• Categories

  • Archives

  • Join Bangladesh Army

    "Ever High Is My Head" Please click on the image

  • Join Bangladesh Navy

    "In War & Peace Invincible At Sea" Please click on the image

  • Join Bangladesh Air Force

    "The Sky of Bangladesh Will Be Kept Free" Please click on the image

  • Blog Stats

    • 280,481 hits
  • Get Email Updates

  • Like Our Facebook Page

  • Visitors Location

    Map
  • Hot Categories

সীমান্তে মানুষ মরছে

Source : সাপ্তাহিক ২০০০

ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ-এর গুলিতে, কখনোবা নির্যাতনে প্রতিবছর অনেক বাংলাদেশিকে প্রাণ দিতে হচ্ছে। কিন্তু তারপরও থেমে নেই সীমান্তে বিএসএফ-এর গুলিবর্ষণ, মানুষ হত্যা। লাশের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নির্যাতনের মাত্রাও সমানভাবে বাড়ছে। নিউইয়র্কের হিউম্যান রাইটস ফোরামের পরিসংখ্যান অনুসারে গত এক দশকে প্রায় ৯শ বাংলাদেশিকে বিএসএফ হত্যা করে। মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের রেকর্ড অনুযায়ী ২০০০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে গত ৩১ আগস্ট ২০১০ পর্যন্ত ৯৯৮ বাংলাদেশি নাগরিককে হত্যা করেছে বিএসএফ। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুসারে ২০০৭ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ৪ বছরে বিএসএফ গুলি ও শারীরিক নির্যাতনে হত্যা করেছে ৩শ ৪৫ বাংলাদেশিকে।


অন্য একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায় ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সীমান্তে ৩শ ১২ বার হামলা চালানো হয়। এতে ১২৪ বাংলাদেশি নিহত হয়। এর মধ্যে ১৯৯৬ সালে ১৩০টি হামলায় ১৩ জন নিহত, ’৯৭ সালে ৩৯টি ঘটনায় ১১, ’৯৮ সালে ৫৬টি ঘটনায় ২৩, ’৯৯ সালে ৪৩টি ঘটনায় ৩৩, ২০০০ সালে ৪২টি ঘটনায় ৩৯ জন নিহত হয়। জাতীয় মানবাধিকার সংগঠনের হিসাব অনুসারে ২০১০ সালে ৭৪ জনকে হত্যা করে বিএসএফ। এর মধ্যে ৫০ জনকে গুলিতে, ২৪ জনকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। কিন্তু আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুসারে গত বছর ১শ জনকে হত্যা করা হয়। এর মধ্যে ৬৫ জনকে গুলিতে এবং ৩৫ জনকে শারীরিক নির্যাতনের পর হত্যা করে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহনিী বিএসএফ। এর আগে বিএসএফ-এর হত্যার শিকার হয়েছে ২০০৯ সালে ৯৬, ২০০৮ সালে ৬২, ২০০৭ সালে ১২০, ২০০৬ সালে ১৪৬, ২০০৫ সালে ১০৪, ২০০৩ সালে ৪৩, ২০০২ সালে ১০৫ ও ২০০১ সালে ৯৪ জন বাংলাদেশি নাগরিক।

১৫ বছরে গুলিবিদ্ধ প্রায় ১২শ

বিএসএফ-এর বন্দুকের টার্গেটে পরিণত হয়ে আজো আহত অবস্থায় বেঁচে আছে প্রায় ১২শ বাংলাদেশি। এদের কেউ মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে, কেউবা আবার সারা জীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করে নিয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৩ থেকে ২০১০ পর্যন্ত ১১ বছরে বিএসএফ-এর হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্মক আহত হয়েছে ৯২৩ জন। এ ছাড়া ১৯৯৬ সালে ১৮, ১৯৯৭ সালে ১১, ১৯৯৮ সালে ১৯ জন, ১৯৯৯ সালে ৩৮ জন গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আহত হয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুসারে ২০০৭ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ২২৫ জন গুলিবিদ্ধ ও নির্যাতনে আহত হয়। এর মধ্যে ২০১০ সালে ৭১, ২০০৯ সালে ৫৪, ২০০৮ সালে ৩২ ও ২০০৭ সালে ৬৮ জন আহত হয়।

নির্যাতনের দিকে ঝুঁকছে বিএসএফ

সরাসরি গুলি করা কমিয়ে নির্যাতনের দিকে ঝুঁকছে বিএসএফ। এক্ষেত্রে তারা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে এক বাংলাদেশি নাগরিককে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্র দিয়ে জখম করে বাংলাদেশের সীমান্তে পাঠায়। সম্প্রতি নির্যাতনের পর হাত ও পায়ের রগ কেটে সীমান্ত সংলগ্ন নদীতে ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার শিংনগর সীমান্ত থেকে বিএসএফ-এর দৌলতপুর সীমান্ত ফাঁড়ির সদস্যরা ধরে নিয়ে যায় মনাকষা রানীনগর গ্রামের গোলাম নবীর ছেলে সানারুলকে। এরপর তাকে মেরে হাত-পা বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। গত ১২ সেপ্টেম্বর শিবগঞ্জ উপজেলার মনোহরপুর সীমান্ত থেকে ফটিক নামের এক বাংলাদেশিকে ধরে নিয়ে যায় ভারতের ১৫১ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের গঙ্গাচর ক্যাম্পের সদস্যরা। পরে তাকে কুপিয়ে আহত করার পর ছেড়ে দেওয়া হয়।

বিডিআর-এর ৩৯ ব্যাটালিয়নের চাঁপাইনবাবগঞ্জের অধিনায়ক লে. ক. আবু বক্কর জানায়, আগে বিএসএফ গুলি করলেও এখন এর পাশাপাশি নির্যাতনের মাত্রাও বৃদ্ধি করেছে। কিছু দিন আগে বিএসএফ আমাদের একটি লাশ ফেরত দেয়, যার সারা শরীর কালো। পরে জানতে পারি এপার থেকে এ বাংলাদেশিকে ধরে নিয়ে প্রথমে শারীরিক নির্যাতনের পর ইনজেকশন পুশ করেছে। এতে সে মারা যায় এবং তার সারা শরীর কালো হয়ে যায়। গত ৪ জুলাই সিলেটের জৈন্তাপুর সীমান্তে বাংলাদেশিদের ওপর বিএসএফ ও ভারতীয় খাসিয়ারা হামলা চালায়। এ সময় তাদের গুলিতে ১০ জন আহত হয়। জানা যায় বিএসএফ এখানে খাসিয়াদের তাদের কাজে ব্যবহার করছে। বিনিময়ে বাংলাদেশের ধানের জমিসহ অন্য ফসলি জমি কেটে নিয়ে যেতে সহায়তা করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিলেটের এক বিডিআর অফিসার জানান, বিএসএফ এখন খাসিয়াদের দ্বারা বাংলাদেশিকে ধরে নিয়ে প্রথমে পা ওপর দিকে করে ঝুলিয়ে রাখে। এরপর কুকুর দিয়ে কামড়িয়ে আহত করে। এর পরও মারা না গেলে হত্যা করা হয়। এ ধরনের ঘটনা কিছুদিন আগে ভোলাগঞ্জে ঘটেছে। বিএসএফ অফিসাররা এ ধরনের কাজে উৎসাহ দিচ্ছে। বিডিআরের সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, বিএসএফ গ্রাউন্ড রুল বারবার ভঙ্গ করছে। গ্রাউন্ড রুল অনুসারে অনুপ্রবেশের ঘটনায় গুলি ছোড়া যাবে না। কিন্তু বিএসএফকে কীভাবে বোঝানো যায়, আমি জানি না।

চলছে ধর্ষণ, অপহরণ

গত এক দশকে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৫ নারী। তাছাড়া বিএসএফ কর্তৃক অপহরণের শিকার হয়েছে ৯৩৩ এবং নিখোঁজ হয়েছে ১৮৬ জন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চুয়াডাঙ্গার এক ইউপি সদস্য জানান, বিএসএফ-এর কারণে গ্রামের অনেকে তাদের মেয়েদের অন্যত্র রেখে লেখাপড়া করাচ্ছেন। কারণ আগে বিএসএফ মদ্যপ অবস্থায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে গ্রামের বেশ কয়েকজন তরুণীর শ্লীলতাহানির চেষ্টাও করেছে। একই গ্রামের জাবেদা নামে এক মহিলা জানান, কারণে-অকারণে বিএসএফ লোকালয়ে ঢুকে বাংলাদেশি কৃষকদের অপহরণ করে নিয়ে যায়। গত ২৫ এপ্রিল সীমান্ত থেকে শাহীন নামে এক মাদ্রাসাছাত্রকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। এ শিশুর অপরাধ ছিল সীমান্তে নদীতে গোসল করতে যাওয়া। ২৩ এপ্রিল সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার বলাবাড়ি গ্রামের রবীন্দ্রনাথ ম-ল এবং তার স্ত্রী কল্যাণী রানী ম-ল ভারতের ৪ নম্বর মেইন পিলারের পাশ দিয়ে আসার সময় ঘোড়াডাঙ্গা বিএসএফ ক্যাম্পের সদস্যরা তাদের দুজনকে আটক করে। পরে তারা কল্যাণীর শ্লীলতাহানি করে এবং তার ওপর নির্যাতন চালিয়ে ভোরে ৪ নম্বর মেইন পিলারের কাছে ফেলে রেখে যায়। আর স্বামীকে তারা হত্যা করে। সিলেটের জৈন্তাপুর সীমান্ত দুর্গম হওয়ায় এখানেও ঘটছে অপহরণ-ধর্ষণের ঘটনা। জৈন্তাপুর এলাকার আবুল কালাম জানান, দুর্গম হওয়ায় এখানে বিএসএফ সহজেই অপকর্ম করতে পারে। গত মাসে তারা এখান থেকে প্রায় ১০ জনকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে। আজো তারা গ্রামে ফিরে আসেনি। বেনাপোলের আমির জামান বলেন, গত মাসে এখান থেকে একজনকে বিএসএফ অপহরণ করে নিয়ে যায়। এর জন্য মুক্তিপণ নিলেও তারা পরে লাশ ফেরত দেয়।

চোরাকারবারির সঙ্গে জড়িত বিএসএফ

সীমান্তে যেসব সংঘর্ষ হয় তার প্রায় সবই চোরাকারবারির সঙ্গে জড়িত। মাদক পাচার কিংবা গরু নিয়ে আসার সময় বিএসএফকে ম্যানেজ করে আনতে হয়। এ ক্ষেত্রে ভারতে একদল দালাল থাকে। যারা বিএসএফ-এর সঙ্গে নির্দিষ্ট টাকার বিনিময়ে চোরাচালানির নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয়। যদি দালালদের সঙ্গে টাকার ব্যাপারে মীমাংসা না হয় তাহলে বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ভারতের সীমান্তের কাছে এলেই গুলি করে। সোনামসজিদের বাসিন্দা মাসুম জানান, একজোড়া গরু আনতে পারলে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা লাভ হয়। ভারতীয় চোরাকারবারিরা বিএসএফকে এর একটা অংশ দিয়ে দেয়। যদি তারা টাকা না পায় তাহলে পদ্মা নদীতে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারে। পঞ্চগড়ের বিডিআর অফিসার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিএসএফ যদি দালালদের সহযোগিতা না করে তাহলে সীমান্তে শান্ত পরিবেশ বজায় থাকে। ভারত আমাদের কাছ থেকে ভালো জিনিসগুলো নিয়ে গেলেও মাদক, অস্ত্র আমাদের সীমান্তে পার করে দিচ্ছে। তিনি আরো বলেন, এখানে শুধু ভারতকে দোষ দিলে হবে না বাংলাদেশিদেরও দোষ আছে।”

আন্তর্জাতিক আইনে অপরাধী ভারত

আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন অনুসারে কোনো দেশ অন্য দেশের নাগরিককে হত্যা করতে পারে না। কেউ যদি অন্যায় করে তাহলে তাকে গ্রেফতার করে সে দেশের আইন অনুসারে ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু এসবের কোনোটিই বিএসএফ মানছে না। তাদের গুলিতে যত মানুষ মারা গেছে তার প্রায় সবই বাংলাদেশি। যারা হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার উল্লেখ থাকলেও কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয় না। ২১ ব্যাটালিয়নের এক অফিসার জানান, “বিএসএফ আগে শুধু গুলি করে মারলেও এখন বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মারছে। কখনোবা এমনভাবে হত্যা করা হচ্ছে লাশের কোনো পরিচয়ই পাওয়া যাচ্ছে না। সিলেটের কানাইঘাট উপজেলায় কিছুদিন আগে খ-িত লাশ পাওয়া গেছে। অথচ লাশের কোনো মাথা পাওয়া যায়নি। তিনি আরো বলেন, একে তো হত্যার কোনো নিয়ম নেই তার ওপর বিকৃতভাবে হত্যা করা হচ্ছে। যদি আইনের ভিত্তিতে বলতে হয় তাহলে বলব তারা আন্তর্জাতিক আইনে অপরাধী।

সীমানায় স্থাপনা নির্মাণের আইনও মানছে না ভারত। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। কিন্তু ভারতের চাপের মুখে ৫০ গজের মধ্যে কাঁটা তারের বেড়া নির্মাণের অনুমতি দিতে হচ্ছে। শর্ত সাপেক্ষেই ১২টি পয়েন্টে বাংলাদেশের জমিতে বেড়া নির্মাণ করতে নীতিগত সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে।

নামে মাত্র ফ্যাগ মিটিং

কোনো বিষয়ে একমত হতে কিংবা নিজেদের মধ্যে সমস্যা সমাধানের জন্য ফ্যাগ মিটিং করার নিয়ম থাকলেও এখন যা হচ্ছে তা নামে মাত্র ফ্যাগ মিটিং। এতে এখন আর কোনো পক্ষই কোনো বিষয়ে একমত হয় না। বিডিআর-এর সাবেক পরিচালক লে জে মাহবুব বলেন, আগে পূর্বনির্ধারিত সময়ে ফ্যাগ মিটিং করা হতো। কোনো সমস্যা সমাধানে ঐকমত্যে পৌঁছানো যেত কিন্তু এখন তার বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। কুষ্টিয়ার লে ক নজরুল ইসলাম জানান, ফ্যাগ মিটিং এখন আর কোনো কাজে দেয় না। গত বছর ৬৫ জনকে অপহরণ করে তারা নির্যাতন করেছে। ২০০৫ সালের পর থেকে তারা আরো বেপরোয়া হয়ে গেছে। দূর থেকে বাংলাদেশিকে দেখলেই গুলি করে। আমরা এসব বন্ধে একাধিক ফ্যাগ মিটিং করেছি। কিন্তু ফল শূন্য। ৪১ ব্যাটালিয়নের লে ক এনায়েত করিম বলেন, ফ্যাগ মিটিং ইতিবাচক কোনো প্রভাব ফেলে না। কোনো বিষয়ে মিটিংয়ে একমত হলে দেখা যায় পরের দিন তারা একই অপরাধ করে বসে আছে। তারা মিটিং করে দুঃখিত বলার জন্য। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিডিআর অধিনায়ক জানান, আমরা ফ্যাগ মিটিং করি লাশ নেয়ার জন্য। বাংলাদেশি কাউকে গুলি করে হত্যা করলে আমরা লাশ ফেরতের জন্য ফ্যাগ মিটিংয়ের আহ্বান জানাই। তারা মিটিংয়ে শুধু লাশ আমাদের বুঝিয়ে দেয়। কখনো তারা আমাদের জায়গায় স্থাপনা বা বেড়া নির্মাণ করলে ফ্যাগ মিটিং করা হয়। এগুলোর কোনোটাতে আমরা একমত হই আবার কোনোটাতে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয় না।

৯০ ভাগ হত্যা রাতে ঘটছে

গত এক দশকে বিএসএফ যত বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে তার মধ্যে ৯০ ভাগ হত্যার ঘটনা ঘটেছে রাতের বেলা। বেনাপোল সীমান্তের অধিনায়ক জানান, চোরাচালানিসহ মাদক ও গরুর ব্যবসা রাতে হয়। তাই হত্যার ঘটনাগুলোও এ সময় বেশি হয়। এতে বাংলাদেশিরা যেমন হত্যার শিকার হচ্ছে ঠিক তেমনি ভারতের চোরাকারবারির সঙ্গে জড়িতরাও মারা যাচ্ছে। তিনি আরো জানান, সীমান্তের আরো একটা বড় সমস্যা হচ্ছে ভাষা। ভারত সীমান্তে বিএসএফ-এর যারা দায়িত্ব পালন করে তাদের মধ্যে আছে কিছু উপজাতি। এরা হিন্দি কিংবা বাংলা কোনোটাই বোঝে না। সীমান্তে বাংলাদেশিরা কথা বলতে গেলে তাদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক দেখা যায়। ফলে নিজের নিরাপত্তা বিধান করে গুলি করার মাধ্যমে। নীলফামারী সীমান্তের এক বিডিআর অফিসার জানান, কিছু বাংলাদেশি রাতে প্লায়ার্স দিয়ে তারকাঁটা কেটে চোরাচালান করতে যায়। বিএসএফ কোনোভাবে বুঝতে পারলে সঙ্গে সঙ্গে গুলি করছে। কখনোবা ১৫০ গজের বাইরে থাকলেও হত্যা করে নিজ সীমান্তের ৬৫০ গজের মধ্যে লাশ ফেলে রাখছে। এই ঘটনাগুলো রাতে ঘটার কারণে সবগুলোতে বিএসএফকে অভিযুক্ত করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

অ্যাকশনে যায় না বিডিআর

‘আমাদের চাপের মধ্যে রাখা হয়েছে। বিএসএফ বাংলাদেশিদের সরাসরি গুলি করে কিংবা নির্যাতন করে হত্যা করছে। কখনো বা আন্তর্জাতিক সীমানা আইন লঙ্ঘন করে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ছে। এতে আমরা খবর পেয়ে ফ্যাগ মিটিংয়ের মাধ্যমে সতর্ক করার চেষ্টা করি, কিন্তু কোনো অ্যাকশনে যেতে পারি না’- বলছিলেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তের এক বিডিআর অফিসার। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার তসলিমউদ্দিন জানান, যেখানে বিডিআরের একটি ক্যাম্পে ৩০ বা ৩২ জন সদস্য ডিউটি দেয় সেখানে এর প্রায় তিনগুণ বিএসএফ টহল দেয়। সীমান্তে সংঘর্ষের আশঙ্কা থাকলে ভারী অস্ত্র নিয়ে বিএসএফ অবস্থান নিলেও বিডিআরের কিছুই করার থাকে না। কারণ তাদের জনবল ও ভারী অস্ত্রের অভাব আছে। সিলেট সীমান্তের এক বিডিআর অফিসার জানান, বিএসএফের বাজেট আমাদের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। কিন্তু তারপরেও আমাদের যে বাজেট ও জনবল তাতেই বিএসএফ ভয় পায়। তারা যখন হঠাৎ করে সীমান্তে অস্ত্র ও জনবল বাড়ায় তখন আমরাও বিডিআরের সমাগম করি। মাঝে মাঝে গুলি ছোড়া হলেও সেটা মূলত ভয় দেখানোর জন্য করা হয়। তিনি আরো বলেন, কম জনবলের কারণে আমরা সীমান্তে চোরাচালান বন্ধ করতে পারছি না। যেখানে কাঁটাতারের বেড়া নেই সেখানে অপকর্ম বেশি হচ্ছে। আর এ সুযোগে বিএসএফ বাংলাদেশিদের হত্যা করছে। সিলেট, মেহেরপুরে কাঁটাতারের বেড়া তেমন নেই তাই এখানে সংঘর্ষও বেশি।

দণি-পশ্চিম সীমান্তে এক বছরে  বিএসএফ-এর গুলিতে ৩২ জন নিহত

গত এক বছরে দণি-পশ্চিম সীমান্তে ৫ জেলায় ৬৭ বাংলাদেশি বিএসএফ-এর সহিংসতার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৩২ জনকে হত্যা করা হয়েছে এবং শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৩৪ জন। নিহত ৩২ জনের মধ্যে বিএসএফ ১৮ জনকে গুলিতে এবং ১৫ জনকে নির্যাতন করে হত্যা করেছে। বেশিরভাগ েেত্র হত্যার পর নিহতের লাশ কুকুর-বিড়াল বা ইতর প্রাণীর মতো টেনেহেঁচড়ে সীমান্ত নদী ইছামতী, কালিন্দি অথবা সীমান্তের অন্য স্থানে ফেলে রেখে যায়।

এ ছাড়া বিএসএফ বিনা উস্কানিতে বিভিন্ন সময় গুলিবর্ষণ করেছে ৮ বার। দণি-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে যশোর, সাতীরা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া ও মেহেরপুর জেলা সীমান্তের সঙ্গে যুক্ত। এ জেলাগুলোর সীমান্তের পরিমাণ ৬১২ কিলোমিটার। গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে ৬৭ জন বিএসএফ-এর সহিংসতার শিকার হয়েছে। গত সব ঘটনায় দফায় দফায় পতাকা বৈঠক ছাড়াও বার কয়েক দুদেশের উচ্চ পর্যায়ের সীমান্ত বৈঠক হয়েছে। ওই সব বৈঠকে নেয়া হত্যা ও নির্যাতন বন্ধে শর্ত এবং প্রতিশ্রুতি কোনোটাই রা করছে না বিএসএফ।

বিএসএফ-এর গুলিতে নিহতরা হলেন যশোরের শার্শার গয়ড়া গ্রামের আলাউদ্দিন, চৌগাছার গয়ড়া গ্রামের আনসাফুল, ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার বাঘাডাঙ্গা গ্রামের সফিকুল, মালবাড়িয়ার কিশোর সবুজ, লড়াইঘাটের বাহার আলী, পদ্মপুকুরের ওবায়দুল, সেজিয়ার আকবর, মেহেরপুর সদর উপজেলার বুড়িপোতার নজরুল, গাংনির কাজীপুরের শহিদুল, সাতীরা সদর উপজেলার ঘোনার সাইফুল, একই গ্রামের অজ্ঞাত একজন, গাংনিয়ার শরিফুল, শ্যামনগরের কালিঞ্চির আমজাদ, দেবহাটার শাকরার দয়াল, কলারোয়ার গোয়ালিয়ার কবিরুল, কুষ্টিয়ার চিতলমারীর মনছুর, বাংলাবাজারের দেলোয়ার ও দৌলতপুরের প্রাগপুরের মোক্তার। এদের মধ্যে মেহেরপুরের গাংনির শহিদুল, সদরের নজরুল, মহেশপুরের কিশোর সবুজ, চৌগাছার আনসাফুল দেশের অভ্যন্তরে নিজ েেত কাজ করা অবস্থায় বিএসএফ তাদের গুলি করে। নিহত অন্যরা গরু ব্যবসায়ী।

সূত্র আরো জানায়, বিএসএফ ১৫ জনকে নির্যাতনের হত্যা করে। এর মধ্যে যশোরের শার্শার দুর্গাপুর সীমান্তে অজ্ঞাত পরিচয় একজনের পুরুষাঙ্গ কেটে ও পিটিয়ে, সাতীরার কালীগঞ্জে শীতলপুরের শফিকুল, দেবহাটার সেকেন্দারার আজগর ও টাউন শ্রীপুরের লেনিনের শরীরের ওপর ইছামতী নদীতে স্পিডবোট তুলে দিয়ে বোটের ফ্যানের আঘাতে হত্যা করা হয়। অন্যদের মধ্যে যশোরের শার্শা উপজেলার হরিষচন্দ্রপুরের হযরত, বালুন্ডার লিটন, পুটখালীর মনির ও অজ্ঞাত একজন, শিকড়ির মজনু, গাতিপাড়ার দুসহোদর আমির ও ছমির, সাতীরার আশাশুনির প্রতাপনগরের আবদুল গাফফার, দেবহাটার টাউন শ্রীপুরের সিরাজুল, শ্যামনগর পরানপুরের আজগর ও ভোমরার অজ্ঞাত একজনকে পিটিয়ে, বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে, দা দিয়ে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে

বিএসএফ-এর নির্যাতনে আহত হয়েছে ২৪ জন। এদের অনেকে চিরপঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। অনেককে গুলি করে, কুপিয়ে, বেয়নেট চার্জ করে, পিটিয়ে তাদের মৃত বলে সীমান্ত এলাকায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে সাতীরার কলারোয়ার চান্দুরিয়া গ্রামের ইশার আলীর দুই কান কেটে নেয়া হয়, প্লায়ার্স দিয়ে নাক তুলে ফেলা হয় তার। সীমান্ত সূত্র জানায়, বিএসএফ প্রায়ই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে বাংলাদেশিদের ওপর গুলি ছোড়ে এবং অনেককে অপহরণ করে। তারা গরু-বাছুরও ধরে নিয়ে যায়। গত এক বছরে এভাবে তারা আটজনকে অপহরণ  এবং  গরু-মহিষ  লুট করেছে অন্তত ১০টি।

বিনা উস্কানিতে বিএসএফ সীমান্তে প্রায়ই গুলি ছোড়ে। এক বছরে আট দফায় ২৪ রাউন্ড গুলি ছুড়েছে তারা। এর মধ্যে ২ মে যশোরের বড়আঁচড়া সীমান্তে ২ রাউন্ড, ৪ মে সাতীরার হাড়দ্দহায় এক রাউন্ড ও ২৯ আগস্ট ২ রাউন্ড, ২ জুলাই বৈকারিতে ৪ রাউন্ড ও ১ ডিসেম্বর ৪ রাউন্ড, কাকডাঙ্গায় ৬ রাউন্ড এবং ৩০ সেপ্টেম্বর গাজীপুরে ২ রাউন্ড, ৫ ডিসেম্বর চুয়াডাঙ্গার ছোটবোয়ালদিয়ায় ৩ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এসব ঘটনায় সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষ কখনই নির্ভয়ে চলাফেরা ও তে-খামারে কাজ করতে পারছেন না।

চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও ঝিনাইদহে ২৪ পয়েন্টে ২ বছরে ১৪ বাংলাদেশি হত্যা

গত দুই বছরে এ সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে বিএসএফ-এর গুলিতে নিহত হয়েছে এক শিশুসহ ১৪ গ্রামবাসী। নির্যাতনের শিকার হয়েছে শতাধিক ব্যক্তি। সশস্ত্র ও মাতাল অবস্থায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কয়েকবার ঢুকে বিএসএফ-এর বেশ কয়েকজন সদস্য গ্রামবাসীর হাতে আটকের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় সীমান্তে বিডিআর-বিএসএফ পতাকা বৈঠকে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর ঘটবে না প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা রা করেনি বিএসএফ। বিএসএফ-এর নির্যাতনের ভয়ে গ্রামের সাধারণ কৃষকরা মাঠে কৃষিকাজে যেতে সাহস পান না। অনেক সময় বিএসএফের সহযোগিতায় ভারতের নাগরিক ফসল লুটে নেয়। এ ব্যাপারে বিডিআরও কোনো সহযোগিতা করে না।
এসব ঘটনায় একাধিকবার বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্টে বিডিআর-বিএসএফের পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিডিআর-এর এক কোম্পানি কমান্ডার জানান, প্রায় প্রতিটি বৈঠকে বিএসএফ দুঃখ প্রকাশ করে সীমান্তে কোনো গুলি বা উত্তেজনার সৃষ্টি হয় এমন কোনো কর্মকা- চালাবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিলেও কয়েক দিন পরেই তা তারা রা করে না।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে ৯ মাসে ১১ হত্যা

চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৩৯ রাইফেল ব্যাটালিয়নের তথ্যানুযায়ী, গত বছর মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নিহত হয়েছেন অন্তত ১১ জন। জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর, শিবগঞ্জ, গোমস্তাপুর ও ভোলাহাট উপজেলার ১২০ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকার প্রতিটি গ্রামের মানুষই বিএসএফ-এর নির্যাতনের আতঙ্কে ভুগছে। শিবগঞ্জ, ভোলাহাটসহ সীমান্তের বহু কৃষক বিএসএফ-এর হুমকির কারণে চাষাবাদ করতে পারেন না। বিএসএফ-এর গুলিতে যারা নিহত হচ্ছেন, তাদের অধিকাংশই গরু ব্যবসায়ী অথবা কৃষক। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, সিন্ডিকেটভুক্ত গরু ব্যবসায়ীরা বিএসএফকে ‘ম্যানেজ’ করে নিয়মিত গরু আনেন। ‘ম্যানেজে’ গরমিল হলেই গুলি চলে। ৩৯ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক বলেন, নিয়ম হচ্ছে কেউ অপরাধ করলে তাকে গ্রেফতার করে থানায় চালান করে দেবে কিন্তু তারা তা না করে হত্যা করছে। কারণ মামলা করলে তাদের ঝামেলার মধ্য পড়তে হয়, এর চেয়ে হত্যা করাটা সহজ। তিনি আরো জানান, তারা বলে শুধু আমাদের মধ্যে খারাপ লোক আছে কিন্তু তাদের মধ্যেও খারাপ লোক না থাকলে আমাদের লোকেরা সাহস পায় কেমন করে। এক হাতে কখনো তালি বাজে না।
বিডিআর-এর তথ্যানুযায়ী, ওই ১২০ কিলোমিটার সীমান্ত পথের চোরাচালান প্রতিরোধ ও নিরাপত্তার জন্য দুটি ব্যাটালিয়ন কাজ করছে। এ জন্য সীমান্তে মোট ৩৫টি বিওপি স্থাপন করা হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থেকে ৮৭ কিলোমিটার এলাকা দেখাশোনা করে ৩৯ রাইফেল ব্যাটালিয়ন। বাকিটুকুর দায়িত্বে আছে নওগাঁর ৪৩ রাইফেলস ব্যাটালিয়ন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রতিটি বিওপিতে ১৫ থেকে ১৬ জন বিডিআর সদস্য থাকেন। ৮ ঘণ্টা করে দায়িত্ব ভাগ করলে প্রতিটি টহলে অংশ নিতে পারেন চার থেকে পাঁচজন। চার-পাঁচজন সীমান্তরী দিয়ে এই বিশাল এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব হলেও লোকবল সমস্যার সমাধান হয়নি।
বিডিআর-এর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সীমান্তে বিএসএফ যে আচরণ করে, তা কোনোভাবেই সভ্য মানুষের আচরণ হতে পারে না। তারা নিরস্ত্র মানুষকে গুলি করে হত্যা করছে মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। বিএসএফ-এর সাম্প্রতিক নির্যাতন ও গুলির ঘটনায় বিডিআর-এর প থেকে চিঠি দিয়ে প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে। দফায় দফায় পতাকা বৈঠক হচ্ছে। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। পতাকা বৈঠকে বিএসএফ সীমান্তে সম্প্রীতি বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিলেও বারবার ওয়াদা ভেঙে গুলি চালাচ্ছে তারা।

সিলেটে ও কুড়িগ্রাম সীমান্তে আতঙ্ক
বাংলাদেশের সীমার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে কাটাতে হয় সিলেট ও কুড়িগ্রাম সীমান্তের অধিবাসীদের। এ দুই এলাকার সীমানা নিয়ে বিরোধ দীর্ঘদিনের। ফ্যাগ মিটিং করে কখনো কখনো সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হলেও আজো কোনো স্থায়ী সমস্যার সমাধান হয়নি। রৌমারী সীমান্তে ১৯৯৮ সালে বিডিআর-বিএসএফ সংঘর্ষে ১৬ বিএসএফ নিহত হওয়ার পর এখন পর্যন্ত জনগণের মধ্যে আতঙ্ক কমেনি। প্রায়ই আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য বিএসএফ বাংলাদেশিদের গুলি করে হত্যা করছে বলে জানায় জামালপুর বিডিআর অধিনায়ক।
ভারতীয় সীমান্ত রীবাহিনীর উস্কানিতে সিলেটে সীমান্তে গত বছর কয়েক দফা বিএসএফ-বিডিআর গোলাগুলি হয়েছিল। এ নিয়ে দ্বিপীয় আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে এগোচ্ছে না বিএসএফ।
জৈন্তাপুর উপজেলার মুক্তাপুর সীমান্তে বাংলাদেশি কৃষকরা ডিবি হাওর ও কেন্দ্রীয় বিলের জমি সরকারের কাছ থেকে লিজ নিয়েও মাছ ধরতে পারছেন না বিএসএফের বাধার মুখে। বিএসএফ-এর সহযোগিতায় দুর্বৃত্তরা পাম্প লাগিয়ে মাছ ধরে নিয়ে যায়। বিডিআর ও স্থানীয় জনগণ বাধা দিলে বিএসএফ গুলি চালায়। এলাকার কৃষকরা বিভিন্ন মওসুমি ফসল তুলতে পারছে না, পরিচর্যা করতে পারছেন না বোরো ধানসহ অন্যান্য ফসলের তে।
সিলেটের তামাবিল সীমান্তে বিএসএফ-এর সহযোগিতায় ভারতীয় নাগরিকরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে ধান কেটে নিয়ে যাচ্ছে। বিডিআর বাধা দিলেও সে বাধা মানছে না তারা। বিডিআর পতাকা বৈঠকের আহ্বান জানালেও বিএসএফ সাড়া দিচ্ছে না। বরং তাদের ঘটনাস্থল থেকে দূরে থাকতে বলেছে।
বিডিআর অগত্যা হ্যান্ডমাইক দিয়ে ভারতীয়দের ধান কাটতে নিষেধ করছে। কিন্তু বিএসএফ তাতে কর্ণপাত করছে না। এদিকে ওপর থেকে নির্দেশ না পাওয়ায় বিডিআরও কার্যকর কোনো পদপে নিতে পারছে না এর বিরুদ্ধে। নিজেদের জমির ধান অন্যরা কেটে নেয়া সত্ত্বেও কিছু করতে না পারার ােভ ও আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাচ্ছে এ সীমান্তের কৃষকরা।
বিএসএফ বিডিআর-এর কথায় কর্ণপাত না করে ভারতীয় নাগরিকদের ধান কাটতে সহযোগিতা করে।
এলাকার কৃষক আবদুর রব, আবদুর রশিদ ও রফিক মিয়া জানান, ‘স্বাধীন বাংলাদেশের ১৫০ গজ ভেতরে অবৈধভাবে প্রবেশ করে বিডিআরের সামনেই ভারতের নাগরিকরা ধান কেটে নিয়ে যাচ্ছে। বিডিআর শুধু হ্যান্ডমাইক দিয়ে চলে যাওয়ার কথা বলছে, কিন্তু ভারতীয়রা বিডিআ-এর কথা শুনছে না। শক্ত কোনো পদপে না নিলে ভারতীয়রা আমাদের এলাকায় থাকতে দেবে না। আমাদের ফসলাদি নিয়ে যাবে, কখন যে আমাদের ঘরবাড়িও দখল করে নেবে, এই আতঙ্কে আছি।’
এলাকার ওহাব আলী, নূর মিয়া ও আবদুল খলিল জানান, দিনেরবেলা ভারতীয় নাগরিকরা ধান কেটে নিয়ে যায়, রাতে সার্চলাইট জ্বালিয়ে আতঙ্ক ছড়ায়। এলাকাবাসী জানায়, গতবার ধান পাকলেও তা তারা ঘরে তুলতে পারেনি। যখন কাটার সময় হয়েছে তখন ভারতীয় খাসিয়ারা বিএসএফসদস্যদের সঙ্গে নিয়ে এসে সব ধান কেটে নিয়ে গেছে।
সিলেটের পাদুয়া সীমান্তে গত মাসেও বিডিআর-বিএসএফ মুখোমুখি হয়। পাদুয়াকে নিজ এলাকা দাবি করলেও পরে তারা সরে দাঁড়ায়। প্রায়ই সিলেট সীমান্ত নিয়ে উত্তেজনা দেখা দেওয়ায় সীমান্তবাসীকে আতঙ্কের মধ্যে বাস করতে হচ্ছে।

অবরুদ্ধ ছিটমহল
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ছিটমহল সমস্যা ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে। সমস্যা সমাধানের জন্য বিভিন্ন সময় উদ্যোগ নেয়া হলেও বাস্তবে তেমন কোনো ফল হয়নি।
১৯৪৭ সালের ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের সময়ই সৃষ্টি হয় ছিটমহল সমস্যা। ভারত ও তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের সীমানার মধ্যে থেকে যাওয়া দুই দেশের বিচ্ছিন্ন ুদ্র ভূখ-ই পরিচিত ছিটমহল নামে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৪ সালের ১৬ মে নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের তখনকার প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে সই হওয়া চুক্তিতে দুই দেশের মধ্যে ছিটমহলগুলো বিনিময় করার কথা ছিল। ওই চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশ ভারতের কাছে বেরুবাড়ি ছিটমহল হস্তান্তর করে। কিন্তু বিনিময়ে ইতিবাচক সাড়া মেলেনি ভারত সরকারের কাছ থেকে। ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ ভারতের অভ্যন্তরে থাকা দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহলে আংশিক যোগাযোগ ও নিয়ন্ত্রণ আরোপের সুযোগ পায়।
বর্তমানে ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল আছে। এর মোট আয়তন ৭ হাজার ৮৩ দশমিক ৫২ একর। অন্যদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আছে ভারতের ১১১টি ছিটমহল, যেগুলোর মোট আয়তন ১৭ হাজার ২৫৮ দশমিক ২৪ একর। ১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে এসব ছিটমহল বিনিময় হওয়ার কথা।
বাংলাদেশ ও ভারতের ছিটমহলগুলোর লোকজন মানবেতর জীবনযাপন করছে। নিজেদের দেশের মূল ভূখ-ের সঙ্গে তাদের কোনো সরাসরি যোগাযোগ নেই। ছিটমহলগুলোতে বিদ্যুৎ নেই, রয়েছে বিশুদ্ধ পানির প্রকট অভাব। স্বাস্থ্য-শিার কোনো সুযোগ সেখানে নেই। কৃষি বা দিনমজুরি ছাড়া অধিবাসীদের কোনো পেশাও গড়ে ওঠেনি। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার কোনো কর্তৃপ নেই ছিটমহলে। দৈনন্দিন সব প্রয়োজনে ছিটমহলবাসীকে নির্ভর করতে হয় তাদের চারপাশ ঘিরে রাখা অন্য দেশের ওপর। ছিটমহল সমস্যা সমাধানে দুদেশের মধ্যে বৈঠক হলেও এখনো কার্যকর কোনো পদপে নেয়া হয়নি।

ছিটমহলে মানবাধিকার
ভারতের অভ্যন্তরে অবস্থিত বাংলাদেশি ছিটমহলের অধিবাসী প্রতিনিয়ত মোকাবেলা করছেন চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের। বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও তাদের সামগ্রিক দৈনন্দিন জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রিত হয় ভারতের বিএসএফ ও ভারতের বেসামরিক লোকজন দ্বারা। ভারত দ্বারা পরিবেষ্টিত হওয়ায় বিএসএফ তাদের কড়া নজরদারিতে রাখে, বাংলাদেশে যাতায়াতে বাধা দেয়। কেউ মূল ভূখ-ে প্রকাশ্যে আসার চেষ্টা করলে তাদের গ্রেফতার করা হয়। চালানো হয় নির্যাতন। এমনকি অসুস্থ মা-বাবাকে দেখার জন্যও অনুমতি পাওয়া যায় না। বাংলাদেশের ভূখ- হওয়া সত্ত্বেও সেখানে অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলনের। বাজার-সওদার জন্য ব্যবহার করতে হয় ভারতীয় মুদ্রা। নিজেদের উৎপাদিত কৃষিপণ্যও বিক্রি করতে পারেন না ন্যায্য বাজারমূল্যে। তারা যেমনি বিএসএফের বাধার কারণে মূল ভূখ-ে আসতে পারছেন না, তেমনি যেতে পারছেন না ভারতের হাটবাজারেও। তাই মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে তারা বাধ্য হচ্ছেন অর্ধেক দামে ধান-পাট বিক্রি করতে। তার ওপর রয়েছে বিএসএফসহ ভারতীয়দের নানা জুলুম। এ জুলুম-নির্যাতনের ভয়ে ছিটমহলের অধিকাংশ নারী সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের হন না। রয়েছে মাস্তান-সন্ত্রাসীদের উপদ্রব। যখন-তখন ছিটমহলে অনধিকার প্রবেশ করে নানা উপলে চাঁদা দাবি করা হয়। লুট করা হয় গরু-ছাগল, মাছ। কেটে নেওয়া হয় ধান-পাট, গাছ। কোনো বাধা এলেই চলে বিএসএফ ও ইন্ডিয়ান সন্ত্রাসীদের যৌথ তা-ব। অপরাধী ধরার নামে বিনাবিচারে আটক করা হয় এখানকার বাসিন্দাদের। নারী ও শিশু নির্যাতন এবং অপহরণের মতো ঘটনাও নিত্যদিনের ব্যাপার। এর ওপর আবার রয়েছে সীমান্তে উত্তেজনার খড়গ। কারণ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কোনো উত্তেজনা দেখা দিলেই তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এই ছিটমহলগুলোয়। উদাহরণস্বরূপ রৌমারী সীমান্ত সংঘর্ষের কথা বলা যায়। ওই সময় মশালডাঙ্গার অনেক ঘরবাড়িতে ইন্ডিয়ানরা আগুন ধরিয়ে দেয়। ফলে প্রায় ১ হাজার লোক জীবন বাঁচাতে মূল ভূখ-ে পালিয়ে আসেন।
নিজদেশে পরবাসী : ভারতের অভ্যন্তরে অবস্থিত ছিটমহলগুলোর অধিবাসী আইনত বাংলাদেশি হলেও তারা রাষ্ট্রীয় অধিকাংশ সুযোগ-সুবিধা ও নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। আঙ্গরপোতা-দহগ্রাম ছাড়া অপরাপর ছিটমহলের অধিবাসী আমাদের জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত। ভারতীয়দের বাধার কারণে সেখানে ভোটার তালিকার কাজ বন্ধ কয়েক যুগ ধরে। কোনো কোনো ছিটমহলে ১৯৭২ সালের পর ভোটার তালিকা হালনাগাদ হয়নি। বিএসএফ অহরহ অনধিকার প্রবেশ করলেও বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো উপস্থিতি সেখানে নেই। বিচারব্যবস্থা বলতে স্থানীয় সালিশি। এমনকি জমি কেনাবেচাও হয় সাদা কাগজে লিখে অথবা মৌখিকভাবে। অবশ্য সরকারিভাবে অদৃশ্য কারণে ২০০৭ সালের ১ জুলাই থেকে ভূমি রেজিস্ট্রেশন বন্ধ রাখার নির্দেশ রয়েছে। অধিকাংশ ছিটমহলেই কোনো স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা নেই। সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, পরিবার পরিকল্পনা, জন্মনিবন্ধন, দুর্যোগকালীন সহযোগিতা, অবকাঠামো নির্মাণ, দুস্থ, প্রবীণ মহিলা ও প্রতিবন্ধী ভাতা, কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি, ব্যাংকঋণ, এনজিও কার্যক্রম, বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন কর্মসূচির কোনোটাই নেই এখানে।
নেই মানবিক অধিকার ও নিরাপত্তা : শিা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ অবকাঠামো এবং দুর্যোগকালীন সহযোগিতার অভাবে সবচেয়ে নাজুক মানবিক নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন ছিটমহলের নারী, শিশু ও প্রবীণরা। অধিকাংশ শিশুই ভুগছে চরম পুষ্টিহীনতায়। সদ্যোজাত শিশু ও প্রসূতি মায়ের মৃত্যুর হারও তুলনামূলক বেশি। অনেক গর্ভবতী মহিলাকে চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হয়। প্রথমত বিএসএফ টহলদারির কারণে মূল ভূখ- বা ভারতের কোথাও যাওয়া প্রায় অসম্ভব। আবার কোনোভাবে পরিচয় গোপন করে বা লুকিয়ে ভারতে যেতে পারলেও আইডি কার্ড না থাকায় তারা হাসপাতালে ভর্তি হতে পারছেন না চিকিৎসকদের অস্বীকৃতির কারণে। এমনও জানা গেছে, ভর্তি হতে না পেরে হাসপাতাল চত্বরেই রোগীর মৃত্যু হয়েছে। ফলে স্থানীয় বৈদ্য, কবিরাজই তাদের একমাত্র ভরসা। বাংলাদেশের ছিটমহলগুলো ভৌগোলিকভাবেই বন্যাপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সর্বস্ব হারালেও তারা কোনো সরকারের প থেকেই সহযোগিতা পান না।
দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা : লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার অন্তর্গত দুটি বাংলাদেশি ছিটমহলের নাম আঙ্গরপোতা ও দহগ্রাম, যার মোট আয়তন ২২ দশমিক ৬৮ কিলোমিটার। জনসংখ্যা ১৪ হাজার ৬৬৮। ভারতের অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য দীর্ঘ সংগ্রামের কারণে এ ছিটমহল দুটি সারাদেশে পরিচিত এবং আলোচিত। এ ছিটমহল দুটিকে মূল ভূখ-ের সঙ্গে যুক্ত করেছে ১৮৭ বাই ৮৫ বর্গমিটার একটি করিডোর। ১৯৫৮ সালের নেহরু-নূন চুক্তিতে এটা তিনবিঘা করিডোর নামে পরিচিত। করিডোরটিকে তৎকালীন পাকিস্তানের স্থায়ী ভূখ- হিসাবে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু কোনো এক অজানা রহস্যে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিতে এটিকে ভারতীয় ভূখ- হিসাবে উল্লেখ করে লিজ নেয়া হয়। তারপর থেকে শুরু হয় এক মানবিক বিপর্যয়ের ইতিহাস। অবশেষে দীর্ঘ অবরুদ্ধ দশার অবসান ঘটে ১৯৯২ সালে সম্পাদিত তৎকালীন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাও ও খালেদা জিয়ার মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির মাধ্যমে, যা ওই বছরের ২৬ জুন থেকে কার্যকর হয়। যে দিবসটিকে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতাবাসী তাদের স্বাধীনতা দিবস হিসাবে পালন করে থাকে। ওই চুক্তির ফলে তিনবিঘা করিডোরটি খুলে দেওয়া হয়। বর্তমানে সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত করিডোরটি খোলা থাকে। অর্থাৎ বাকি ১২ ঘণ্টা এই ছিটমহলবাসীর জীবন কাটে অবরুদ্ধ দশায়। এ ১২ ঘণ্টার মধ্যেও ভারতীয় লোকজন এবং যানবাহনের চলাচলের সুবিধার জন্য করিডোরের গেট ইচ্ছেমাফিক বন্ধ করা হয়। অর্থাৎ রাতের বেলা গুরুতর অসুস্থ রোগী নিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য করিডোর অতিক্রম সম্ভব নয়। শুধু রাতের গেট নয়, ছিটমহলবাসীর অর্থনৈতিক জীবনের অনেকটা এখনো নিয়ন্ত্রণ করছে বিএসএফ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, দহগ্রাম-আঙ্গরপোতায় রয়েছে ৩৫ হাজার গরু। প্রতি রবি ও বৃহস্পতিবার পাটগ্রামে বিরাট গরুর হাট বসে। কিন্তু বিএসএফ প্রতি হাটে ১০টির বেশি গরু করিডোর অতিক্রম করতে দেয় না। ফলে এই বিপুলসংখ্যক গরু এখন দহগ্রাম-আঙ্গরপোতাবাসীর সম্পদ না হয়ে উল্টো বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মশালডাঙ্গা : কুড়িগ্রামের ভুরঙ্গামারী উপজেলার পাথরডুবি ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ড মশালডাঙ্গা, যা কয়েকটি ছিটমহল নিয়ে গঠিত এবং ইন্ডিয়ার পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কুচবিহার জেলার দিনহাটা থানা দ্বারা পরিবেষ্টিত। মশালডাঙ্গায় আনুমানিক ২০-২৫ হাজার লোকের বসবাস। বাংলাদেশের মূল ভূখ-ের সঙ্গে মশালডাঙ্গা যুক্ত হয়েছে ৪২ বাই ১৫০ গজের একটি লম্বা ভারতীয় করিডোর দিয়ে। কিন্তু মশালডাঙ্গাবাসী যাতে মূল ভূখ-ে অর্থাৎ বাংলাদেশে আসতে না পারেন সে জন্য করিডোরটির প্রবেশমুখে নির্মাণ করা হয়েছে একটি বিএসএফ চৌকি। মশালডাঙ্গার উত্তর সীমান্তে রয়েছে ভারতীয় কালজানী নদী। তাই পাশের ভারতীয় গ্রাম নাজিরহাট, শালমারা, গালঝাড়া ও বল্লমপুর গ্রামের লোকজন মশালডাঙ্গার ওপর দিয়েই তাদের দেশের অপর প্রান্তে যাতায়াত করেন। এমনকি বাংলাদেশি সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়াই ভারতীয় সরকার মশালডাঙ্গার ভেতর দিয়ে আড়াই কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সড়ক নির্মাণ করেছে, যে সড়ক ধরে সে দেশের যানবাহনগুলো যাত্রী, মালামাল ও সামরিক লোকজন পরিবহন করে। এ সড়ক দিয়েই নেয়া হয়েছে বিদ্যুৎ ও টেলিফোন লাইন, যাতে মশালডাঙ্গাবাসীর নেই কোনো অধিকার। ভারতীয় লোকজন অহরহ মশালডাঙ্গায় যাওয়া-আসা করলেও বিএসএফ-এর কড়া টহলের কারণে ছিটমহলের লোকজন ভারতে যেতে পারেন না। এমনকি বাংলাদেশে আসতে চাইলেও তাদের শিকার হতে হয় গ্রেফতার, নির্যাতনসহ নানা হয়রানির। ফলে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে আসতে হয় নিজদেশে। মৃত্যুপথযাত্রী মা-বাবা, ভাই, বোন, সন্তানের সঙ্গে দেখা সাাতেরও অনুমতি পাওয়া যায় না। মূলত বিএসএফ ও ভারতীয় প্রভাবশালী লোকজন ও সন্ত্রাসীরাই তাদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নামে প্রায়ই চাঁদা দাবি করা হয়। বাধা দিলে নেমে আসে নানা নির্যাতন ও হয়রানি। গরু-ছাগল ও মাছ লুট হয়। কেটে নেয়া হয় ঝাড়ের বাঁশ। জমির ধান বিক্রি করতে হয় মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে অর্ধেক দামে। যখন-তখন বিএসএফ অনধিকার প্রবেশ করে বিনাবিচারে ধরে নিয়ে যায় লোকজনকে।
১৯৮৬ সাল থেকে জাতীয় বা স্থানীয় কোনো নির্বাচনেই মশালডাঙ্গাবাসী ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাননি বিএসএফ-এর বাধার কারণে। এ ২০-২৫ হাজার লোকের জন্য নেই কোনো স্কুল, কলেজ। স্থানীয়দের মতে, পুরো মশালডাঙ্গায় এমন একজনও নেই যিনি কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে লেখাপড়া করেছেন। ছিটমহলবাসী নিজস্ব উদ্যোগে একটি মক্তব প্রতিষ্ঠা করলেও বিএসএফ এসে তা ভেঙে দেয়।
সরকারি ও এনজিও সেবা বলতে যা বোঝায় তার কোনোটাই নেই এখানে। পুষ্টিহীনতা, সদ্যোজাত শিশু ও প্রসূতি মায়ের মৃত্যু অনেকটা স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। যেহেতু দেশের অপরাংশের লোকজন এই অবরুদ্ধ ছিটমহলবাসীর সঙ্গে বিয়ে-শাদিতে রাজি নয়, তাই এমনকি উপযুক্ত পাত্রের অভাবে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে বিয়ে-শাদি হচ্ছে। ফলে বহুবিবাহও একটি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
ছিটমহল তেরঘর : ছিটমহলগুলোর মধ্যে কিছু মাদক চোরাচালানির অন্যতম স্থান হিসাবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশের মধ্যে অবস্থিত ভারতীয় ছিটমহলগুলো এদিক থেকে এগিয়ে আছে। মাদকের অন্যতম রুট হিসাবে যেগুলো ব্যবহৃত তার মধ্যে তেরঘর অন্যতম।
ভারতীয় ছিটমহল তেরঘর থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার বোতল ফেনসিডিল পাচার হয়ে আসছে বন্দর নগরী বেনাপোলে।
একটি শক্তিশালী মাদক সিন্ডিকেট প্রশাসনকে ম্যানেজ করে লাখ লাখ টাকার মাদক পাচার করে আনছে বাংলাদেশের বৃহত্তম স্থল বন্দরে। বেনাপোল চেকপোস্ট থেকে ৩ কিলোমিটার দেিণ গাতিপাড়া ও দৌলতপুর গ্রামের মাঝে ১৩ ঘর নামক ছোট ছিটমহল। পূর্বে এ ছিটমহলের ভেতর বিএসএফ-এর একটি ক্যাম্প ছিল। কয়েক বছর আগে বিএসএফ এই ক্যাম্প প্রত্যাহার করে নিয়েছে। ভারতীয় ১৩টি পরিবার বাস করার কারণেই ছোট্ট এ ছিটমহলের নাম ১৩ ঘর। কিন্তু এখন আর ১৩ পরিবার ওই ছিটমহলে বসবাস করে না। সর্বমোট ৬-৭ পরিবার ওই ছিটমহলে বাস করে। ভারতীয় ভূ-খ- দখলে রেখে মাদকসহ অন্যান্য চোরাচালান ব্যবসা করার জন্যই ওই সব পরিবারের বাস।
ভারত এবং বাংলাদেশের শক্তিশালী সিন্ডিকেট একত্রিত হয়েই ফেননিডিলের ব্যবসা করে।
ফেনসিডিল বাংলাদেশে পাচারে বিএসএফ কোনো বাধা দেয় না। ফলে বনগাঁ শহর থেকে অনায়াসে ১৩ ঘর ছিটমহলে ফেনসিডিলের চালান চলে আসে।
দাশিয়ারছড়ার একটি ভিন্নচিত্র : দাশিয়ারছড়া পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলার দিনহাটা থানার অন্তর্গত একটি ছিটমহল, যা বাংলাদেশের কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলা দ্বারা পরিবেষ্টিত। ১ হাজার ৭৪৩ একর আয়তনের এই ভারতীয় ছিটমহলটির জনসংখ্যা সাড়ে ৭ হাজার। দাশিয়ারছড়ার অধিবাসীর প্রায় ৫০ শতাংশই শিতি। এখানকার অনেক ছেলেমেয়েই বাংলাদেশের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পাশের গ্রামের ঠিকানা ব্যবহার করে লেখাপড়া করছে। স্থানীয় সরকারি হাসপাতালগুলোয় তারা যথারীতি স্বাস্থ্যসেবা নিচ্ছেন। পরিবার পরিকল্পনা, টিকাদান কর্মসূচি, দুর্যোগকালীন ত্রাণ সবই পাচ্ছেন তারা। শুধু ভূমি রেজিস্ট্রেশন ও হস্তান্তরের জন্য তাদের দিনহাটা যেতে হয়। তবে ভারতীয় সরকারকে ভূমিকর দিতে হয় না। ১৯৫৮ সালের পর ভারতীয় কোনো সরকারি কর্মকর্তা এই ছিটমহল সফর করেননি।
নতুন উদ্বেগ : একদিকে বাংলাদেশি হওয়া সত্ত্বেও পরিচয়পত্র না থাকায় পশ্চিমবঙ্গের অভ্যন্তরে অবস্থিত ছিটমহলের লোকজন ভারতীয় হাটবাজার ও হাসপাতালে যেতে পারছেন না, অন্যদিকে বাংলাদেশে আসতে গেলেও বিএসএফ বাধা দেয়। এ অবস্থায় ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত না হওয়া এবং বাংলাদেশে জাতীয় পরিচয়পত্র চালু হওয়ায় ছিটমহলের লোকজনের মধ্যে নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের ভয়, নিজদেশে ভিনদেশি হিসাবে চিহ্নিত হয়ে তারা যেন রাষ্ট্রবিহীন নাগরিকে পরিণত না হন।

সাক্ষাৎকার
ভারত প্রতিবেশীসুলভ আচরণ করছে না
লে. জে. (অব.) মাহবুবর রহমান
সাবেক পরিচালক, বিডিআর

আগে বিএসএফ সীমান্ত আইন মেনে চলত। কিছু জায়গায় কাঁটাতারের বেড়া না থাকলেও কেউ নিয়ম ভঙ্গ করত না। আন্তর্জাতিক নিয়ম বিডিআর-বিএসএফ মানত এবং বছরে দুবার কনফারেন্স হতো। কিন্তু এখন তারা নিয়ম ভঙ্গ করে গুলি করে বাংলাদেশির লাশ ভারত সীমান্তের ভেতরে নিয়ে যাচ্ছে। আমি মনে করি এটা ভারতের প্রতিবেশীসুলভ আচরণ নয়। আমরা এসব ঘটনার প্রতিবাদ কিংবা অ্যাকশনে না গিয়ে নীরব থাকছি এটা ঠিক না। সরকারকে এটি সিরিয়াসলি নিতে হবে। জৈন্তাপুর সীমান্তে জমি দখল করেছে যেখানে আমাদের সার্বভৌমের জন্য হুমকি। বিডিআর বিদ্রোহের পর আমাদের জওয়ানরা দাঁড়াতে পারছে না। মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার ফলে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাচ্ছে না। আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিত বিএসএফ-এর অবৈধ কর্মকা-কে শক্তভাবে প্রতিহত করা।

দুদেশের দায়িত্ব গ্রেফতার করা গুলি করা না

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ
অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাবি

বাংলাদেশ জিরো লাইনে সীমানা নির্ধারণে একমত না হওয়ায় ১৫০ গজের মধ্যে করা হয়েছে। এখানে একটা ভুল বোঝাবুঝির বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশিরা ১৫ গজকে বর্ডার মনে করছে। এখানে তারা চাষাবাদ, গরুকে খাবার খাওয়ানোর কাজ করতে গিয়ে মূল সীমানার বাইরে চলে যাচ্ছে এবং এতে বিএসএফ গুলি করছে। ভারতীয় একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যারা মারা যাচ্ছে তাদের ৭০ ভাগ ভারতীয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে ভারতের হিউমান রাইটস নিশ্চুপ কেন? এখানে বিএসএফ হয় তথ্য দিচ্ছে না অথবা বিএসএফ যা বলছে তারা তাই মেনে নিচ্ছে। দুদেশের দায়িত্ব হচ্ছে অপরাধীকে ধরা, গুলি করা না। তারা যেন বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যা না করে সেজন্য দিল্লিকে চাপ দিতে হবে। সরাসরি হত্যার ঘটনা থেকে সবাইকে সরে আসতে হবে। কারণ এখানে দুপক্ষেরই মানুষ মারা যাচ্ছে।

আমাদের মতো ভারতের কোনো ভালো প্রতিবেশী নেই

ওয়ালী-উর-রহমান, সাবেক কূটনীতিক

সীমান্তে যারা মারা যাচ্ছে তাদের বেশিরভাগই চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত। বিডিআর বিএসএফের সঙ্গে মিটিংয়ে বলেছিল তারা পায়ে গুলি করবে অন্য কোথাও নয় কিন্তু তারা তাদের কথা রাখছে না। সীমান্তে সংঘর্ষের আরো একটি সমস্যা হচ্ছে জমি দখল। ভারত আমাদের প্রস্তাব দিয়েছে তারা যা দখল করে আছে তারা তা রেখে দেবে এবং আমরা যা দখল করে আছি তা আমরা ভোগ করব। এতে কয়েক হাজার বিঘা জমি আমাদের লাভ হবে। আমরা এর প্রতি কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছি না এটা ঠিক না। মনমোহন সিং ঢাকায় এলে এ বিষয় উপস্থাপন করে সমাধান করতে হবে। এর আগে আমরা দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহল নিয়ে চুক্তি করেছি যা আমাদের ট্রানজিটে সহায়তা করছে। অনেক ক্ষেত্রেই ভারত আমাদের সঙ্গে নমনীয় হচ্ছে কারণ তারা এখন একটা বিষয়ে সচেতন যে আমাদের মতো তাদের আর কোনো ভালো প্রতিবেশী নেই।

সরকার ভারতের নির্যাতনের কথা বলতে লজ্জা পায়
এএসএম নাসিরউদ্দিন এলান, পরিচালক, অধিকার

ভারত আধিপত্যের মনোভাব নিয়ে চলছে। পায়ে গুলি না করে সরাসরি হত্যা করছে। শুধু তাই নয় দেশের সীমানার ভেতর ঢুকে হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতন চালাচ্ছে। অনেক শিশু নির্যাতনের পর মারা গেছে। যে সরকারই ক্ষমতায় আসছে সে-ই দ্বন্দ্ব বন্ধে ব্যর্থ হচ্ছে। আমাদের বিডিআর বিএসএফ-এর বিরুদ্ধে কোনো অ্যাকশন নিলে সরকার তার বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেয়। অনেক ক্ষেত্রে তার চাকরিও চলে যায়। সরকার বিএসএফ-এর বিরুদ্ধে জাতিসংঘে কথা বলতে পারে কিন্তু তা না করে বিডিআরকে টেনে ধরা হয়। বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। সরকার পররাষ্ট্র খাতে কোটি কোটি টাকা খরচ করে অথচ ভারতের নির্যাতনের কথা বলতে লজ্জা পায়।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত বিরোধ

২০০০ প্রতিবেদন

বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের ২৭১ কিলোমিটার সীমান্ত আছে। এর মধ্যে একটি বড় অংশজুড়ে আছে নাফ নদী। সামরিক জান্তার দেশ মিয়ানমারের সীমান্ত প্রতিরক্ষাবাহিনীর নাম বর্ডার ইমিগ্রেশন ফোর্স। নাসাকা বাহিনী নামেই এটি বেশি পরিচিত। এ বাহিনীর কার্যক্রম বরাবরই রহস্যজনক মনে হয় বাংলাদেশের মানুষের কাছে। নাসাকা বাহিনীর সদর দপ্তর বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলা সদর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে, কাওয়ারবিলে। এ বাহিনীকে মাঝে মধ্যেই বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে অথবা নাফ নদী থেকে জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়া, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ, ট্রলার ছিনতাই করা, গুলিবর্ষণের মতো ঘটনার সঙ্গে জড়িত হতে দেখা যায়।
গত বছরের অক্টোবরে নাইক্ষ্যংছড়িতে চাকঢালা-মিয়ানমার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করে নাসাকা বাহিনী। এ সময় সেখানে বাংলাদেশ রাইফেল্স বিডিআরের টহলও জোরদার করা হয়েছিল।  ২০০৯ সাল থেকে রেজু, মনজয়পাড়া ৪১-৪২ নং সীমান্ত পিলার থেকে নাই্যংছড়ি সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের ল্েয কাজ শুরু করে নাসাকা বাহিনী। জুলাই মাসে বান্দরবান জেলার নাই্যংছড়ি উপজেলার বাইশফাঁড়িতে মিয়ানমারের সীমান্তরী নাসাকা বাহিনীর দুই সদস্যকে আটক করেছে বিডিআর। নাসাকা বাহিনীর ওই সদস্যরা গোপনে বাংলাদেশে ঢুকেছিল বলে বিডিআর সূত্র জানিয়েছে। গত বছরের ২৭ অক্টোবর টেকনাফ থেকে ৩৮ জেলেসহ চারটি মাছ ধরার ট্রলার অপহরণ করে নিয়ে যায় নাসাকা বাহিনী।
গত নভেম্বরে নাফ নদীতে ট্রলার ধাওয়ার ফলে বিডিআর-নাসাকা গুলিবিনিময়ের মতো ঘটনা ঘটে। ১২ নভেম্বর মিয়ানমার থেকে গরু-মোষ বোঝাই ২টি ট্রলার টেকনাফ শাহপরীর দ্বীপ করিডোরে আসার পথে নাফ নদীর বাংলা চ্যানেলে নাসাকা বাহিনী জলসীমা অতিক্রম করে ধাওয়া করে। পরে তারা ট্রলার দুটি ছিনতাই করে নিয়ে যেতে চাইলে বিডিআর-এর বাধার মুখে তা আর পারেনি। এর আগে ২৬ সেপ্টেম্বর সেন্টমার্টিন থেকে দুটি ট্রলার অপহরণ করে পরে একটি ট্রলারে করে জেলেদের ফেরত পাঠিয়ে দেয় নাসাকা বাহিনী।
এ রকম অসংখ্য ছোট-বড় সমস্যার পাশাপাশি মিয়ানমারের সঙ্গে বড় একটি বিরোধ আছে সমুদ্র সীমানা নিয়ে। বাংলাদেশের সমুদ্র সীমানায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় মিয়ানমার দেশের দণি-পূর্ব সমুদ্রসীমার ভেতরে সেন্টমার্টিন দ্বীপের ৪২ নটিক্যাল মাইল দূরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ সময় অবৈধভাবে কোরিয়ান কোম্পানির সহায়তায় মিয়ানমার এ তেল-গ্যাস অনুসন্ধান চালায়। বাংলাদেশ এ কার্যক্রমে প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি নৌবাহিনীর জাহাজ ঘটনাস্থলে অবস্থান নিলে জরিপকারী মিয়ানমারের জাহাজ কয়েক দিন পর বিতর্কিত স্থান ত্যাগ করে। এরপর ২০০৮ সালের অক্টোবরে এবং ২০০৯ সালের জুনে মিয়ানমার বাংলাদেশের সীমানার ভেতর তেল-গ্যাস অনুসন্ধান চালায়। বাংলাদেশ এ সময় নৌবাহিনীর টহল জোরদার করলে তারা পিছু হটে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের জলসীমায় অমীমাংসিত এলাকা রয়েছে প্রায় ৬২ হাজার বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে বাংলাদেশের সীমানার মধ্যে ৪৮ হাজার ২৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা দাবি করছে মিয়ানমার। মিয়ানমার বাংলাদেশ সীমানার মধ্যে ১৪টি ব্লক নিজেদের বলে দাবি করে আসছে। ভারত ও মিয়ানমার অমীমাংসিত এলাকায় জরিপ করতে ইতিমধ্যে বিদেশি কোম্পানিকে ইজারা দিয়েছে। শুধু বাংলাদেশ বাকি আছে। মিয়ানমার ইতিমধ্যেই জাতিসংঘে নিজেদের দাবিকৃত এলাকার ব্যাপারে যুক্তি তুলে ধরেছে। মিয়ানমারের নিরাপত্তা সূত্রের বরাত নিয়ে বাংলাদেশের একটি কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, জাতিসংঘের কাছে মিয়ানমার যে সমুদ্রসীমার দাবি উত্থাপন করেছে তাতে বাংলাদেশের বিপুল সমুদ্রসীমাকে তাদের বলে দাবি করা হয়েছে। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার দাবি ২০১১ সালের মধ্যে উপস্থাপনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের আরেকটি বড় সীমান্ত সমস্যা রয়েছে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা প্রবেশ। মিয়ানমার থেকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে প্রতিদিন অনুপ্রবেশ করছে শত শত রোহিঙ্গা। বান্দরবানের নাই্যংছড়ি, লামা, আলিকদম, ঘুনধুম, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের সীমান্তে ৪৯টি পয়েন্ট দিয়ে প্রতিনিয়ত ছোট ছোট নৌকা ও স্থলভাগে হাঁটাপথ দিয়ে রোহিঙ্গারা অনুপ্রবেশ করছে। সরকারি হিসাব মতে, বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থানকারী রোহিঙ্গা আছে প্রায় ২৭ হাজার। তবে বেসরকারি হিসাব মতে, এ সংখ্যা ২ লাখ ৭০ হাজার বলে একটি সূত্র দাবি করেছে।
বছরের শুরুতেই ৩ লাশ

বছরের শুরুতেই ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ৩ বাংলাদেশি নাগরিককে গুলি করে হত্যা করে। ৬ জানুয়ারি রাজশাহীর মতিহার থানার খানপুর সীমান্তে দুই নাগরিক বিএসএফ-এর গুলিতে নিহত হয়। নিহতরা হলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার সেরাজুল ইসলাম ও জাইজুদ্দিন। তারা গরুর ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিল।
৭ জানুয়ারি বিএসএফ কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের বানারভিটা গ্রামের ফেলানিকে গুলি করে হত্যা করে। ঘটনাটি ঘটে ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে। দীর্ঘ সময় ফেলানির লাশ সীমান্তের কাঁটাতারের সঙ্গে ঝুলে থাকে। দিনমজুর নুরুল ভারতে বসবাসরত মেয়েকে নিয়ে নিজ দেশে বিয়ে দেওয়ার জন্য সীমানা পার হওয়ার সময় বিএসএফ-এর গুলিতে তার মৃত্যু হয়।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: