষ করে বামপন্থী মহল এটা বলেছে। তারা সমালোচনা করেছে, শেখ সাহেব স্বাধীনতা ঘোষণা দিলেন না কেন? আবার একই মুখে বলেছেন শেখ সাহেব বুর্জোয়া নেতা। তিনি কিছুতেই স্বাধীনতা ঘোষণা দিতে পারেন না। আমার মত হচ্ছে, জয় পাকিস্তান না বলে কোনো উপায় ছিল না। তখনো আলোচনা শেষ হয়নি। ক’দিন পর ইয়াহিয়াদের সঙ্গে আলোচনা করার কথা। একটি লোকও স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত নয়। সেদিন যদি জয় পাকিস্তান না বলে শুধু ‘জয় বাংলা’ বলতেন এবং স্বাধীনতার ঘোষণা দিতেন তাহলে ইয়াহিয়া বাহিনী মারমুখী আক্রমণ করত। লাখ লাখ লোক প্রাণ হারাতো। তখন এই মহলটিই বলত জনতাকে কোনো প্রস্তুত না করে এ ধরনের স্বাধীনতা ঘোষণা বালখিল্যতা। এ জন্যই অসংখ্য লোকের প্রাণহানি হয়েছে এবং এর জন্যই শেখ মুজিবের বিচার হওয়া উচিত।

এছাড়া ‘জয় পাকিস্তান’ বলা সম্পর্কে আমার সঙ্গে শেখ সাহেবের আলাপ হয়েছিল। আমি বললাম, আপনি জয় পাকিস্তান বললেন কেন? শেখ সাহেবের মুখ কালো হয়ে গেল। এরপর তিনি বললেন, ‘আমরা খাবার টেবিলে ছেলেমেয়ে সবাই খেতে বসতাম। প্রথমে আমরা এক হাতের পাঁচটি আঙ্গুল অপর হাতের একটি আঙ্গুল অর্থাৎ ছয়টি আঙ্গুল দেখাতাম। অর্থাৎ এই ছয়টি আঙ্গুল ছিল ছয় দফা। পরে পাঁচটি আঙ্গুল নামিয়ে ফেলতাম। বাকি থাকত একটি আঙ্গুল। অর্থাৎ এক দফা। অর্থ হচ্ছে ছয় দফার শেষ কথা হচ্ছে এক দফা বাংলাদেশের স্বাধীনতা। সেদিন পাঁচ আঙ্গুল নামিয়ে ফেলার পর আমার কনিষ্ঠপুত্র রাসেল জিজ্ঞাসা করেছিল। তুমি আজকের জনসভায় জয় পাকিস্তান বলতে গেলে কেন?

আমি কি রাসেলের প্রশ্নের জবাব আপনাকে দেব? আমাকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে হলে অনেক পথ অতিত্রক্রম করতে হবে। ইয়াহিয়ার সামরিক সরকারকে শেষ কথা বলতে হবে। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে ভুট্টো। তার সঙ্গেও কথা বলতে হবে। আমি এই আলোচনা শেষ না করে কিছু করলে পৃথিবীতে আমি জবাবদিহি করতে পারব না। আমি এখন ভালো অবস্থানে আছি। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হয়েও আমাকে ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে না। এই প্রেক্ষিতে আমি কিছুটা aggressive হতে পারি মাত্র, এর বেশি কিছু নয়। আমাকে আমাদের সেনাবাহিনী ও সরকারের কর্মচারীদের সঙ্গে আলাপ করতে হবে। সেই আলাপ এখনো শেষ হয়নি। সবদিকে এত অপ্রস্তুত রেখে একটি দেশকে আমি সংগ্রামের মুখে ঠেলে দিতে পারি না। আপনি কি বোঝেন না ওইদিন চারদিকে শত্রু বেষ্টিত অবস্থায় আমার অন্য কিছু বলার ছিল না। এই হচ্ছে ৭ মার্চ শেখ সাহেবের বক্তব্য সম্পর্কে আমার ব্যাখ্যা। আমার এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে এখনো অনেক মন্তব্য শুনি। কিন্তু তাদের কি স্মরণ নেই, ২৫ মার্চ কি অগোছালো অবস্থায় স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়েছিল? এটা যদি ৭ মার্চ হতো তাহলে আরো লাখ লাখ প্রাণ আমাদের হারাতে হতো। একথা কি সত্য নয়? যারা সেদিন শেখ সাহেবের সমালোচনা করেছিলেন, তারা বুকে হাত দিয়ে বলুন, শেখ সাহেব কি ভুল করেছিলেন? ওই ভুলটুকু না করলে আপনারা কোথায় পালিয়ে যাবেন সে সন্ধানও করার সময় পেতেন না। শেখ সাহেব যে ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছিলেন তার অন্যতম সাক্ষী আমার অনুজপ্রতিম সাংবাদিক লন্ডন প্রবাসী আবদুল গাফফার চৌধুরী। আমি জানি না, সে কথা আজ তার মনে আছে কিনা। তবে তিনি আমার সঙ্গে জনসভায় প্রথম সারিতে বসে ছিলেন।

  • মোহাম্মদ তাজাম্মুল হোসেন

বাংলাদেশে স্বাধীনতার ঘোষক প্রসঙ্গ নিয়ে শেখ হাসিনা মুজিবকে ছোট করছেন।

Saturday, 04 July 2009 00:00

১৯৪৯ সালের জুন থেকে ২০০৯ সালের জুনে আওয়ামী লীগ এদেশের একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে ষাট বছর পুরণ করলেও নির্বাচনে সৎভাবে জিতেছে মাত্র দু’বার। ১৯৭০ ও ১৯৯৬ এ। ২০০৮ এর নির্বাচনে যে ডিজিটাল কারচুপি হয়েছে, তা তো এখন পরিষ্কার। ১৯৭৩ এর নির্বাচনটি ছিল প্রহসন মাত্র; ৭০ এর চেয়েও কারচুপি হয়েছিল অনেক বেশী; তবুও এসব বিজয়ের যদি মোট ভোটার সংখ্যার পাটিগণিত কষা যায় তাহলে তারা দল হিসেবে নির্বাচনে জিতলেও অধিকাংশ ভোটার বা জনগণের সমর্থন পায় নি। ১৯৭০ এর সেই নৌকার হৈ হৈ রৈ রৈ এর প্রপ্যাগান্ডার চরম বিপরীতে ঐ দলটিকে ভোটাররা ভোট দিয়েছিল মাত্র ৩৭% বা ঐ সংখ্যক মানুষ। অর্থ্যাৎ ৬৩ ভাগ ভোটার বা সেই অর্থে জনমানুষ ওদের নৌকায় ভোট দেয়নি। ১৯৭৩ এর নির্বাচন ছিল ৭০ এর নির্বাচনেরই সংস্করন মাত্র-ভিন্ন কিছু নয়। এরপর ১৯৯৬ এর নির্বাচনে ঐ দলটি আরও কম ভোট পেয়েছিল-৩৪%। আর ২০০৮ এর নির্বাচনে যে ৪৭% ভোট তাদের বাক্সে পড়ে তার ডিজিটাল কারচুপির গোমর কেবল ফাঁক হওয়া শুরু করেছে। মঈন গংরা এজন্য যে আজ হোক-কাল হোক অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় হবেই তা বোধ করি এখন সঠিক আন্দাজের ব্যাপার মাত্র। তবুও যদি এই ৪৭% ভাগ যুক্তির খাতিরে ওদের সমর্থক বলে ধরে নেই, তবুও সেই সংখ্যা যে সংখ্যাগুরু নয়, বরং সংখ্যালঘু অর্থ্যাৎ ৫০% ভাগের কম, তা তো পাটিগণিতই বলে দেয়। মোট কথা হল যে আওয়ামী লীগের এবসলিউট জনসমর্থন বলতে কেউ কেউ যা বুঝাতে চান বলে বাংলাদেশে এই ২০০৯ সালে আছে তা সঠিক হিসেব নয়। এই হিসেবে আরও ধ্বংস নামানো শুরু করেছেন শেখ হাসিনা স্বয়ং এবং এর একটি প্রধান নেতিবাচক বিষয় হল-শেখ মুজিবকে নিয় তার মারাত্মক এবং প্রতিহিংসামূলক অত্যধিক বাড়াবাড়ি।

শেখ মুজিব বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে বাংলাদেশ এর স্বাধীনতা আন্দোলনে নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন। আর এই ভূমিকায় যেমন দেশের অনেক মানুষ তাকে সমর্থন দিয়েছিল, তিনি সমর্থন পেয়ে বড় নেতাও হয়েছিলেন, তেমনি অন্যদিকে নিজের সীমাবদ্ধতার জন্য অনেক কিছু নিন্দনীয় কাজও করেছেন। অর্থ্যাৎ ভাল-মন্দ উভয় দিকই তার ছিল-যেমন থাকে প্রতিজন মানুষেরই। তাই যার যার ঐতিহাসিক মূল্যায়ন ইতিহাসই করে। আর ইতিহাস যেহেতু শুধুমাত্র আজকের বা এখনকার বিষয় মাত্র নয়, বরং সুদীর্ঘকালের বিষয়, তাই কালের ইতিহাসের বিচারই এক একজন নামকরা মানুষ এবং সেই অর্থে বড় রাজনীতিকের সঠিক বিচার রেকর্ড হয়। নিজের পিতা মুজিবের জন্য হাসিনার ভালবাসা, ভাবাবেগ, উচ্ছাস ইত্যাদি থাকাই স্বাভাবিক, কিন্তু সেই একক বা এমনকি সেই বিশেষ দলীয় ভাবাবেগ, মূল্যায়ন ইত্যাদি সবই সঠিক এবং নিরপেক্ষ হবে এমন কোন বিষয় সঠিক নাও হতে পারে। বাংলাদেশের সব মানুষই তাই মুজিবকে এক বাক্যে হাসিনার ভাবাবেগে মূল্যায়ন করে গ্রহন করে তা নয়। হবার কোনই যুক্তি নাই। এমনটি কেউ দাবী করলে তা বালখিল্যময় ছাড়া অন্য কিছুই হবার কথা নয়।

একটু ইতিহাসের পিছনে তাকালে দেখা যাবে যে মুজিব শুধুমাত্র বাংলাদেশ স্বাধীনতা আন্দোলনের বিগত ষাট দশকের নেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একই সাথে পাকিস্তানেরও নেতা। শুধু কি তাই? তিনি বিগত চল্লিশের দশকে পাকিস্তান কায়েম করার আন্দোলনের যুবক ছাত্র নেতা ছিলেন। কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে তখন তিনি পড়াশুনা করতেন। এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বিশেষ করে তার কলকাতার গার্ডিয়ান ছিলেন। সেই সময়ে সেই কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে আরও যারা তার সাথে পড়াশুনা করতেন, তাদের কয়েকজন এখনও প্রায় ৯০ কোটায় পা দিয়ে বেঁচে আছেন। আমার সাথে তাদের যোগাযোগও আছে এখানে ঢাকায়। এ ধরনের কেউ কেউ নিজ নিজ ‘জীবনস্মৃতি’ও লিখেছেন। এসব বিশ্বাসযোগ্য তথ্যে মুজিবের জন্ম এবং শিশুকালের এমন কিছু বিষয় নথিবদ্ধ হয়েছে যা এদেশের খুব কম লোকই জানে। যেমন মুজিবের ফস্টার ফাদার (বাইওলজিক্যাল ফাদার নন) মুহুরী শেখ লুৎফর রহমান এফিডেভিট করে নিজের পুত্র হিসেবে প্রায় তিন বছর বয়সে দেবদাস চক্রবর্তীকে শেখ মুজিবর রহমান নামে গ্রহণ করেন এবং একইসাথে মুজিবের মা অবিবাহিতা গৌরবালাকে মুসলমান করে বিয়ে করেন। সেই এফিডেভিট এর নম্বর ১১৮ ও তারিখ ১০/১১/১৯২৩ইং (কলকাতা সিভিল কোর্টে) উল্লেখসহ সেখানে নথিবদ্ধ হয়ে আছে। এই কারণে মুজিবের নানা চন্ডীদাসের এবং তার অবৈধ পিতা অরুন চক্রবর্তী এর নামের উল্লেখ কোথাও সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না। যদিও বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ নয় কেননা, কারও জন্মের জন্য সে নিজে দায়ী নয়; জন্মের ব্যাপারটা বাইওলজিক্যাল বিষয় মাত্র যা স্রষ্টা নিজেই বিশেষ নিয়মে বেঁধে দিয়েছেন। তাছাড়া শেখ লুৎফর রহমান যখন যে কারণেই হোক না কেন একটি পরিত্যক্ত অনাথ শিশুকে নিজ মহৎগুনে নিজের ছেলে হিসেবে কোলে টেনে নিয়েছিলেন তা কোন ছোট বিষয় ছিল না। তবে যেহেতু তার পারিবারিক দারিদ্র প্রকট ছিল, এবং যে কারণে ফরিদপুর কোর্টে পাকিস্তান হবার পর একটি রেকর্ড সাপ্লাইয়ার (পরে পদোন্নতি পেয়ে পেশকার হিসেবে অবসর নিয়েছিলেন) অতি স্বল্প বেতনে চাকুরী করতেন, তাই মুজিবকে কলকাতার হোস্টেলে রেখে পড়াশুনা ও হোস্টেল খরচ চালাবার তার সামর্থ ছিল না। আর এ কারণেই সোহরাওয়ার্দীর গার্ডিয়ানশীপ এবং প্রতিদিন দশটি টাকা দাক্ষিণ্য মুজিবের কলকাতার জীবন ধারনের বলা যায় একমাত্র উপায় ছিল। এর মধ্যে মাঝে মধ্যেই বন্ধু বান্ধবদের পকেট হাতড়াতেন মুজিব। বছর দুই হল এমনি একজন বড় ইঞ্জিনীয়ার মাহবুবুর রহমান ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। তাঁর শেষ দিনগুলিতে আমার খুবই অন্তরঙ্গতা ছিল। মুজিবের ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ীর প্রায় ৩০০/৪০০ গজ পূর্বদিকে প্রধান সড়কের পাশেই কলাবাগানে তাঁর বাড়ী। তিনিই একদিন কলকাতার একটি ঘটনার বিষয় আমাকে বলেন। একদিন সকালবেলা হঠাৎ হন্তদন্ত মুজিব এসে তাঁর পাঞ্জাবীর পকেটে হাত দেন। পকেটে তখন নাকি তাঁর মাত্র একটি টাকা ছিল। মুজিব ওটি হাতড়িয়ে নেন। বলেন, তোরা সবাই এই সকালে নাস্তা খেয়েছিস, আমি খাই নাই, পয়সা নাই, এই বলেই মুজিব ঐ টাকাটি হাতড়িয়ে নিয়ে পাশেই এক দোকানে নাস্তা খেতে বসে যায়। আর এক বন্ধু সেই ইসলামিয়া কলেজেরই ছাত্র সেই ১৯৪০ এর দশকের। তিনি একদিন ঢাকায় অন্য আর একজনের কাছে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। নিয়ে গিয়েছিলেন এজন্য যে, সেই বন্ধুটি মুজিবের হয়ে বি.এ. পরীক্ষা দিয়েছিলেন। অন্য আর একজন এখানে এখন বড় শিল্পপতি তিনি দাবী করেছেন যে তিনি কোন কোন সময় মুজিবের পরীক্ষায় নকল সাপ্লাই করতেন। মরহুম সৈয়দ মুজিবুল্লাহ ভাই এর কাছে শুনেছি যে, এই দুই ব্যক্তি ও মুজিব কলকাতায় হরিহর আত্মা ছিলেন। তবে উনি আমাকে এমন বিস্তারিত কিছু বলেননি যে, তারা দু’জন মিলে সোহরাওয়ার্দীর জন্য কি কি অপকাজ করতেন। তবে মুজিবুল্লাহ ভাই আমাকে নিশ্চিত করে বলেছিলেন যে, তিনি বাংলাদেশ স্বাধীন হলে পর ১৯৭২ এ যখন ‘দালাল আইনে’ তার নামে গ্রেফতারী পরোয়ানা ঝুলছিল এবং তিনি আত্মগোপন করেছিলেন, এমনি একদিন সুযোগ বুঝে দালাল আইনের সেই গ্রেফতারী পরোয়ানাটি বগলদাবা করে ৩২ নং এর বাড়ীতে শেখ মুজিবের বেড রুমে ঢুকে সেই পরোয়ানা বাতিল করার অর্ডার লিখে নিয়েছিলেন। জেলে য়েতে হয়নি। পুরাতন বন্ধুত্বকে তিনি অনেক দাম দিতেন-যা প্রমাণ করে যে তিনি ছিলেন একজন Man of Heart, বিপরীতে যে তিনি একজন Man of Head ছিলেন অনেক কম তা মাওলানা ভাসানী প্রায়ই বলতেন।

মুজিবকে নিয়ে আমার ব্যক্তিগত জানা-শোনা স্মৃতিচারণের এমন কোন কারণ নেই যে আমি তাকে ছোট করতে চাই। বরং প্রধান কারণ এই যে, একটি সাধারণ নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন সন্তান হিসেবে তার প্রথম জীবনের পরিচিতিটা গোপন না করে সবারই জানা উচিত। জানা উচিত এ কারণে অন্ততঃ যে পূর্ব বাংলার একজন সাধারণ নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে হয়েও তিনি নিজের বিশেষ বিশেষ গুণে নেতৃত্বের একটি উঁচু পর্যায়ে উঠেছিলেন। একইসাথে এটিও সুস্থ্যভাবে স্মরণ করা যে সেই চলিশ দশকে যদি পূর্ব বাংলা নিজস্ব ভৌগলিক সীমানা সঠিক ও আলাদাভাবে সুনিশ্চিত করতে কোন কারণে ব্যর্থ হত, তাহলে এখানকার অনেকের মত বিশেষ করে নিম্নবিত্ত মুসলমান ঘরের সন্তানদের ভাগ্যটা বৃটিশ পরবর্তী সময়ে কি হত? পূর্ব বাংলা কি পশ্চিম বাংলার ও কলকাতা দীলির একটি অতি ক্ষুদ্র অঞ্চল এবং ক্ষুদ্র অঞ্চলের নগন্য বিষয়ের মত স্বাধীন ভারতে বিবেচিত হত না? জ্যোতিবসু, বুদ্ধদেব বসু প্রমুখদের তুলনায় পূর্ব বাংলার নিম্ন মধ্যবিত্ত মুসলমানদের সন্তানাদি বড় বড় রাজনীতিবিদ হওয়াতো দূরের কথা, ক’জন কলকাতা রাইটার্স বিল্ডিং এ বড় সড় আমলাতে দূরের কথা শেখ লুৎফর রহমানের চেয়ে বেশ বড় কিছু ক’জন হত? এসব বিষয় মুজিব বুঝতেন না তা আমি বিশ্বাস করি না। কেননা, মুজিব যত কম মেধারই একজন ব্যক্তি হয়ে থাকুন না কেন, এই বিষয়গুলি বুঝতেন বলেই আমি ধরে নিতে চাই। কেননা, তিনি সোহরাওয়ার্দীর খাস লোক ছিলেন। আর সোহরাওয়ার্দী ছিলেন ব্যক্তি পর্যায়ে উদার এবং অসাম্প্রদায়িক হওয়া সত্ত্বেও জাতপাত ভেদের হিন্দু ভারতে মুসলিম জাতিসত্ত্বার স্বাতন্ত্র এবং আজাদী প্রশ্নে তার কোন তিলমাত্রও দ্বিধা দ্বন্দ্ব ছিল না। ১৯৪৬ সালের ৯ই এপ্রিল তিনি যে এক পাকিস্তান কায়েম করার জন্য দীল্লি লেজিসলেটরস কনভেনশনে উত্থাপিত প্রস্তাবটির প্রিএমবেলটিতে শব্দাবলী চয়ন করেছিলেন তারই তা উজ্জ্বল প্রমাণ। সেই সোহরাওয়ার্দীর খাস ব্যক্তি মুজিব এমনকি একাত্তরের মার্চ এর চরম ট্রায়িং মোমেন্টে সোহরাওয়ার্দীর মননের থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন তা বিশ্বাস করা যায় না, কেননা, বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নে মারাত্মক কঠোর ছিলেন সোহরাওয়ার্দী জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত বৈরুতে হোটেলে ইন্তে কালের সময় পর্যন্ত। এর প্রমাণ আমার জানা আছে।

আওয়ামী লীগ বা মুজিবের ছয় দফা পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসনের প্রশ্নে একটি ফরমুলা ছিল সন্দেহ নাই। কিন্তু এর মধ্যে যেমন ছিল না পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার প্রশ্ন, তেমনি ছিল না তা পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ফের কলকাতা দীল্লির আজ্ঞাবাহী হবার ইচ্ছা। বিচ্ছিন্নতাবাদকে মুজিব বারবার ধিক্কার দিয়েছিলেন-শুধুমাত্র ১৯৭০ এর নির্বাচনের পরেই নয়-আগেও ছয় দফার প্রচারণা চালানোর সময়কালে।

দূর্ভাগ্যবশতঃ যারা শেখের ৭ই মার্চ (৭১) এর ভাষণের খন্ডিত অংশ বিশেষ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ প্রচার করে তারা হাতির বাইরের দাঁত দুটি দেখেছেন আসলে খাবার দাঁতগুলি দেখেননি। কেননা, এরপর এ দিনই সেই রেসকোর্সের ময়দানের মঞ্চে যে বাংলাদেশের আলাদা পতাকাটি হাফ-মাস্ট এ বাঁধা ছিল, এবং যা অন্যদের মতে তার উঠানোর কথা ছিল- স্বাধীনতা ঘোষণার প্রতীক হিসেবে তা তিনি করেননি, শুধু তাই না, ওদিকে তিনি ভ্রুক্ষেপও করেননি-মঞ্চ থেকে জয় বাংলা-জয় পাকিস্তান স্লোগান দিয়ে হঠাৎ করে তাড়াহুড়ো করে নেমে গিয়েছিলেন-যা আমার স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। ঐদিন একই বিষয়ে আমার একজন বন্ধু ও এম.পি. সফর আলী মিয়া ইঞ্জিনীয়ার এর কাছে স্বাধীনতা ঘোষণা প্রশ্নে বাজি ধরে আমি হেরে গিয়েছিলাম বটে। অর্থাৎ আমি স্থির ছিলাম যে মুজিব একতরফা বা UDI স্বাধীনতা ঘোষণা দিবেন, এবং তিনি অর্থাৎ সফর আলী মিয়া ইঞ্জিনীয়ার বাজি ধরে বলেছিলেন যে, মুজিব স্বাধীনতা ঘোষণা দিবেন না। উনি সঠিক ছিলেন, কারণ উনি মুজিবের অতি ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীই ছিলেন না, ফাইনান্সিয়ারও ছিলেন বটে। একই কারণে সত্তর এর নির্বাচনে প্রাদেশিক একটি সিট থেকে (নারায়নগঞ্জের) নমিনেশনও পেয়েছিলেন।

শেখ মুজিব যে ২৫শে মার্চ দুপুর রাতে পাক সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন বা গ্রেফতার যাই বলুন না কেন হবার আগে সেই রাতের সর্বশেষ সঙ্গীদের মধ্যে ডঃ কামাল যিনি কিনা রাত সাড়ে দশটায় সেই বিশেষ টেলিফোন কলটি না পেয়ে ৩২ নং এর বাড়ীটি ছেড়ে গিয়েছিলেন, অন্যদিকে প্রায় একই সময়ে তাজুদ্দীন শেখের সর্বশেষ নির্দেশ ২৭শে মার্চ হরতাল সফল করার জন্য আদেশটি মাথায় করে বিদায় নিয়েছিলেন, তা নিয়ে অনেক সঠিক আলোচনা অনেকেই করেছেন, তাই এ নিয়ে আমি আর এখানে বেশী কিছু বলা অপ্রয়োজনীয় মনে করি। তবে সেই রাত সাড়ে দশটার দুই ঘন্টা আগে যে মুজিবের প্রাইভেট সেক্রেটারী মফিজউদ্দীনকে মুজিব হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল এ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবার শেষ আশায় ভূট্টোর কাছে পাঠিয়েছিলেন, তা বিবিসি এর সূত্র উলেখ করে প্রবীন সাংবাদিক সেরাজুর রহমান ৩০শে জুন এর একটি নিবন্ধে (নয়াদিগন্ত, ঢাকা) গোমর ফাঁস করে দিয়েছিলেন। শুধু কি তাই? তিনি বাংলাদেশের একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা করার কথা তখনও যে ভাবেননি, তা যেমন বুঝা যায়, তেমনি আরও নিশ্চিত হওয়া যায় যে, তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদীর দুর্নাম কোনভাবেই নিতে চাননি। আর এরই প্রমাণ তিনি রেখেছেন ভিন্ন ভিন্ন নির্ভরযোগ্য ডকুমেন্ট এ।

প্রথমে বলা যায় ইয়াহিয়ার সাথে মুজিবের সেই ১৯৬৯ সালের মার্শাল ল’ এর আগের থেকে ঘনিষ্ঠতার বিষয়। এর বিস্তারিত বিবরণ আছে পাঞ্জাবের পুলিশের প্রাক্তন প্রধান সরদার মুহম্মদ চৌধুরীর The Ultimate Crime বইটিতে (পৃঃ ৯৮-৯৯)। এ কারণেই যেমন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া মুজিবকে ‘পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী’ বলে সত্তুর এর নির্বাচনের পরই সম্বোধন করা শুরু করেছিলেন, তেমনি মুজিবও ‘অন্ততঃ এক ঘন্টার জন্য হলেও’ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবার নেশায় বিভোর ছিলেন, মুখে পাবলিক কনসাম্পশন এর জন্য অনেক ও ভিন্ন হম্বিতম্বি করলেও। এরই বাড়তি প্রমাণ দিয়েছেন, মুজিবের একাত্তরে ‘ট্রিসন’ মামলার প্রধান কৌশলী এ.কে.ব্রোহী। ব্রোহী তাঁর মৃত্যুপূর্ব ঘোষণায় লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৯৮৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে Impact International পত্রিকার সম্পাদকের কাছে যা বলেছিলেন তার সার সংক্ষেপ ছিল নিম্নরূপঃ ‘Mujibur Rahman was being tried on the charge that he had been working for the secession of East Pakistan and according to Brohi he had absolutely denied the accusation. Brohi also personally believed that this was a true defence plea. Later on when India attacked East Pakistan, again, according to Brohi, Mujibur Rahman, offered to appear on the TV and appeal to the people of East Pakistan against Indian attack. He passed on the offer to the martial law administrator, Gen Yahya Khan. Apparently the offer was ignored.’ (Impact International, 25 Sept, 1987, P.19) উপরোক্ত বর্ণনাটির সারকথাটি ছিল এই যে, তিনি সেই যুদ্ধের সময়েও শুধুমাত্র তার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহীতার বিষয়ই অস্বীকার করেননি, একইসাথে তিনি একাত্তরের যুদ্ধে ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে পাক টিভিতে স্বয়ং বক্তব্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানীদের সেই আগ্রাসন রুখে দিতে ডাক দিতে চেয়েছিলেন..। এরপর যুদ্ধশেষে ভূট্টো পাকিস্তানের শাসনভার গ্রহণ করলে পর মুজিবকে মুক্তি দেয়ার আগে তার সাথে বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ আলোচনা করেন, যার রেকর্ড ইসলামাবাদে রাখা আছে, তার থেকে প্রখ্যাত আমেরিকান অধ্যাপক ও ঐতিহাসিক কিছু তথ্য পরিবেশন করেছেন Stanley Wolpert তাঁর Zulfi-Bhutto of Pakistan বইটিতে এভাবেঃ

…I told you it will be confederation. This is also between you and me… You leave it to me,.. absolutely leave it to me. Trust me… My idea was we will live together and we will rule this country. You know the occupation (Indian) army is there…’ (P.175)

মুজিবের এই বক্তব্যে সেই একই প্রসঙ্গ সুস্পষ্ট এবং তা হল এই যে, একইসাথে থাকার ইচ্ছা- কনফেডারেশন আকারে হলেও। তাছাড়া, অন্য আরও একটি বিষয় অতি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ভারতীয় মিত্র বাহিনীকে দখলদার বাহিনী শব্দ দুটি মুজিব এই সময়কালের প্রায় তিন বছর পরও ব্যবহার করেছেন-যখন কিনা ১৯৭৪ সালের ৩০শে অক্টোবর আমেরিকার পররাষ্ট্র সেক্রেটারী হেনরী কিসিঞ্জার ঢাকায় তার সাথে একটি সাক্ষাৎকারে মিলিত হয়েছিলেন (দেখুন আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্ট এর ডিক্লালিফাইড ডকুমেন্ট ৬ই মার্চ, ২০০৯ ঢাকায় প্রকাশিত সাপ্তাহিক হলিডে পত্রিকাটি)। অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা যে তিনি একাত্তরের ২৫শে মার্চ কোনভাবেই করেননি, বরং নিজেদের মধ্যে কনফেডারেশন আকারে হলেও ভারতের আধিপত্যমুক্ত পাকিস্তানের আজাদী বিষয় মাত্র ভেবেছিলেন, তাই প্রমাণিত হয়। আর একই বিষয়ে সেই লক্ষ্যেই নিজে প্রধানমন্ত্রী ও প্রয়োজনে ইয়াহিয়াই প্রেসিডেন্ট থাকতেন অন্ততঃ ট্রানজিশন কিছুদিনের জন্য তা সেই ১৯৬৯ সালের মাঝামাঝি সময় থেকেই আমরা ঢাকায় শুনতাম অনেকের মতই।

অতীতের সেসব অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতার পর যখন তিনি ঢাকায় ১৯৭২ এর ১১ই জানুয়ারী থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ শাসন করা শুরু করেন, তখন তিনি যাকে প্রথম এবং প্রধান টার্গেট করেন তিনি হলেন তাজুদ্দীন আহমদ। অথচ কে না জানে যে, তাজুদ্দীনই মুজিবনগর ভিত্তিক স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধান স্থপতি। এই স্থপতি ব্যক্তিটি কেন মুজিবের টার্গেট হয়েছিলেন?

প্রথম কারণটি ছিল এই যে, তিনি তাজুদ্দীনকে ২৭শে মার্চ এর হরতালসহ অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে যেতে বলেছিলেন, স্বাধীন বাংলাদেশ কায়েম করতে বলেননি। স্মরণযোগ্য যে, মুজিবের নিজের নামে মুজিবনগরটি তাজুদ্দীনরা কায়েম করলেও মুজিব নিজে ওই জায়গাটির নামটি কোনদিন সম্মানের সাথে উলেখ করেছেন বলে জানা যায়নি। তাছাড়া তার ক্ষমতায় থাকার সাড়ে তিন বছরে কোনদিন কয়েকটি মিনিটের জন্যও সেই মুজিবনগরটি তিনি ভিজিট করতে যাননি। কেন? তাজুদ্দীনের দূর্ভাগ্যের সিঁড়ি আস্তে ধীরে তাকে জেলবাস করতে বাধ্য করেছিল মুজিবের জীবদ্দশাতেই।

এখানে অন্য একটি ঘটনার বিষয় আমার মনে পড়ল। ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারী যখন শেখ মুজিব লন্ডন-দীল্লি হয়ে ঢাকার তেজগাঁও বিমান বন্দরে অবতরণ করেন তখন টারমাক থেকে তিনি যখন তাজুদ্দীন ও মোস্তাকের ঘাড়ে দু’হাত দিয়ে বেরিয়ে আসছিলেন তখন (বর্তমানে মরহুম) অধ্যাপক আফতাব আহমদ (তার জীবিত অবস্থায়) দাবী করেছিলেন যে মুজিব তাজুদ্দীনকে কিছুট নীচুস্বরে অনেকট তিরস্কারের সুরে বলেছিলেন, ‘তাজুদ্দীন শেষ পর্যন্ত তোমরা পাকিস্তান ভেঙ্গে দিলে’। আফতাব সাহেব মন্তব্যটি শুনে নাকি খুবই হতাশ হয়েছিলেন। মুজিবের এই মন্তব্যটি যদি আংশিকও তার মনের ইচ্ছা-অনিচ্ছার বিষয় হয়, তাহলে তা আরও প্রমাণ করে যে মুজিব সেই একাত্তরের মার্চে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি। তবে তার নাম ভাঙ্গিয়ে কে তার অনুপস্থিতিতে কি করেছে, সে তো ভিন্ন বিষয়। এ বিষয় তো ঐতিহাসিক সত্য যে, তিনি ১৯৭২ এর জানুয়ারীতে ডি-ফ্যাকটো বাংলাদেশ পেয়েছিলেন। ডি-জুরো বাংলাদেশ নয়।

পরে ডি-জুরো বা আইনগতভাবে বৈধ বাংলাদেশ কায়েম করার জন্য তাকে অনেক কোশেশ করতে হয়েছে। যেমন, একটি শাসনতন্ত্র প্রণয়ন-যদিও দীল্লির তদারকীতে। ডিপি ধর, পি.এন. হাসকার, প্রমুখের মত ঝানু দীল্লির আমলা ও ভারতীয় গোয়েন্দা ‘র’ এর ডাকসাইটেদের নিয়ন্ত্রণে। এরপর ১৯৭৩ এর একটি নির্বাচনের প্রহসন। এবং সবচেয়ে বড় যেটি সেটি ছিল পাকিস্তানের স্বীকৃতি আদায়ের জন্য অনেক ছাড় দেয়া। যেমন ছিল ‘যুদ্ধ অপরাধী (১৯৫)’ বিচার প্রশ্নে ‘FORGET AND FORGIVE’ বলে অঙ্গীকার করা। এরপরও যে তিনি জীবদ্দশায় চীন, সৌদি আরবসহ আরও বেশ কিছু দেশের স্বীকৃতি আদায় করতে পারেননি, তা যেমন তার মনোকষ্টের বিষয় ছিল, তেমনি ছিল আবার অন্যদিকে একাত্তর নিয়ে তার মূল দৃষ্টিভঙ্গির সঠিকতার মনোবলও। অর্থ্যাৎ তিনি যে নিজে বুঝে শুনে বিচ্ছিন্নতাবাদীতার দুর্নামের ভাগী হননি, তাতে তার আত্মতুষ্টিই ছিল, অপরাধবোধ ছিল না।

মুজিবের কম বুদ্ধিমত্তার প্রমাণের অভাব নাই। তবে একদলীয় বাকশাল ছিল এমনি বুদ্ধিহীন অপকাজ যা পঁচাত্তরে তার পতন অবশ্যম্ভাবী করে।

মুজিবকে যারা এখন শুধুমাত্র বংলাদেশের নেতা সাজিয়ে তাকে বড় করতে চান, তারা আমি মনে করি ভূল করছেন। তিনি বস্তুতঃ উভয় পাকিস্তানের সাধারণ গরীব দুঃখী মানুষের জন্য মুক্তির বিষয়ে ভাবতেন বলেই আমি বিশ্বাস করি এবং তা করার জন্য গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য সত্তুরের নির্বাচনটি ছিল একটি বড় মাইল ফলক। কার কার দোষে সেটি হয়নি সে নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে। তবে এই বিতর্কের যদি কেউ উপসংহার টানেন এভাবে যে মুজিব শুধুমাত্র এই অংশের মানুষের নেতা ছিলেন, আর পশ্চিমের কথা আদৌ ভাবতেন না, আমি অন্ততঃ তাদের সাথে একমত নই। শেখ হাসিনা বস্তুতঃ সেই ভূল পথে একপেশে হয়ে মুজিবকে শুধুমাত্র ভাবাবেগ ও প্রতিহিংসাতাড়িত হয়ে তার ধারণায় বড় করার যে সব কিছু কোশেশ করছেন, তাতে আমার মনে হয় যে তিনি শুধু ভূলই করছেন না, মুজিবকে অনেক ছোটও করছেন। স্বাধীনতার ঘোষক প্রসঙ্গটি নিয়ে তাদের চরম মিথ্যাচার তারই সর্বশেষ নজীর।

http://www.storyofbangladesh.com/blog/tmhussain/53-hasina-damaging-mujib.html

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: