• Categories

  • Archives

  • Join Bangladesh Army

    "Ever High Is My Head" Please click on the image

  • Join Bangladesh Navy

    "In War & Peace Invincible At Sea" Please click on the image

  • Join Bangladesh Air Force

    "The Sky of Bangladesh Will Be Kept Free" Please click on the image

  • Blog Stats

    • 277,514 hits
  • Get Email Updates

  • Like Our Facebook Page

  • Visitors Location

    Map
  • Hot Categories

ইতিহাসে জলদস্যুতা

Source : সাপ্তাহিক ২০০০

শানজিদ অর্ণব

undefined
জলদস্যু বলতে বোঝায় সাগরের ডাকাতদের, যারা অন্য জাহাজে হামলা করে লুটপাট চালায় এবং মাঝে মাঝে সেই জাহাজটাকেই দস্যুদের নিজেদের ব্যবহারের জন্য দখল করে নেয়। জলদস্যুতা শুরু হয়েছিল প্রায় ২০০০ বছর আগে প্রাচীন গ্রিসে। জলদস্যুরা তখন গ্রিসের বাণিজ্যপথকে অনিরাপদ করে তুলেছিল। তখন থেকে শুরু করে নিয়মিত নৌবাহিনী সৃষ্টির আগ পর্যন্ত এ জলদস্যুরা সমুদ্র তীরবর্তী দেশগুলোকে নিরাপত্তাহীন করে তুলেছিল। রোমানদের শস্য এবং জলপাই তেল ভর্তি জাহাজগুলো এই জলদস্যুদের লুটপাটের শিকার হতো।

ভাইকিংস নামে পরিচিত স্ক্যান্ডিনেভীয় জলদস্যুরা জাহাজ এবং উপকূলীয় এলাকায় হামলার জন্য পৃথিবীব্যাপী পরিচিতি লাভ করে। জলদস্যুতা চরম আকার ধারণ করে ১৬২০-১৭২০ সাল কালপর্বে। এ সময় জলদস্যুতার স্বর্ণযুগ নামে পরিচিত। ষোড়শ থেকে উনিশ শতকের মধ্যে প্রধানত তিন ধরনের জলদস্যুর দেখা পাওয়া যায়। এরা হলো প্রাইভেটিয়ার, বাকোনিয়ার এবং করসায়ার। প্রাইভেটিয়াররা ছিল বিভিন্ন দেশের সরকার কর্তৃক অনুমোদিত জলদস্যু। এই জলদস্যুরা শত্রু দেশের জাহাজ আক্রমণ ও লুটপাট করত। এই লুটপাটের একটা অংশ দস্যুদের নিয়োগকারী দেশের সরকার পেত। ষোড়শ থেকে আঠারো শতকের মধ্যকার সময়ে সরকারগুলো এই জলদস্যুদের ‘লেটার অব মার্ক’ প্রদান করত, যা ছিল ভিনদেশি জাহাজ ডাকাতির লাইসেন্স। ফ্রান্সিস ড্রেক ছিলেন ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বিখ্যাত প্রাইভেটিয়ার। বাকোনিয়াররা ছিল একইসঙ্গে দস্যু এবং প্রাইভেটিয়ার। ওয়েস্ট ইন্ডিজে ছিল এদের প্রধান ঘাঁটি। এদের কাজ ছিল ক্যারিবিয়ান সাগরে স্প্যানিশ বাণিজ্য জাহাজকে আক্রমণ করা। করসায়াররা ছিল মুসলমান এবং খ্রিস্টান জলদস্যু, যারা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ষোড়শ থেকে উনিশ শতকের মধ্যে সক্রিয় ছিল। উত্তর আফ্রিকার মুসলিম করসায়ার জলদস্যুদের পৃষ্ঠপোষকতা করত আলজিয়ার্স, তিউনিস, ত্রিপোলি এবং মরক্কোর সরকাররা। এই মুসলিম করসায়ারদের ব্যবহার করা হতো খ্রিস্টান দেশের জাহাজ আক্রমণ করতে। অন্যদিকে মালটার করসায়াররা ছিল খ্রিস্টান।
সেন্ট জনের খ্রিস্টান নাইটদের অনুমোদনের মাধ্যমে এই খ্রিস্টান করসায়াররা তুর্কি জাহাজ আক্রমণ করত।
মধ্যযুগীয় ইউরোপের সবচেয়ে প্রভাবশালী জলদস্যু ছিল ভাইকিংসরা। স্ক্যান্ডিনেভীয় অঞ্চল থেকে আগত এই যোদ্ধা এবং ডাকাতরা ৭৮৩ থেকে ১০৬৬ সালের মধ্যে সক্রিয় ছিল। ভাইকিংসরা সমগ্র পশ্চিম ইউরোপের উপকূল, নদী এবং শহরগুলোতে লুটতরাজ চালায়। এ ছাড়া ভাইকিংসদের তৎপরতা বিস্তার লাভ করে বাল্টিক সাগর উপকূল, উত্তর আফ্রিকা, ইতালি, কৃষ্ণসাগর থেকে পারস্য পর্যন্ত। মধ্যযুগে ইউরোপে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শক্তির অভাবেই ভাইকিংসরা মহাদেশজুড়ে বিস্তৃতি লাভ করে। এর মধ্যেই ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে পরিচিত হয়ে ওঠে মুসলিম জলদস্যুরা। নবম শতকের শেষভাগে দক্ষিণ ফ্রান্স এবং উত্তর ইতালির উপকূল মুসলিম জলদস্যুদের স্বর্গে পরিণত হয়।
প্রাচীন ভারতেও জলদস্যুতার কথা উল্লেখ আছে। যুদ্ধের অজুহাত হিসাবে এখানে ব্যবহৃত হয়েছিল এই জলদস্যুতা। সপ্তম শতকে আরব খলিফা হাজ্জাজ ভারত বিশেষত সিন্ধু দখলে সচেষ্ট হন। আরব খলিফা ভারত আক্রমণের জন্য অজুহাত খুঁজতে থাকেন। শ্রীলঙ্কা থেকে বাগদাদ যাওয়ার পথে দেবল বন্দরে একটি জাহাজ জলদস্যুদের দ্বারা আক্রান্ত এবং লুট হয়। বাগদাদের খলিফা এ জন্য সিন্ধুর রাজা দাহিরের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেন। কিন্তু দাহির জলদস্যুদের ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই এ কথা জানিয়ে ক্ষতিপূরণ দিতে অস্বীকার করেন। এ ঘটনা আরব এবং সিন্ধুর মধ্যে যুদ্ধের কারণ হয়ে ওঠে। ১৬ এবং ১৭ শতকে হজের উদ্দেশ্যে মক্কা গমনকারী মুঘল ভারতীয় জাহাজে হামলা করত ইউরোপীয় জলদস্যুরা।
দক্ষিণ-পূর্ব-এশিয়ার জলদস্যুতা শুরু হয় ইউয়ান মোঙ্গলদের আমলে। পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী জলদস্যু ছিল চীনারা কইং রাজত্বের মধ্যভাগে। উনিশ শতকের প্রথমভাগে চীনা জলদস্যুরা অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। চীনা অর্থনীতিতে এই জলদুস্যদের বিরাট অবদান ছিল। দুর্ভিক্ষ, কইং নৌবাহিনীর বিরুদ্ধাচরণ এবং অন্তর্কলহের সমন্বিত প্রভাবে ১৮২০ সালের  কাছাকাছি চীনা জলদস্যুরা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এবং আগের অবস্থায় আর তারা ফিরতে পারেনি।
১৬ এবং ১৮ শতকের মধ্যে পূর্ব ইউরোপে ছিল জলদস্যুদের একটি প্রজাতন্ত্র। দুর্গম স্তেপ অঞ্চল অবস্থিত জাপোরিঝিয়ান সিচ নামক এই প্রজাতন্ত্রের অধিবাসীরা ছিল ইউক্রেনের ছোট কৃষক। এরা ছিল সামন্ত প্রভুদের কাছ থেকে পালিয়ে আসা কৃষক অথবা তুর্কি জাহাজ থেকে পলাতক দাস। নিজেদের ‘কসাক’ বলে পরিচয় দানকারী এই জলদস্যুদের প্রধান নিশানা ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্গত কৃষ্ণসাগর তটে বাসকারী ধনী নাগরিকরা।
১৫২৩ সালে অ্যাজটেকদের মূলবান সম্পদ মেক্সিকো থেকে স্পেন নিয়ে যাওয়ার পথে দুটি স্প্যানিশ ট্রেভার জাহাজ লুট করে জিন ফিউরি। ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে জলদস্যুদের উজ্জ্বলতম অধ্যায় কাটে ১৫৬০ থেকে ১৭২০ সালের মধ্যে। অনেক জলদস্যু ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে আসে ধারাবাহিক স্প্যানিশ যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর। দ্রুত এরা ভয়ানক জলদস্যুতে পরিণত হয়। ক্যারিবিয়ান জলদস্যুদের মধ্যে সব থেকে উল্লেখযোগ্য হলেন ‘ব্ল্যাকবিয়ার্ড’ খ্যাত এডওয়ার্ড টিচ, ক্যালিকো জ্যাক র‌্যাকহাম, হেনরি মরসাব এবং বার্থলোমিউ ররার্টস।
ইতিহাসে দেখা পাওয়া যায় কয়েকজন ক্ষমতাধর মহিলা জলদস্যুর। চিং শিহ নামক এক মহিলা জলদস্যু বিশাল এক জলদস্যু সম্প্রদায়ের নেতা ছিলেন। অ্যানি বনি এবং মেরি রিড নামক দুজন প্রভাবশালী মহিলা জলদস্যু ১৭২০ সালে ধরা পড়েন এবং জ্যামাইকার আদালতে এদের বিচার হয়। দুজনেরই মৃত্যুদ- হয় কিন্তু গর্ভবতী হওয়ার কারণে দুজনই সাজা থেকে রেহাই পান।
জলদস্যুদের সত্যিকার পতাকা ছিল রক্তলাল রঙের, যার অর্থ ছিল লড়াইয়ের ময়দানে জলদস্যুরা কোনো কিছুকেই ক্ষমা করে না। জলদস্যুতা বিস্তার লাভের সঙ্গে সঙ্গে নানা ধরনের পতাকার উদ্ভব হয়। অনেক জলদস্যুর ছিল নিজস্ব পতাকা। তবে জলদস্যুদের সবচেয়ে বিখ্যাত পতাকা হলো জলি রজার। এ পতাকাটি হলো মানুষের মাথার খুলি এবং আড়াআড়ি রাখা দুটি হাড়।
জলদস্যুরা এক সময় জড়িয়ে পড়ে দাস ব্যবসায়। তারা বুঝতে পারে জাহাজের মালামাল লুট করার চেয়ে জাহাজের কর্মীদের দাস হিসাবে বিক্রি করা বা তাদের আটক করে মুক্তিপণ আদায় বেশি লাভজনক। সপ্তদশ এবং অষ্টাদশ শতকে যখন দাস ব্যবসা খুবই লাভজনক এবং বিস্তৃত ছিল। তখন বহু জলদস্যু এ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। জলদস্যুরা দাস ও দাস বহনকারী জাহাজ ছিনতাই করত এবং পশ্চিম আফ্রিকার দাস বন্দরগুলোতে হানা দিত। ১৮৩০ সাল নাগাদ ‘পিকারুন’ শব্দটি ব্যবহৃত হতো একই সঙ্গে জলদস্যু এবং দাস ব্যবসায়ী বোঝাতে। জন হকিন্স (১৫৩২-৯৫) নামক এক ইংরেজ প্রাইভেটিয়ার প্রথম দাস ব্যবসাকে লাভজনক হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন।
জলদস্যুতার শাস্তি ছিল জনসমক্ষে ফাঁসি। জলদস্যুদের ফাঁসিকাষ্ঠ থেকে ঝুলন্ত দেহ আলকাতরা মাখিয়ে সংরক্ষণ করা হতো। এই দস্যুদের মৃতদেহগুলো লোহার খাঁচায় আটকে রাখা হতো যাতে মৃতদেহগুলো তাদের আত্মীয়রা সৎকার করতে না পারে।

উইলিয়াম কিড নামক এক জলদস্যুর দেহ টিলবারি পয়েন্টে তিন বছর ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল জলদস্যুদের ভয় দেখাতে।
সংগঠিত জাতীয় নৌবাহিনীগুলো গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে জলদস্যুতা হ্রাস পেতে থাকে। ১৮৫৬ সালে বেশিরভাগ সমুদ্র তীরবর্তী দেশ ‘প্যারিস ঘোষণা’য় স্বাক্ষর করে। এই ঘোষণার মাধ্যমে প্রাইভেটিয়ারদের বৈধতা দানকারী লেটার অব মার্ক নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনী কঠোরভাবে এই আইন প্রয়োগ করায় জলদস্যুতা হ্রাস পায়।

১৮০৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ত্রিপোলির করসায়ারদের দমন করতে অভিযান শুরু করে। ১৮১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র এবং গ্রেট ব্রিটেন ক্যারিবিয়ান জলদস্যুদের বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু করে। আগের শতাব্দীর মতো না হলেও জলদস্যুদের তৎপরতা একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি। ৯০ দশকে বিভিন্ন রাজনৈতিক গ্রুপ তাদের বিভিন্ন চাহিদা পূরণে জাহাজ ছিনতাই ও নাবিকদের জিম্মি করত। ১৭ শতকে বাকোনিয়ারদের নিয়ে অসংখ্য গান, নাটক, উপন্যাস রচিত হয়েছে। বাস্তবের চেয়ে উপন্যাসের জলদস্যুরাই বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করে। কবি বায়রন তার ‘দ্য করসায়ার’ কবিতায় জলদস্যুদের রোমান্টিক নায়ক হিসাবে উপস্থাপন করেছেন। অন্যদিকে রবার্ট লুই স্টিভেনসনের বিখ্যাত ‘ট্র্যজার আইল্যান্ড’ উপন্যাসে জলদস্যুদের সত্যিকার খল চরিত্র ফুটে ওঠে।

বাংলায় মগ-ফিরিঙ্গি জলদস্যুদের তৎপরতা

‘বস্তুত সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বাংলার উপকূলীয় এলাকায় মগ-ফিরিঙ্গিদের অব্যাহত দৌরাত্ম্য সমাজ জীবনে এক অভিশাপরূপে আবির্ভূত হয়। বিশেষ করে হিন্দু সমাজে নারীদের অবস্থা করুণ পর্যায়ে উপনীত হয়। যেসব স্ত্রীলোক কোনো না কোনোভাবে মগ-ফিরিঙ্গির সংস্পর্শে আসত তারা সমাজে চরম লাঞ্ছনা ভোগ করত।’ (মোহাম্মদ আলী চৌধুরী ‘চট্টগ্রামে মগ-ফিরিঙ্গি দৌরাত্ম্য, ‘ইতিহাস অনুসন্ধান-১৫’)
‘খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে একদল পর্তুগীজ বঙ্গোপসাগরের পূর্ব উপকূলে আরাকানে আশ্রয় নেয় এবং আরাকানের মগ রাজার এবং চাটগাঁর মগরাজ প্রতিনিধির অধীন বাস করিতে থাকে। কর্ণফুলী নদীর মুখে চাটগাঁ শহরের কাছে এই ফিরিঙ্গিদের পৃথক গ্রাম ছিল। নাম ফিরিঙ্গি বন্দর। আরাকান হইতে মগ ও ফিরিঙ্গিরা প্রতিবছর জলপথে বাংলায় ডাকাতি করিতে আসিত। হিন্দু, মুসলমান, স্ত্রী-পুরুষ, ধনী-দরিদ্র যাহাকে পাইত বন্দি করিত এবং তাহাদের হাতের পাতা ফুটা করিয়া তাহার মধ্যে পাতলা বেত চালাইয়া দিয়া বাঁধিয়া নৌকার পাটাতনের নিচে ফেলিয়া লইয়া যাইত। যেমন খাঁচার মধ্যে মুরগীকে ধান ফেলিয়া দেওয়া হয়, তেমনি এদের জন্য প্রাতে ও সন্ধ্যায় কাঁচা চাউল ফেলিয়া দেওয়া হইত। এ কষ্ট ও অত্যাচারে অনেকে মরিয়া যাইত; যে কয়টি ‘শক্তপ্রাণ’ লোক বাঁচিয়া যাইত তাহাদের চাষাবাদ ও অন্যান্য নীচ কাজের জন্য দাসভাবে রাখিত। এইরূপে ক্রমে মগ ও ফিরিঙ্গিগণের সংখ্যা ও সম্পদ বাড়িতে লাগিল আর বাঙ্গালা দিন দিন জনশূন্য ও উচ্ছন্ন হইতে লাগিল। চাটগাঁও হইতে ঢাকা পর্যন্ত দস্যুদের যাতায়াতের পথে নদীর দুধারে একটিও বাড়ি রহিল না। সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি চাটগাঁও ফিরিঙ্গিদের ১০০ দ্রুতগামী অস্ত্রপূর্ণ যুদ্ধপোত (নাম : জলবা) ছিল। ফিরিঙ্গিরা তাহার চালক এবং তাহাদের যথেষ্ট নৌকা ছিল বলিয়া, আরাকানের রাজা ইদানীং নিজের নৌকা বাংলায় পাঠাইতেন না; কেবল ফিরিঙ্গিদের দিয়া লুট করাইয়া তাহার অর্ধেক ভাগ লইতেন।’ (শিহাব উদ্দিন তালিশ ‘ফাতিয়া ই ইবরিয়া’, অনু : স্যার যদুনাথ সরকার)
‘বঙ্গের সীমান্ত আরাকান রাজ্যে (চট্টগ্রামে) পর্তুগীজ ও অন্যান্য ফিরিঙ্গি জলদস্যুরা উপনিবেশ স্থাপন করিয়াছিল। … এমন কোনো অপকর্ম ছিল না যা তারা করতে পারত না। … হত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজ  ইত্যাদি বিষয়ে তাদের সমকক্ষ কেউ ছিল না। মুঘলদের ভয়ে ভীত আরাকানের রাজা যুদ্ধাদির প্রয়োজনে এসব ফিরিঙ্গি দস্যুদের নিজ রাজ্যের সীমান্তদেশে, চাটগাঁও বন্দরে পর্তুগীজ দস্যুদিগকে জমি দিয়া বাস করিতে অনুমতি দিয়াছিলেন। ছোট বড় নৌকার সাহায্যে উহারা প্রায়ই গঙ্গার শাখা-প্রশাখা দিয়া ৬০-৭০ ক্রোশ পর্যন্ত দেশের ভেতরে প্রবেশ করিয়া লুটপাট করিত।’ (বিনয় ঘোষ, ‘বাদশাহী আমল’ ফ্রাঁসোয়া বর্নিয়া’র ভারত ভ্রমণ বৃত্তান্তের অনুবাদ)
‘আরাকান শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় উপরোল্লিখিত ফিরিঙ্গিরা মগ জলদস্যুদের সঙ্গে এক হয়ে চট্টগ্রাম ও তৎসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় দস্যুবৃত্তি, খুন, অপহরণ ইত্যাদি মাধ্যমে বিভীষিকাময় অবস্থার সৃষ্টি করে। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, ১৬২১ খৃ. থেকে ১৬২৪ খৃ. সময়কালে তারা ৪২ হাজার বন্দী বঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চট্টগ্রামে নিয়ে আসে।…মূলতঃ মগ-ফিরিঙ্গিদের অত্যাচারে বঙ্গের উপকূলীয় এলাকা জনশূন্য হয়ে পড়ে। … তাদের লুণ্ঠন ও অপহরণের ভয়ে এসকল এলাকার লোকে রাতে বাতি পর্যন্ত জ্বালাত না।’ (মোহাম্মদ আলী চৌধুরী, চট্টগ্রামে মগ-ফিরিঙ্গি দৌরাত্ম্য : ‘ইতিহাস অনুসন্ধান-১৫’)
‘ইসলাম খাঁ তাহার রাজধানী ঢাকায় স্থাপন করিলেন। এই মগ ও পর্তুগীজদিগকে দমন করাই তাহার এই রাজধানী পরিবর্তনের প্রধান কারণ ছিল। তৎপূর্বে প্রতাপাদিত্য মগ ও পর্তুগীজদের দৌরাত্ম্য অনেক পরিমাণে দূর করিয়াছিলেন। এমনকি ছলনাপূর্বক সন্দ্বীপের শাসনকর্তা কার্ভালোকে ধূমঘাটে (সাতক্ষীরা) আনিয়া অবিচারে নিহত করিয়াছিলেন। এই ঘটনায় পর্তুগীজদের মধ্যে মহা আতঙ্ক উপস্থিত হয়। … শায়েস্তা খাঁ (১৬৬৬ খ্রি.) মগদিগের হস্ত হইতে চট্টগ্রাম উদ্ধার করিয়া উহাকে ইসলামাবাদ নামে পরিচিত করেন।
দীনেশ চন্দ্র সেন, ‘বৃহৎবঙ্গ’ সেই মগেরা আজও বাঙালির নিকট বর্বর, অসভ্য, জলদস্যু বলিয়া পরিচিত। সেই মগ রাজাদের রাজসভায় সে সময় বঙ্গ-ভারতী অভিনন্দিত হইয়াছিলেন। কেননা সপ্তদশ শতাব্দীতে আরাকান রাজসভায় বাঙ্গালা ভাষা যেরূপ নানা দিক দিয়া পরিপুষ্ট হইয়া উঠিয়াছিল ইহার আপন ভূমিতে তেমনটি হয় নাই।’ (ড. এনামুল হক, ‘আরাকান রাজসভায় বাংলা সাহিত্য’)

সাম্প্রতিক জলদস্যুতা

সাম্প্রতিক সময়ে সোমালি জলদস্যুদের তৎপরতা হঠাৎ করেই সোমালিয়াকে পাদপ্রদীপে নিয়ে এসেছে। বিভিন্ন দেশ সোমালি জলদস্যুদের ঠেকাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। কারণ তাদের বাণিজ্যিক জাহাজগুলো সোমালিয়ার জলসীমায় প্রায়ই জলদস্যুদের দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে। নিরাপত্তা বাহিনীর জাহাজ, আধুনিক অস্ত্র এবং নেভিগেশন যন্ত্রপাতি নিয়ে সোমালিয়ার জলসীমায় নিয়মিত টহল দিচ্ছে জলদস্যুদের প্রতিহত করতে। যদিও এ ব্যবস্থাও খুব বেশি সফল হয়নি এবং ধারণা করা হচ্ছে এভাবে জলদস্যুদের মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। এর কারণ এই জলদস্যুদের তৎপরতার অন্তর্নিহিত প্রেক্ষাপটটি একটু ভিন্ন।
জলদস্যুতার ঘটনা ঘটার আগে সোমালিয়া ছিল একটি বিকাশমান মৎস্য শিল্পকেন্দ্র। সরকারি বাহিনী এবং বিদ্রোহীদের মধ্যে চলমান সংঘর্ষ দেশটির মানুষকে চরম দারিদ্র্য, ক্ষুধা আর বেকারত্বের শেকলে বেঁধে রেখেছে। গ্রেট ব্রিটেন, পশ্চিম জার্মানিসহ কিছু দেশ সোমালিয়ার মৎস্য শিল্পের উন্নয়নে বেশ সাহায্য প্রদান করে। এভাবে সেখানকার মৎস্য শিল্প বিকশিত হয় এবং প্রচুর মানুষ মাছ ধরার কাজে নিযুক্ত হয়। আহরিত মাছের বেশিরভাগই বিদেশে রফতানি এবং মৎস্য শিল্পের কোম্পানিগুলো লাভের মুখ দেখে। মৎস্য শিল্প বিকশিত হওয়ার পাশাপাশি সোমালিয়ার গৃহযুদ্ধের তীব্রতাও বৃদ্ধি পায়। মৎস্য শিল্পের উন্নয়নের জন্য পাওয়া বিদেশি সাহায্য ব্যয় করা হয় যুদ্ধের ময়দানে।
এখনো সোমালিয়ার কোনো স্থায়ী শক্তিশালী সরকার নেই। ফলে এদেশের জলসীমায়ও কোনো উপকূলীয় এবং সামুদ্রিক আইন প্রয়োগের ব্যবস্থা নেই। কিছু দেশ সোমালিয়ার এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে দেশটির জলসীমায় মৎস্য আহরণ শুরু করে। এ ছাড়াও কিছু দেশ ক্ষতিকারক রাসায়নিক বর্জ্যপদার্থের ডাম্পিং ক্ষেত্র হিসাবে ব্যবহার করে এই দেশটির  জলসীমাকে। অবৈধ মৎস্য শিকার এবং বর্জ্যপদার্থের ডাম্পিং সোমালিয়ার জলসীমায় মাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনক কমিয়ে দেয়। এ অবস্থাতে সোমালিয়ার স্থানীয় মৎসজীবীরা বিদেশিদের হাত থেকে তাদের সম্পদ রক্ষার সিদ্ধান্ত নেয়। এভাবে জন্ম হয় সোমালি জলদস্যুদের।
সাম্প্রতিককালে জন্ম নেয়া কিছু জলদস্যু সাগরের রবিন হুডের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। সোমালিয়ার উপকূলে ডাম্প করা বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ পরিষ্কারে তারা অর্থ খরচ করছে। অনেক জলদস্যু তাদের জীবিকা অর্জনের উপায়কে কেড়ে নেয়া হয়েছে বলে এখনো ক্ষোভ পোষণ করে। অবশ্য এটাই সেখানকার পূর্ণ চিত্র নয়। অনেক জলদস্যুই লোভী এবং নীতিহীন। তারা মাদক চোরাচালানের মাধ্যমে বিপুল অর্থ-উপার্জন করছে এবং এই অর্থের লোভ আরো অনেক দরিদ্রকে উৎসাহ জোগাচ্ছে জলদস্যু হতে। এই জলদস্যুরা রক্তপাত আর সহিংসতার মাধ্যমে মিলিয়ন ডলার উপার্জন করছে। সম্প্রতি প্রেস টিভির সাংবাদিক টমাস মাউন্টেন অভিযোগ করে বলেছেন, সোমালি জলদস্যুদের অর্জিত মুক্তিপণের টাকার ভাগ পাচ্ছে দেশটির সশস্ত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং ইথিওপিয়ার সেনাবাহিনী। উল্লেখ্য, ইথিওপিয়ার প্রেসিডেন্ট মেলেস জেনোত্তরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি। এই জলদস্যুরা কঠোরভাবে চেইন অব কমান্ড মেনে চলে।
শীর্ষনেতারা পুরো দল পরিচালনা করে এবং লুট করা অর্থের প্রধান অংশ নিয়ে নেয়। এরা প্রধানত জাহাজ হাইজ্যাক, কার্গো ডাকাতি এবং মুক্তিপণ আদায়ের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করে। উন্নত অস্ত্রশস্ত্র, নৌবিদ্যায় অগাধজ্ঞান এবং লুকানোর স্থান সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকায় এদের দমনের সব পদক্ষেপই ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া এই দস্যুরা মাফিয়া এবং একটি চায়নিজ চক্রের সহযোগিতায় এই জলপথের নিয়ন্ত্রণকারী শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
সোমালিয়ার জলদস্যুদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা সামনে আসছে। সোমালিয়ার অধিকাংশ মানুষ চরম দারিদ্র্যপীড়িত, দেশের সরকারও ভঙ্গুর। তাই বিভিন্ন অপরাধী চক্র এবং বিদেশি শক্তি সহজেই এদের জলদস্যুতায় নিযুক্ত করছে। সোমালিয়া পৃথিবীর অন্যতম ব্যস্ত সামুদ্রিক রুটের কাছে অবস্থিত হওয়ায় এটি সহজেই জলদস্যুদের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এ জলদস্যুরা সাধারণত আক্রমণ করে রাতে এবং ভোরে। তাই দূর থেকে এদের শনাক্ত করা কষ্টকর হয়। তাছাড়া এদের জলযানগুলো ছোট এবং দ্রুতগামী হওয়ায় বাণিজ্যিক জাহাজের রাডারেও সহজে এরা ধরা পড়ে না। আর ধরা পড়লেও সহজে বাণিজ্যিক জাহাজের পক্ষে দ্রুত সরে যাওয়া সম্ভব নয়। এ ছাড়া বাণিজ্যিক জাহাজে নানা কারণেই শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তাই অনেকে মনে করেন সোমালিয়ায় জলদস্যু সদস্য তৃণমূল উৎস থেকে নির্মূল না করলে এর সমাধান হবে না।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: