• Categories

  • Archives

  • Join Bangladesh Army

    "Ever High Is My Head" Please click on the image

  • Join Bangladesh Navy

    "In War & Peace Invincible At Sea" Please click on the image

  • Join Bangladesh Air Force

    "The Sky of Bangladesh Will Be Kept Free" Please click on the image

  • Blog Stats

    • 280,481 hits
  • Get Email Updates

  • Like Our Facebook Page

  • Visitors Location

    Map
  • Hot Categories

অবৈধ অস্ত্র মামলা দুর্বল তদন্তে বেরিয়ে যায় অভিযুক্তরা

Source : সাপ্তাহিক ২০০০

undefined
অবৈধ অস্ত্র সারাবছর উদ্ধার হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নানাভাবে পুরস্কৃত হন। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের তালিকায় একে-৪৭, একে-৪৬, এম-১৬, রকেটলাঞ্চার থেকে পুরনো লক্কড়-ঝক্কড় পিস্তলও রয়েছে। অস্ত্রগুলো উদ্ধারের সঙ্গে গ্রেফতার হয় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী। গ্রেফতারের কিছুদিন পরেই এই সন্ত্রাসীরা বের হয়ে আসে। তা হলে অস্ত্র সম্পর্কে কী ধরনের তদন্ত

হয়। উদ্ধার হওয়া অস্ত্র কোথায় যায়? এসব অস্ত্র কি আবার সন্ত্রাসীদের হাতে ফিরে আসে? নাকি বেহাত হয়ে অন্য কোথাও যায়? অবৈধ অস্ত্রের শেষ পরিণতি কী, গন্তব্য কোথায়
এসব নিয়ে এই প্রতিবেদন লিখেছেন খোন্দকার তাজউদ্দিন ও মোস্তাহিদ হোসেন

ঘটনা-১
সুন্দরবনের জলদস্যুর রাজা ‘নাসির বাহিনী’ প্রধান রফিক মাস্টার। ২০০৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জ শহরে এক আত্মীয়ের বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী ওই দিন রাতেই র‌্যাবের একটি বিশেষ দল সুন্দরবনের শীর্ষ জলদস্যু ও নাসির বাহিনীর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড মোঃ আলম শেখ ওরফে রব মিয়া ও মোঃ রফিক শেখকে গ্রেফতার করে। এছাড়া পরের দিন রাতে সুন্দরবনের অস্ত্র জোগানের গডফাদার সালেহ আহমেদ ওরফে হাতকাটা সালেহকে গ্রেফতার করা হয়। এদের সবার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী ২৮টি অস্ত্র (৩০৩ কাটা রাইফেল, এলএমজি, .২২ রাইফেল) এবং ২৯৬ রাউন্ড তাজা গুলি উদ্ধার করা হয়। পরে এদের বাগেরহাটের শরণখোলা থানায় সোপর্দ করা হয়। এসব আসামি জামিনে বের হয়ে আবার পুরনো পেশায় ফিরে গেছে।

ঘটনা-২
২০০৮ সালের ৩ জুন র‌্যাব-৪-এর হাতে ধরা পড়ে গাবতলী এলাকার অস্ত্র ব্যবসায়ী মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম ওরফে বাবু ও রিপন আলী। তাদের কাছ থেকে র‌্যাবের সদস্যরা চারটি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করে। পরে তাদের মিরপুর থানায় সোপর্দ করা হয়। এ দুই অস্ত্র ব্যবসায়ী জামিনে বের হয়ে এসে পলাতক রয়েছে। ফিরে গেছে পুরনো পেশায়।

ঘটনা-৩
২০০৮ সালের মার্চ মাসে পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতা পাবনা সদরের নূপুরপুরে কামরুল ইসলাম ওরফে কামরুল মাস্টার তিনজন চরমপন্থিসহ ধরা পড়ে। এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি একে-৪৭ (চায়না) ও ১৮১ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। তিনটি রিভলবারও উদ্ধার করা হয়। কামরুল মাস্টারকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধারে গেলে চরমপন্থিরা র‌্যাবের ওপর গুলিবর্ষণ করে। এ সময় কামরুল মাস্টার ক্রসফায়ারে মারা যান। তার সঙ্গে গ্রেফতার হওয়া চরমপন্থি রাজু, অস্ত্র উদ্ধারে সহায়তা করে। র‌্যাবের সদস্যরা রাজুর সহায়তায় ১৩টি অস্ত্র উদ্ধার করেন। বর্তমানে সেই রাজু জামিনে বের হয়ে আবার চরমপন্থি তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
বিডিআর, র‌্যাব বা পুলিশের সদস্যরা অস্ত্র উদ্ধার করে নিকটবর্তী থানায় সোপর্দ করে। ওপরের ঘটনাগুলো সেই চিত্রই বহন করছে। থানায় যাওয়ার পর ওই অস্ত্র আর অস্ত্র থাকে না, হয়ে যায় ডামি অস্ত্র। অস্ত্রের একটি অংশ পুলিশ নিজে সংরক্ষণ করে গোপনে, একটি অংশ সরকারের মালখানায় জমা দেয়। বাকি অস্ত্র পুলিশের হাতঘুরে সন্ত্রাসীদের হাতে ফিরে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ বিভাগের সূত্র মতে, তারা গত ১০ বছরে উদ্ধার করেছে ৩৮ হাজার অস্ত্র। এর মধ্যে রয়েছে একে-৪৭ রাইফেল, এলএমজি, এম-১৬ রাইফেলসহ নানা অস্ত্র। র‌্যাব সূত্রে জানা যায়, গত ৬ বছরে ৬৮ হাজার অস্ত্র ও ৭৩ হাজার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। এ ব্যাপারে গ্রেফতার করা হয়েছে ৬ হাজার ৮৮ জনকে। পুলিশি তথ্য মতে, দেশে অবৈধ অস্ত্র রয়েছে ৬ লাখের মতো। সে জায়গায় এ অস্ত্র উদ্ধার বড় ধরনের সাফল্য নয়। এ প্রসঙ্গে গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার মনিরুল ইসলাম ২০০০কে বলেন, একই অস্ত্র বিভিন্ন সন্ত্রাসীর হাতে ঘোরে। বিভিন্ন ঘটনায় দেখা গেছে, এক গ্রুপের অস্ত্র অন্য গ্রুপের সন্ত্রাসী ব্যবহার করে। ধরা পড়া কোনো সন্ত্রাসীই অস্ত্রের মূল উৎসের তথ্য দিতে পারে না। পুলিশের অবৈধ অস্ত্রের রমরমা ব্যবসা করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ ধরনের তথ্য সঠিক নয়। পুলিশের অস্ত্র ব্যবসা করার কোনো সুযোগ নেই।

বেহাতের ঘটনা ও হাতবদল
পুলিশসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের একটা অংশ কোনো না কোনোভাবে সন্ত্রাসীর হাতে চলে যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উদ্ধার করা অস্ত্রের একটা অংশ কখনো কখনো হাতবদল হয়ে সন্ত্রাসীদের হাতে চলে যাচ্ছে। পুলিশের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা মালখানায় থাকা অস্ত্র ভাড়াও খাটান। এ বাবদ তারা মোটা অঙ্কের টাকা পকেটে পোরেন এমন অভিযোগও শোনা যায়। পুলিশের কর্মকর্তারা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করে তাদের কাছে রাখে এমন অভিযোগও রয়েছে। অনেক সময় নিরীহ মানুষকে অস্ত্র ধরিয়ে গ্রেফতার করে বাহবা নেয়া হয়। তাদের ফাঁসিয়েও দেওয়া হয়। আবার উদ্ধার হওয়া অস্ত্র পুলিশের হাতে রেখে অন্য জায়গায় ওই একই অস্ত্র উদ্ধারের নাটক মঞ্চস্থ করার অভিযোগ রয়েছে। এ প্রসঙ্গে ডিএমপি কমিশনার বেনজির আহমেদ বলেন, অবৈধ অস্ত্র নিয়ে পুলিশের বাণিজ্য করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ থানার মালখানা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিয়মিত পরিদর্শন করে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হলে তা আদালতে আলামত হিসাবে পাঠানো হয়। প্রায় সবক্ষেত্রে অস্ত্র স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় অস্ত্রাগারে পাঠানো হয়ে থাকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কোর্ট বা আদালতের মালখানা থেকে অস্ত্র বেহাতের ঘটনা ঘটেছে একাধিকবার। ঢাকা ও খুলনায় কোর্টের মালখানা থেকে অস্ত্র বেহাতের অভিযোগে মামলাও হয়েছিল। এ ঘটনায় কয়েক পুলিশ কর্মকর্তা ও কোর্ট কর্মচারীকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। সেই মামলা কোন পর্যায়ে রয়েছে এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা মালখানার কেউই কোনো তথ্য দিতে পারেনি। চট্টগ্রামের মালখানায় অস্ত্র চুরির ঘটনা ঘটেছিল ১৯৯৩ সালে। এই ঘটনায় বিপুলসংখ্যক অস্ত্র ও গুলি বেহাত হয়। এসব অস্ত্র ও গুলি সন্ত্রাসীদের হাতে চলে গেছে বলে ধারণা করা হয়।

অস্ত্র উদ্ধার চিত্র
পুলিশ হেডকোয়ার্টারের হিসাব অনুযায়ী গত ১৯ বছরে ৪২ হাজারের মতো অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। ২০০৯ সালে প্রায় ৪ হাজার, ২০০৮ সালে ৩ হাজার ৯৫টি, ২০০৭ সালে ৩ হাজার ৬শ ৫৪টি, ২০০৬ সালে ২ হাজার ৭শ ৬৭টি, ২০০৫ সালে ৩ হাজার ৭৪টি, ২০০৪ সালে ২ হাজার ৬শ ৪০টি, ২০০৩ সালে ২ হাজার ৭শ ৬৭টি, ২০০২ সালে ১ হাজার  ৯শ ৮৯টি, ২০০০ সালে ৩ হাজার ৪শ ৩২টি, ১৯৯৯ সালে উদ্ধার করা অস্ত্রের পরিমাণ ৩ হাজার ৪শ ২০টি। উদ্ধার করা অস্ত্রের অর্ধেকই ছিল উন্নতমানের পিস্তল ও রিভলবার।

তদন্তের নামে যা হয়
অবৈধ অস্ত্রের সন্ধানে সারাবছর ধরেই দেশের কোথাও না কোথাও র‌্যাব কিংবা পুলিশ অভিযান চালায়। অভিযানে কখনো পুরনো অস্ত্র কখনো আবার অত্যাধুনিক অস্ত্রসহ সন্ত্রাসী বা অপরাধী গ্রেফতার হয়। কিন্তু ওই অস্ত্র গ্রেফতার হওয়া সন্ত্রাসীর কাছ থেকে কীভাবে, কোথা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে এ নিয়ে পুলিশ তদন্তে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফাঁকফোকর রয়ে যায়। এ কারণে অস্ত্রবাজদের বিরুদ্ধে দফায় দফায় মামলা হলেও আদালতে গিয়ে ওইসব অস্ত্র মামলা হয়ে পড়ে দুর্বল। আর এ দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সন্ত্রাসীরা জামিনে বেরিয়ে এসে একই অপরাধে আবারও জড়িয়ে পড়ে। পেশাদার অপরাধীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গত কয়েক বছরে গজিয়ে ওঠা জঙ্গিরাও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার শিখে গেছে। তারাও তৈরি করছে উন্নতমানের আগ্নেয়াস্ত্র। অবৈধ অস্ত্রের তদন্তে ঘাপলার পাশাপাশি অস্ত্র মামলার আসামিদের জামিন কিংবা বিচারের ক্ষেত্রে প্রসিকিউশনের গাফিলতির অভিযোগও কম হয়। রাজধানীর মিরপুর এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাতের অন্যতম সহযোগী কম্পিউটার সোহেলের বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলা করা হয়। সেই সঙ্গে বিস্ফোরক আইনেও মামলা হয় তার বিরুদ্ধে। ২০০৫ সালের ঘটনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএর মেধাবী ছাত্র সোহেল এক সময় পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে অস্ত্র ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। পুলিশ তাকে মিরপুর থানা এলাকা থেকে অস্ত্র, গুলি ও বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরকসহ গ্রেফতার করে। কিন্তু পরে তাদের তদন্তে ঘাপলা থাকায় সোহেল সহজেই ছাড়া পেয়ে যায়। অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার, অস্ত্র ব্যবসা কিংবা অস্ত্র মামলা সংক্রান্ত একাধিক ঘটনার পেছনের ঘটনা অনুসন্ধান করে বেরিয়ে এসেছে এসব তথ্য। ২০০০-এর অনুসন্ধানে দেখা যায়, এক হেরোইনসেবীকে অস্ত্র ব্যবসায়ী হিসাবে আদালতে চালান দেওয়ায় ওই অস্ত্র ব্যবসায়ী সহজেই জামিনে ছাড়া পেয়ে গেছে। নান্নু নামের ওই ব্যক্তি গ্রেফতার হওয়ার পর র‌্যাব ও পুলিশকে বলেছিল অস্ত্র কি জিনিস সে তা দেখেনি। একই অবস্থা ঘটেছে সন্ত্রাসী এবায়দুলের অস্ত্র মামলার ক্ষেত্রেও। তার বিরুদ্ধে খুন, চাঁদাবাজি ও অস্ত্র মামলাসহ অন্তত ২৮টি মামলা রয়েছে। দুটি বিদেশি পিস্তল, একটি রিভলবার ও একটি ম্যাগাজিনসহ গ্রেফতারের কয়েক মাসের ব্যবধানে সে জামিনে ছাড়া পেয়ে যায়। তার জামিনের খবরে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন মিরপুরের ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা। পুরনো ঢাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী ডাকাত শহীদের অস্ত্রভা-ার রক্ষক সন্ত্রাসী জাহিদ ও জুম্মন অস্ত্রসহ গ্রেফতারের দুমাসের মাথায় জামিনে বেরিয়ে আসে। তারা শুধু অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি বা খুনখারাবির সঙ্গেই যুক্ত নয়, অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলের ঘটনা। পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসীর অন্যতম আলাউদ্দিনকে গ্রেফতারের জন্য ডিবি পুলিশ তেজগাঁও বেগুনবাড়ি এলাকায় এক সন্ধ্যায় অভিযান চালায়। ওই অভিযানে আলাউদ্দিন গ্রেফতার হয়নি। তবে পুলিশের ধাওয়ার মুখে স্থানীয় কয়েক যুবক ভয়ে-আতঙ্কে বেগুনবাড়ি ঝিলে ঝাঁপ দেয়। তাদের মধ্যে সোহাগ নামে এক কিশোরও ছিল। সে তখন তেজগাঁও কমিউনিটি সেন্টার আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। ডিবির ধাওয়ার মুখে সে পানিতে ঝাঁপ দিলে পুলিশ সেখান থেকে তুলে এনে হাতে অস্ত্র ধরিয়ে দেয়। সে অস্ত্র হাতে ছবি তুলে তা সংবাদমাধ্যমেও সরবরাহ করা হয়। পরদিন পত্রিকায় ওই ছবি ছাপা হয়। সোহাগকে রিমান্ডেও নেয়া হয়। এরপর তার জামিন করাতে বাবা-মাকে মোটা অঙ্কের টাকা গুনতে হয়েছে। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর সোহাগ আর বই-খাতা-কলম হাতে তুলে নেয়নি। সে সত্যিকার অর্থেই অপরাধীদের দলে মিশে যায়। এখন সেই সোহাগ পুলিশের খাতায় দাগি অস্ত্র ব্যবসায়ী ও ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী। পুলিশের তালিকায় সোহাগের নাম লেদু হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিভিন্ন সময় পুলিশ-র‌্যাবের অভিযানে উদ্ধার হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র মালখানা থেকে খোয়া যাচ্ছেÑ এমন অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান করে একাধিক ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে। ১৯৯৬ সালের ১৬ নভেম্বর রাতে লালবাগ থানা পুলিশ একটি পিস্তল, ২টি বড় তলোয়ার ও দুটি চাকুসহ ইয়াকুব আলী এবং শাহীন নামে দুব্যক্তিকে গ্রেফতার করে। পরে তাদের বিরুদ্ধে পুলিশের দায়ের করা অস্ত্র মামলা পাঠানো হয় বিচারে। ২০ অক্টোবর মামলার শুনানি শুরু হলে বেরিয়ে আসে নানা তথ্য। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই ফরিদুজ্জামান আগ্নেয়াস্ত্রসহ দুজনকে গ্রেফতার করেছিলেন উল্লেখ করে যে মামলা দেন, সে মামলার সাক্ষ্য দিতে আদালতে এসে তিনি আলামত দেখাতে ব্যর্থ হন। তিনি আদালতে জানান, তার জব্দকৃত অস্ত্র মালখানায় সংরক্ষণ করা ছিল। কিন্তু তা কোথায় গেল সে ব্যাপারে কিছুই বলতে পারছেন না। তিনি শুধু জেনেছেন, মালখানায় সংরক্ষিত অস্ত্রগুলো পাওয়া যাচ্ছে না। এই ঘটনাটি আসলে হিমবাহের অগ্রভাগ মাত্র। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের পর অস্ত্রসহ আটক ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিচার নিষ্পত্তির আগ পর্যন্ত ওই অস্ত্র মালখানায় সংরক্ষিত থাকার কথা। সেখানে দেখাশোনার দায়িত্বে থাকে পুলিশের লোক। কিন্তু উদ্ধার হওয়া অবৈধ অস্ত্র সেখান থেকে কোথায় যায় সে প্রশ্নের জবাব মেলেনি।

অবৈধ অস্ত্র
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আড়াই শতাধিক অস্ত্র ব্যবসায়ী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে বলে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। তাতে বলা  হয়, শাসক দলের নেতাকর্মী পরিচয় দিয়ে সন্ত্রাসীরা অস্ত্র কেনাবেচা করছে। ওইসব অস্ত্র ব্যবসায়ীকে লালন-পালন করছে
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। রিপোর্ট অনুয়ায়ী ৬০টি পয়েন্ট দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে আগ্নেয়াস্ত্র প্রবেশ করছে। অস্ত্র মামলায় জামিনপ্রাপ্ত একাধিক আসামির সঙ্গে কথা হলে তারা অস্ত্র ব্যবহারসহ একাধিক বিষয়ে বেশ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। সন্ত্রাসীদের পছন্দের তালিকার শীর্ষে রয়েছে ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্র। একেকটি একে-৪৭ রাইফেল ৩ লাখ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা, আমেরিকার তৈরি পিস্তল দেড় লাখ থেকে দুই লাখ টাকা, নাইন এমএম পিস্তল ম্যাগাজিনসহ এক লাখ থেকে ২ লাখ টাকা, থ্রি টু বোরের রিভলবার (মেঘনাম কোম্পানি) ২ লাখ টাকা, উগনি কোম্পানির রিভলবার দেড় লাখ টাকা, মাউজার পিস্তল ২ লাখ টাকা, ইউএস তাউরাস পিস্তল সোয়া ২ লাখ টাকা, ইতালির প্রেটো বেরোটা পিস্তল প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকা, জার্মানির রুবি পিস্তল আড়াই লাখ টাকা, ইউএস রিভলবার দেড় লাখ টাকা, চায়নিজ রাইফেল দেড় লাখ টাকা থেকে ২ লাখ টাকা, পাইপগান (ভারতে তৈরি) ৬০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা, গুলি প্রতিরাউন্ড দেড়শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি অস্ত্রের মধ্যে টুটু বোরের পিস্তল ৩০ হাজার ও রিভলবার ৪৫ হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকার মধ্যে পিস্তল ও রিভলবার ভাড়া নিয়ে বিভিন্ন স্থানে অপরাধ করছে সন্ত্রাসীরা। ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে ৭ দশমিক ৬৫ ক্যালিবার, ৭ দশমিক ৬২ ক্যালিবার, ৬ দশমিক ৩৫ ক্যালিবারের পিস্তল বেশি ভাড়া হচ্ছে।

অবৈধ অস্ত্র নিয়ে গবেষণা
বাংলাদেশে কী পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র রয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর গোয়েন্দারা একটি হালনাগাদ তালিকা তৈরি করে। কিন্তু ওই তালিকা নিয়ে সন্তুষ্ট নয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপ সেন্টারের গবেষণা সূত্রে জানা যায় বাংলাদেশে অবৈধ অস্ত্রের ১২৮টি সিন্ডিকেট রয়েছে। দেশে অবৈধ অস্ত্র রয়েছে ৪ লাখ, যার মূল্য ২ হাজার ৫শ কোটি টাকা।
বিডিপিসির গবেষণা সূত্রে আরো যায় আফগানিস্তান বাদে সার্ক দেশগুলোতে ২৫ হাজার কোটি টাকার অবৈধঅস্ত্র আছে, যার পেছনে আন্তর্জাতিক মাফিয়া ও চোরাচালানিদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক কাজ করে। বাংলাদেশে এ সিন্ডিকেট প্রতিবছর ৫শ কোটি টাকার অবৈধ অস্ত্র নিয়ে আসে। এসব অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসায়ী অস্ত্রধারী এবং গডফাদারদের সবার তালিকা পুলিশের কাছে রয়েছে। কিন্তু পুলিশ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে না। অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসার সঙ্গে পুলিশ বিভাগের একটি অংশ জড়িত বলেও অভিযোগ আছে।
গোয়েন্দাদের পরিসংখ্যান সূত্রে জানা যায়, ২০০২ সালে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে কিনহার্ট অপারেশনে প্রায় ১০ হাজার ছোটবড় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এ অস্ত্রের এক-চতুর্থাংশও সরকারি মালখানায় জমা পড়েনি। তা হলে প্রশ্ন হচ্ছে এ অস্ত্র কোথায় গেল। একইভাবে ২০০৭ সালে যৌথ বাহিনীর অপারেশনে ৬ হাজার ২শ ৮৯ আগ্নেয়াস্ত্র, ২৯ হাজার ৪শ ৯৩ গোলাবারুদ উদ্ধার হয়। এ অস্ত্রও সবটুকু মালখানায় জমা পড়েনি। এ সময় গ্রেফতার হওয়া ৬ হাজার ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৩ হাজার মামলা করা হয়। অস্ত্রসহ ধরা পড়া এসব মামলার আসামিরা জামিনে বের হয়ে এসেছে। ফিরে গেছে পুরনো পেশায়।

অস্ত্র মামলায় যা হয়
অস্ত্র মামলায় সাজা হওয়ার রেকর্ড খুবই কম। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অস্ত্র উদ্ধারের পর কেউ সাক্ষী হতে চায় না। পুলিশবাদী যে মামলা হয় সে মামলার সাক্ষী হয় পুলিশ। বেশিরভাগ সময় পুলিশ এক জেলা থেকে অন্য জেলায় বদলি হয়ে যায়। মামলার সাক্ষী সাক্ষ্য দিতে উৎসাহ হারায়। এসব সাক্ষীকে উৎকোচ ধরিয়ে দিয়ে মামলা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হয়। এক সময় এসে সন্ত্রাসী বা অস্ত্র ব্যবসায়ী মামলা থেকে বেকসুর খালাস পেয়ে যায়। যারা প্রকৃত ও  ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী, অস্ত্র ব্যবসায়ী তাদের সঙ্গে সব সময় পুলিশের যোগসাজশ থাকে বলে অভিযোগ আছে। আরো অভিযোগ রয়েছে পুলিশ এদের দিয়ে অস্ত্রের কারবার করে। এদের কেউ ধরা পড়লে পুলিশি তদন্তের আগেই লেনদেন হয়ে যায়। ফলে উদ্ধার হওয়া ওই অস্ত্র ডামি অস্ত্র হিসাবে দেখিয়ে দেয়। ফলে ওই মামলা থেকে সন্ত্রাসী বেকসুর খালাস পেয়ে যায়।

মালখানার দুরবস্থা
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকা মহানগর কোর্টের মালখানায় বছরের পর বছর ধরে পড়ে থাকা অস্ত্রের (আলামত) সংখ্যা কয়েক হাজার। রাজধানীর বাইরের
বিভিন্ন কোর্ট মালখানার অবস্থাও একই। মালখানা থোকে কোর্টে যারা আলামত হিসাবে অস্ত্র বহন করে তারা সরকারি লোক নন। কোর্টের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সোর্স বা বিশ্বস্ত লোক। এসব মালখানায় কত পরিমাণ অস্ত্র আছে তার সঠিক পরিসংখ্যান মালখানা কর্তৃপক্ষ দিতে রাজি হন না। এক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশের দোহাই তোলেন। মালখানা সূত্রে জানা যায়, ২০-৩০ বছরের পুরাতন অস্ত্র এখানে পড়ে আছে। কারণ হিসাবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে  সংশ্লিষ্ট একজন বলেন, ৩০ বছর পার হলেও মামলার কোনো গতি হয়নি। তাছাড়া সন্ত্রাসীরা মারা গেলে অস্ত্র নিয়ে আর পুলিশ মাথা ঘামায় না। ফলে এই অস্ত্র পড়ে থাকে। রাজারবাগ কেন্দ্রীয় অস্ত্রাগার সূত্রে জানা যায়, এখানে প্রতিবছর ৪ হাজার অবৈধ অস্ত্র জমা পড়ে। সারাদেশ থেকেই উদ্ধার করা অবৈধ অস্ত্র নানা রকম আইনি প্রক্রিয়ায় এখানে আসে। এসব অস্ত্র স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বিভিন্ন সময় সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। গত ২০ বছরে প্রায় ৬০ হাজার অস্ত্র সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। রাজারবাগ কেন্দ্রীয় অস্ত্রাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, এখানে যেসব অস্ত্র জমা দেওয়া হয় তার সিংহভাগ অচল, অকেজো, নষ্ট। আধুনিক অস্ত্র এখানে তেমন দেখা যায় না। বিদেশি অস্ত্র নেই বললেই চলে। এসব অস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ পার্টস থাকে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উদ্ধার করা অস্ত্রের শেষ পরিণতি কী তা পুলিশ ও র‌্যাবের অনেক কর্মকর্তাই জানেন না। এ প্রসঙ্গে পুলিশের এক ডিআইজি বলেন, অস্ত্র ধরা পড়া ও আদালতের মাধ্যমে মালখানায় জমা পড়া পর্যন্ত অনেক ঘটনা ঘটে। আমরা নিজেরাও অনেক সময় অস্ত্র সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারি না।
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসী গ্রেফতার এবং অস্ত্র ব্যবসা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার ২০০০কে বলেন, পুলিশের উদ্ধার করা অস্ত্রের মধ্যে অনেক মূল্যবান ও অত্যাধুনিক অস্ত্র রয়েছে। এসব অস্ত্রের ব্যাপারে আইনের বিধান ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ীদের ধরতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে আসছে। অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ী কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। তবে সবই করা হচ্ছে আইন অনুযায়ী।
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু বলেন, পুলিশ অস্ত্র উদ্ধারে কোনো অনিয়ম করে, এ রকম কোনো তথ্য আমার জানা নেই। অবৈধ অস্ত্র আসলে কোথায় যায় তা খতিয়ে দেখতে হবে। আর তদন্তে যাতে কোনো ফাঁকফোকর না থাকে সে বিষয়ে আমরা পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছি।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: