• Categories

  • Archives

  • Join Bangladesh Army

    "Ever High Is My Head" Please click on the image

  • Join Bangladesh Navy

    "In War & Peace Invincible At Sea" Please click on the image

  • Join Bangladesh Air Force

    "The Sky of Bangladesh Will Be Kept Free" Please click on the image

  • Blog Stats

    • 280,479 hits
  • Get Email Updates

  • Like Our Facebook Page

  • Visitors Location

    Map
  • Hot Categories

সুন্দরবনের বনদস্যুদের সেকাল-একাল

Source : সাপ্তাহিক ২০০০

শুভ্র শচীন


ভারত-পাকিস্তান পৃথক রাষ্ট্র হিসাবে আবির্ভূত হলে সীমান্তের ওপারের ডাকাত এপারে ডাকাতি করে পালিয়ে যায়। আর এপারের ডাকাত ওপারে ডাকাতি করে নিরাপদে ঘরে ফেরে। এ যেন সীমানাবিহীন অন্য এক পৃথিবী। অতীতে ডাকাতরা জেলে-বাওয়ালিদের তেমন অত্যাচার করত না। পাকিস্তান আমলে দেিণর সুন্দরবন সংলগ্ন ধনীশ্রেণীর কৃষক এবং চোরাকারবারিরা ছিল ডাকাতদের প্রধান শিকার। ১৯৪৭ সালের পর ঢাকা জেলার দরবার ডাকাতের নিষ্ঠুরতা ছিল সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। দরবার ডাকাতের ঘাঁটি ছিল সুন্দরবনের দণি-পশ্চিম অঞ্চলে বেয়ালা কয়লা নামক দুর্গম স্থানে। দরবার ডাকাত কাঠের ঘেরিদার, চোরাকারবারিসহ গ্রাম অঞ্চলে ডাকাতি করত। ওই সময়েই সে বন বিভাগের পেট্রলবোট আক্রমণ করে দুটি রাইফেল হাতিয়েছিল। ডাকাতরা সে সময় ব্যবহার করত বন্দুক, দেশি গাঁদা বন্দুক, রামদা, কুড়াল, কাতরা, কালি, ঢাল-সরকি জাতীয় অস্ত্র। দরবার ডাকাতের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড বাসির ওরফে বাসের ডাকাতও প্রতিপরে হাতে নিহত হয়। দরবার ডাকাতের সমসাময়িক ডাকাতরা হলো : পুলিশ কনস্টেবল হয়ে নিজেকে দারোগা হিসাবে জাহিরকারী দারোগা ডাকাত, মোকসেদ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বর্ধমান জেলায় বর্মা ও পিরোজপুরের সৈয়দ আলী। দরবার ডাকাত খুন হলে বাসির ওরফে বাসের সুন্দরবনের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে পড়ে।
খুলনার পাইকগাছা উপজেলায় জন্ম নেয়া বাসির ডাকাত ছিল অনেকটা কিংবদন্তির ডাকাত চরিত্রের মতো। গরিব মানুষদের অকাতরে সাহায্যকারী হিসাবে তার খ্যাতি ছিল। বন বিভাগের নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের সঙ্গে তার ছিল দহরম-মহরম। স্থায়ীভাবে নিবাস গড়েছিলেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বসিরহাট জেলায়। ছেলেমেয়েদেরও পড়াশোনা করিয়েছেন। বাসির ডাকাতের দলে নৈতিকতা কঠোরভাবে মানা হতো। মেয়েদের ওপর অত্যাচার হলে সে নিজেই তার বিচার করত। এমনই বিচারে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় সে আপন বোনের ছেলেকে হত্যা করে। ডাকাত বাসির সবসময় বড় জোতদার বাড়িতে হামলা করত। চোরাকারবারিদের সঙ্গে তার চুক্তি ছিল। মালামাল অনুযায়ী টাকা দিতে হতো তাকে। খুলনার বহুল আলোচিত হাজি বাড়ির মালিক হাজি রায়েজউদ্দিনের মালিকানাধীন ‘রাহেজউদ্দিন বিড়ি কোম্পানি’ বাসেরকে চাঁদা দিয়ে ভারত থেকে চোরাইপথে বিড়িপাতা আনত। এছাড়া চোরাকারবারি, পাক ওয়াটার ওয়েজের মালিক চাউলা হাসান ও মুসলিম লীগের নেতা, পরবর্তীকালে আইয়ুব সরকারের যোগাযোগমন্ত্রী সবুর খানের  কাছ থেকে বাসির ডাকাত নিয়মিত টাকা আদায় করত বলে জানা যায়।
১৯৬৭ সালে নিজ গ্রামে এক আত্মীয়ের বিশ্বাসঘাতকতায় ডাকাত সর্দার বাসের ধরা পড়ে। তার সমসাময়িক ডাকাত ছিল ফর্সা চেহারার বাগেরহাট জেলার শরণখোলা উপজেলার রায়েন্দার রাঙ্গা আছেদ, মতিউল্লাহ, কালে খাঁ, গনি মিয়া, মন্টু প্রমুখ। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় কিছু ডাকাত মুক্তিবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। এদের অধিকাংশই ডাকাতি ছাড়তে বাধ্য হয়।
পরবর্তীকালে ১৯৭৩ সালের দিকে গণবাহিনীর কিছু সদস্য সুন্দরবনে আশ্রয় নেয়। ১৯৭৪ সালে দণি অঞ্চলে দুর্ভি ছড়িয়ে পড়লে পুনরায় ডাকাতের উপদ্রব শুরু হয়। তখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে রান্না করা ভাত পর্যন্ত ডাকাতি হতো। সাতীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার বড়দলের ধামরাইল্যা এলাকার ডাকাত ওসমান খাঁর নাম বেশ আলোচিত ছিল। ১৯৭৬ সালের দিকে সে ডাকাতি ছেড়ে বাড়িতে থাকা শুরু করে। পুলিশের হাতে আটকের পর ৭ বছর জেল খেটে আবার পুরনো পেশায় ফিরে যায়। ম্যাট্রিক পাস এই ডাকাত সুন্দরবনের পশ্চিম বন বিভাগের বড়দল, আশাশুনি, এলাকার অনেক ডাকাতির পর আবার ধরা পড়ে জেলে যায়। ডাকাতির আগে সে গরানকাটা বাওয়ালির কাজ করত।
রাজনৈতিক প্রভাব আর অত্যাধুনিক অস্ত্রের বলে ডাকাতরা এখন সুন্দরবন বন বিভাগের সমান্তরালে ওই এলাকার শাসন চালাচ্ছে। শোষণ করছে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের কয়েকশ কোটি টাকার সম্পদ। ৬শ বর্গকিলোমিটার আয়তনের সুন্দরবন রার জন্য বন বিভাগের রয়েছে ১২শর মতো বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মচারী, প্রায় দেড়শ বিভিন্ন ধরনের জলযান আর বনরীদের হাতে রয়েছে মান্ধাতা আমলের আগ্নেয়াস্ত্র। বর্তমানে অবস্থা আরো ভয়াবহ। দণি-পশ্চিম অঞ্চলসহ সারা দেশের অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসীর নিরাপদ আশ্রয় এখন সুন্দরবন। যে কোনো ধরনের অপকর্ম করে তারা আশ্রয় নেয় সুন্দরবনে।
২০০১ সালে ডাকাতদের হাতে অপহৃত হয়েছিল মৌয়াল মোশাররফ। ১০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পেয়েছিল। সেদিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানালেন, সুন্দরবনের দোবেকির দুইবাঁক দেিণ মালঞ্চ নদীতে তাদের নৌকা ১০-১২ জন ডাকাত দখল করে নেয়। তিন দিনের মধ্যে মোশাররফের সহযোগীরা ১০ হাজার টাকা দিয়ে তাকে উদ্ধার করে  নেবে এই শর্তে তাকে রেখে দেয়  ডাকাতরা। এ খবর পেয়ে কোস্টগার্ডের টহল জোরদার হলে ডাকাতরা তাদের স্থান পরিবর্তন করে।
সোহরাব হাজি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দোসর ‘পিস কমিটি’র সদস্য। একসময় জামায়াতের রাজনীতি করলেও এখন বিএনপির স্থানীয় নেতা। ২০০৪ সালের জুলাই মাসের দিকে যৌথবাহিনী তার বাড়ি থেকে ৪০ লাখ টাকার চোরাই কাঠ উদ্ধার করে। তার দোসর মালেক নামের এক খোঁড়া ডাকাত। সোহরাব এক সময় বাওয়ালি গোমস্তা ছিল। গোলখালির পিস কমিটির চেয়ারম্যান হয় ১৯৭১ সালে। এরপর বাঘ-কুমিরের চামড়া বিক্রি, খুন, রাহাজানি, জমি দখল তার পেশায় পরিণত হয়। বাওয়ালি ও মৌয়াল দলের মহাজন হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কেউ প্রমাণ হাজির করতে সাহসী হয় না। নবতিপর এই অপরাধী এখনও সক্রিয়।
বৈদ্যমারী এলাকার ভয়ঙ্কর প্রকৃতির ডাকাত মকিম। ৪০-এর দশকে সে ডাকাতি শুরুর পর  থেকে ৭০-এর দশকে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত সে প্রবল প্রভাবের সঙ্গে ডাকাতি করে গেছে। বাওয়ালি কূপ মুক্তিপণ আদায়, বনে আগুন লাগিয়ে বন বিভাগের জমি দখল, হিন্দুদের জমি দখলের মতো অপকর্মে সে সিদ্ধহস্ত ছিল। এসব কারণে সে কয়েকবার জেলও খেটেছে। তার সঙ্গী হিসাবে ছিল কালু ডাকাত, আয়ুব আলী, সাত্তার, নওয়াব আলী প্রমুখ। এর মধ্যে কালু নিজেই একটি বাহিনী তৈরি করে এখন সুন্দরবনে ডাকাতি করে বেড়ায়। রায়েন্দার তাফালবাড়ি এলাকার ডাকাত কালু সর্দারের নৃশংসতার উদাহরণ হলো বলেশ্বর নদীর মোহনায় ইলিশ ধরা ট্রলারে ডাকাতি করার পর সহযোগীদের চোখের সামনে কোনো একজন জেলেকে হত্যার পর উৎসব করে তার লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া। এছাড়াও সে জ্ঞানপাড়ায় হরিণ শিকারিদের সঙ্গে মাসোহারা চুক্তি করে হরিণের চামড়া বিক্রির পর কমিশন নেয়। ২০০৩ সালে কালুবাহিনীর প্রধান কালু ডাকাত ধরা পড়লেও তার সঙ্গীরা প্রতাপের সঙ্গে এখনো ডাকাতি করে চলেছে। এর আগে সে ১৯৯০ সালে একবার ধরা পড়লেও দুর্বল সা্েযর কারণে জেল থেকে বেরিয়ে আসে। তার টাইগার বাহিনীতে মেয়ে সদস্য ছিল বলেও জানা গেছে।
সুন্দরবনের বানিয়াখালী রেঞ্জ এলাকায় স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহাবুদ্দিন ও তার ভাই দীর্ঘদিন ধরে ডাকাত দল পোষে। এছাড়া খুলনার দাকোপ উপজেলার নলিয়ান রেঞ্জ এলাকার মন্টু বৈদ্যের সঙ্গে ডাকাতদের সখ্য রয়েছে বলে জানা গেছে। একই উপজেলার শাহাবুদ্দিন মোল্লা ছাড়াও সুন্দরবন সংলগ্ন কয়েকটি উপজেলার বেশ কয়েকজন জনপ্রতিনিধি ও চিংড়িঘের মালিকের বিরুদ্ধে লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্র ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। খুলনা সিটি করপোরেশনের লবণচরা এলাকার কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন মুক্তার আগ্নেয়াস্ত্র সুন্দরবনে ভাড়ায় ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফাঁসিতে মৃত শীর্ষ খুনি এরশাদ শিকদার, র‌্যাব হেফাজতে ক্রসফায়ারে নিহত খুলনার খালিশপুরের বিএনপি নেতা আরিফুল আলম আক্কাসের মালিকানাধীন আগ্নেয়াস্ত্র এখন হাতবদল হয়ে সুন্দরবনে ডাকাতিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। আক্কাসের স্ত্রী এখন সুন্দরবনকেন্দ্রিক অস্ত্র ব্যবসা পরিচালনা করছে বলে জানা গেছে।
১৯৮৮ সালের দিকে পিরোজপুরের রাজাপুর গ্রামের বাসিন্দা বাদল পেয়াদা, ডাকাত সর্দার খালেক, মানিক ও রুস্তম গড়ে তোলে দোয়েল বাহিনী। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জ এলাকায় বন বিভাগের মরাভোলা কূপের দুই কর্মীকে হত্যা করে রাইফেল লুটের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ ঘটে এই দোয়েল বাহিনীর। এই বাহিনীর স্থায়ী অবস্থান ছিল লাঠিমারা কোকিলবুনিয়া এলাকায়। বন বিভাগের তাম্বুলবুনিয়া টহল ফাঁড়ির কাছাকাছি এই বাহিনী কয়েকটি বাইন গাছে উঁচু মাচা তৈরি করে আস্তানা গড়ে। পুলিশ ও বন বিভাগের যৌথ অভিযানে মারা পড়ে এক ডাকাত। নষ্ট হয় বাদল বাহিনীর আস্তানা। উদ্ধার করা হয় ১২ বস্তা চাল, আটা, বিস্কুটসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি। বাদলের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে তার নিজের গ্রামের লোকজন তার দুচোখ উপড়ে ফেলে।
সুন্দরবনের দুবলারচরের নারকেলবাড়িয়া বনের আরেক জমিদার কবিরাজ তালুকদার। জঙ্গলে ডাকাতি, মাছধরা ট্রলার মেরে দেওয়া, বহিঃসমুদ্রে জেলেদের ওপর হামলা, কাঠ চুরি, হরিণ ধরে চামড়া ও মাথা বিক্রি, মাছ চুরিতে সিদ্ধহস্ত ছিল তার বাহিনী।
সুন্দরবনের পশ্চিম বিভাগের সাতীরা এলাকায় ‘মোতালেব বাহিনী’প্রধান মোতালেবের বাড়ি বাগেরহাট জেলার মংলা উপজেলার চাঁদপাই গ্রামে। তার বিরুদ্ধে ১১টি অস্ত্র মামলা রয়েছে।  মোতালেবের বর্তমান ঠিকানা নড়াইল সদর থানায়। সেখানে তার বউ-ছেলেমেয়ে থাকে। মোতালেবের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড আনসার ওরফে বাকি বিল্লাহর বাড়ি খুলনার দিঘলিয়া থানার লাখোহাটি গ্রামে। মোতালেব
বাহিনীর অন্য সদস্যরা হচ্ছে মোশারফ হোসেন ওরফে মীর মল্লিক ওরফে কপি ভাই। বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল থানার ঝনঝনিয়া গ্রামে। মোঃ ইসমাইল ওরফে কালু, বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল থানার শ্রীফলতলা গ্রামে। মোঃ সুলতান, মোহাম্মদ হোসেন, মোঃ মনসুর এই তিন বনদস্যুর বাড়িও বাগেরহাটের রামপালে। বাকি ওরফে যুবরাজ, সিরাজুল, আমজাদ হোসেন ওরফে বাপ্পির বাড়ি সাতীরার শ্যামনগরে। মোঃ ফজলুর রহমান ওরফে ফজলে, ইমান ফকির, মাহবুব ফকির, হায়দার ফকিরের বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল থানার চন্দ্রখালী গ্রামে। মতি চেয়ারম্যান, করিম, বারিকের বাড়ি খুলনার কয়রা উপজেলায়।
থানা সূত্রের দাবি, মোতালেব বাহিনীর বর্তমান অস্ত্র সরবরাহকারী খুলনা শহরের মোঃ মাসুদ ওরফে গলাকাটা মাসুদ ওরফে ডাকবাংলোর মাসুদ। এ মাসুদ খুলনার দৌলতপুর কলেজের এক পিয়নের ছেলে। এ ছাড়া খুলনার বাগমারার কামরুল ইসলাম, খালিশপুরের পাখি, খানজাহান আলী থানার মোঃ মেহেদি হাসান ডালিম ওরফে রাশেদ অস্ত্র সরবরাহ করে বলেও বিভিন্ন সূত্র দাবি করেছে। মোতালেবের অস্ত্র জোগানদাতা বেশ কয়েকজন ইতিমধ্যে ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, খুলনা সিটি করপোরেশনের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার আসাদুজ্জামান লিটু। কমিশনার  লিটুর লোকজন সরাসরি স্পিডবোটযোগে সুন্দরবনের ডাকাত মোতালেব বাহিনীকে অস্ত্র পৌঁছে দিত। এছাড়া আরেক অস্ত্র সরবরাহকারী বেড়ে বাবু ও খুলনার মোঃ টগর ডিবি পুলিশের হাতে ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে। মোতালেবের স্ত্রী টগর  বেগমের হাতে বর্তমানে মোতালেব বাহিনীর সব অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ। উল্লেখ্য, মোতালেব ২০০৩ সালে যৌথবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। তার অপর সহযোগীদের ধরতে ব্যর্থ হয় যৌথবাহিনী। সে সময় স্বীকারোক্তিতে মোতালেব জানায়, সুন্দরবনের পারকোষ্টা ক্যাম্পে বন বিভাগের টহল ফাঁড়িতে তার কিছু অস্ত্র রাখা আছে। এ খবরের ভিত্তিতে যৌথবাহিনী মোতালেবের ৩৫টি ভারী অস্ত্রের মধ্যে ১১টি উদ্ধার করে। যৌথবাহিনীর সদস্যরা চলে গেলে মোতালেব বাহিনীর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড তার জামাই হাফিজ বন বিভাগের পারকোষ্টা ক্যাম্পের ইনচার্জসহ অন্য কর্মচারীদের বেধড়ক মারপিট করে।
সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জ এলাকার করমজল ঢাংমারি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রাজু বাহিনী। বাগেরহাট জেলার মংলা উপজেলার আমতলা গ্রামের মরহুম জালাল মোল্লার ছেলে মোঃ ওলি ওরফে রাজুর বাহিনীতে ২০ থেকে ৩০ জন সদস্য রয়েছে। এর মধ্যে মংলার আমতলার মোঃ ওয়াহিদ মোল্লা, মোঃ জুলফিকার আলী ওরফে গামা, বাকি বিল্লাহ, বাগেরহাটের রামপাল থানার মোঃ মিজান, মওলা ফকির, কালাম ফকির, শুকুর, খোরশেদ, হারুন, মোঃ জাহাঙ্গীর, মোঃ বাবুল অন্যতম।
জানা গেছে, এই বাহিনীর অস্ত্র সরবরাহকারী খুলনার কামরুল ইসলাম, তরিকুল ইসলাম, রিংকু, শহীদুল মেম্বার। এই বাহিনী দিনের বেলায় অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেয়। আর রাতের যে কোনো সময় মন চাইলে টহল অফিসে ঢুকে বন বিভাগের লোকজনকে বের করে দিয়ে ঘুমায়। বনকর্মীদের রান্না করা খাবার খায়। বন বিভাগের কেউ এসব অত্যাচারের প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না। সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের মরাভোলা টহল ফাঁড়ির দুই বনরী প্রতিবাদ করায় ডাকাত বাহিনী তাদের ওপর বৃষ্টির মতো গুলি চালায়। এতে আফছার উদ্দীন নামের একজন বনরী নিহত ও শাহআলম নামের একজন বনরী গুলিবিদ্ধ হন। গুলিবিদ্ধ শাহআলম এখনো সুস্থ হননি।
চাঁদপাই-শরণখোলা রেঞ্জ এলাকায় বিডিআর তমিজউদ্দীন বাহিনী রাজত্ব কায়েম করেছে। বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ থানার ঘুলষেখালি গ্রামের লাল মিয়ার ছেলে তসলিমউদ্দীন বিডিআরে চাকরি করত। বিডিআরের চাকরি ছেড়ে সুন্দরবনের বনদস্যু হয়ে যায়। গড়ে তোলে বাহিনী। এই বাহিনী বিডিআর বাহিনী হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। সে র‌্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হওয়ার পর এই বাহিনীর দায়িত্ব নিয়েছে  সেকেন্ড-ইন-কমান্ড জুলফিকার ওরফে জুলফু।
বাগেরহাটের মংলা থানার জয়মনি গ্রামের হাবিব মাতুব্বরের ছেলে জুলফু ‘বিডিআর বাহিনী’র দায়িত্ব নেয়ার পর এদের দলে নতুন সদস্য যোগ দিয়েছে। জানা গেছে, বিডিআর বাহিনীর সদস্যরা হচ্ছে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের ঘুলষেখালির মোঃ সোহরাব, রামপালের মল্লিকেরবেড় গ্রামের মোঃ বেথার তালুকদার, লিটন তালুকদার, শরণখোলার তালবাড়িয়া গ্রামের মানিক, মোরেলগঞ্জের অর্জনবহর গ্রামের নমির, ছমির, মান্নান, খুলনার রূপসা থানার নিকারিপাড়ার আমির হোসেন ওরফে রাঙ্গা, আফজাল, মোতালেব, সজল, কেরামত, মংলার দেলোয়ার হোসেন। এই বাহিনীর অস্ত্র সরবরাহকারী মোরেলগঞ্জের ফুলহাতা গ্রামের মনিরুজ্জামান, খুলনার দোলখোলা এলাকার টপি, ফারাজিপাড়ার মিঠু।
এদিকে জুলফু বাহিনীর গুলিতে আকাশ বাবু বাহিনীর প্রধান আকাশ বাবু নিহত হলে সেকেন্ড-ইন-কমান্ড অভিজিত আকাশ বাবু বাহিনীর দায়িত্ব নেয়। এই বাহিনী ছাড়াও কাশেম বাহিনী, জহির বাহিনী সুন্দরবনের কালাবগি, নলিয়ান, দাকোপ নিয়ন্ত্রণ করছে। ইতিমধ্যে এসব বাহিনীর বেশ কয়েকজন যৌথ বাহিনীর হাতে আটক হয়ে জেলহাজতে রয়েছে। বনদস্যুতায় ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র ভা-ার এখনো অত।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সুন্দরবনে কর্মরত একজন বন কর্মকর্তা জানান, সরকার যদি তাদের পুলিশ ও র‌্যাবের মতো ক্রসফায়ার দেওয়ার অনুমতি দিত তাহলে ডাকাতের অত্যাচার থেকে রা পাওয়া যেত। প্রাণ বাঁচানোর জন্য কোনো বনরী গুলি চালালে যদি ডাকাত দলের সদস্য নিহত হয়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে জেলে হিসাবে প্রচার করা হয়। তারা উল্টো ফরেস্টারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে।
ওই বন কর্মকর্তা আরো বলেন, আমি যে বিটে দায়িত্ব পালন করছি, এখানে ডাকাতরা এসে আমাদের লোকজনকে ধরে পিটিয়ে বের করে দিত। তারা ক্যাম্প দখল করে বিশ্রাম নিত এবং রান্নাবান্না করে খেত। আমি দায়িত্ব নেয়ার পর ডাকাতরা একবার আমার ক্যাম্পে এসেছিল। আমি তাদের বলে দিয়েছি সিডরে দুবলার চরে ছিলাম। মরতে মরতে বেঁচে গেছি। এখন আমার জীবন হচ্ছে বোনাস। তাই কাউকে ভয় পাই না। আমার এখানে এলে গুলি করে মাথার খুলি উড়িয়ে দেব। এরপর থেকে এখানে আর ডাকাতরা আসেনি। কিন্তু মোবাইলে রাতদিন হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। বন বিভাগের মীরগামারি, নন্দবালা, হারবাড়িয়াসহ বেশ কয়েকটি টহল অফিসে ডাকাতরা বিশ্রাম নেয়। বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো কিছু বলার সাহস নেই।
জানা গেছে, বনদস্যুদের পেছনেও রয়েছে রাজনৈতিক ছত্রছায়া। বন থেকে লুটে আনা টাকার ভাগ প্রশাসন, পুলিশ, কোস্টগার্ড, রাজনৈতিক নেতাকর্মীর পকেট পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তাই বনদস্যুরা কাউকে পরোয়া করে না। বন বিভাগের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীও বনদস্যুদের টাকার ভাগ পেয়ে থাকে। বন রায় কারও একটু মায়াও যেন নেই। গাছ কেটে সাবাড় করছে, তারপরও বন বিভাগ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। বনের ভেতর দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে বনদস্যুরা। কোনো প্রতিকার নেয়ার উদ্যোগ নেই।
বন বিভাগ, কোস্টগার্ড, র‌্যাব, বিজিবি, পুলিশ প্রশাসন কখনো পৃথকভাবে কিংবা যৌথভাবে বনদস্যু দমনে অভিযান চালালেও তা পুরোপুরিভাবে সফল হচ্ছে না। প্রশাসনের কাছে বনদস্যুদের পূর্ণাঙ্গ কোনো তালিকাও নেই। বন বিভাগ ও কোস্টগার্ড সূত্রে জানা গেছে, তাদের যে লোকবল ও জলযান রয়েছে তা সুন্দরবনের বিশাল এলাকার জন্য পর্যাপ্ত নয়। যে কারণে  বনদস্যুদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় না। র‌্যাব-৬-এর ভাষ্যমতে, নিজস্ব কোনো জলযান না থাকায় তারাও সুন্দরবনে অভিযান চালাতে গিয়ে সমস্যার সম্মুখীন হন।
খুলনা রেঞ্জ পুলিশের ডিআইজি মোঃ হিমায়েত হোসেন জানান, তাদের কাছে বনদস্যুদের কোনো তালিকা নেই। তবে বনদস্যুদের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

মুক্তিপণের আধুনিক পথ ‘অনলাইন ব্যাংকিং’

সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরের ডাকাতদের দৌরাত্ম্য উপকূলের মৎস্য আহরণ সঙ্কটে পড়েছে। চলতি শুঁটকি মওসুমে দুবলারচরসহ সুন্দরবন উপকূলের শুঁটকি ব্যবসা ক্রমান্বয়ে ডাকাতদের দখলে চলে যাচ্ছে। ডাকাতরা জেলেদের ওপর হামলা চালিয়ে টাকা লুটে তাদের এজেন্টদের দিয়ে শুঁটকি ব্যবসায় বিনিয়োগ করছে। মুক্তিপণ আদায়ে তারা বেছে নিয়েছে ‘অনলাইন ব্যাংকিং’।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারি দলের স্থানীয় একশ্রেণীর প্রভাবশালী নেতার ছত্রছায়ায় খুলনা, সাতীরা, বাগেরহাটের মংলা ও রামপালভিত্তিক প্রধান প্রধান বনদস্যু বাহিনী এ এলাকার কিছু উঠতি মৎস্য ব্যবসায়ীর মাধ্যমে মাছ ব্যবসায় টাকা খাটাতে শুরু করেছে। একই এলাকার বাসিন্দা হওয়ায় ডাকাত ও তথাকথিত ব্যবসায়ীদের মাঝে গড়ে উঠেছে আঁতাত। খুলনা ও মংলার এই নব্য মৎস্য ব্যবসায়ীরা বনদস্যুদের সহায়তায় সুন্দরবনের দুবলার চর এলাকার আলোরকোল দ্বীপকে তাদের ঘাঁটি হিসাবে গত দুবছরে অবস্থান শক্তিশালী করেছে। চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলের বহরদার ও মৎস্য ব্যবসায়ীদের দীর্ঘকাল ধরে দুবলার চরে যে আধিপত্য ছিল তা ডাকাতরা অনেকাংশে দুর্বল করে ফেলেছে। ফলে সুন্দরবনের শুঁটকি ব্যবসা হাতবদল হয়ে এখন চলে গেছে ডাকাত ও তাদের দোসর তথাকথিত ওই নব্য মৎস্য ব্যবসায়ীদের হাতে।
জানা যায়, দুবছর সুন্দরবনের ডাকাতবিরোধী অভিযান বন্ধ থাকার পর আবার শুরু হয়েছে। গত কয়েক মাসে লোকালয় থেকে দুএকজন ডাকাত ধরা পড়লেও তাদের বিরুদ্ধে ডাকাতি আইনে মামলা না হওয়ায় বনদস্যুদের দাপট বেড়েই চলছে।
গত সেপ্টেম্বরের প্রথমদিকে রাজু
বাহিনীর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড শহীদুল বাগেরহাটের মংলার দিগরাজ থেকে গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া পুলিশ তাকে দ-বিধির ৫৪ ধারায় আদালতে সোপর্দ করলে সে এক মাস পর মুক্তি পায়। কথিত রয়েছে, শহীদুলের মুক্তির ব্যাপারে মংলার একটি প্রভাবশালী মহল তদবির করায় তার বিরুদ্ধে পপাতিত্বমূলক পুলিশি তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হয়।
সুন্দরবনে মাঝে মাঝে আইন-শৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে দুএকজন ডাকাত নিহত হওয়ার ঘটনার পাশাপাশি রয়েছে দুএকজনকে বনদস্যু গ্রেফতারের পর মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ। গত আগস্ট মাসে বাগেরহাটের মংলার অদূরে দাকোপ উপজেলার ঢাংমারি বন অফিসের পাশে বানিশান্তা গ্রাম থেকে আটক ডাকাত সর্দারকে কোটি টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে একটি এলিট বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।
বছর ধরেই সাগর ও সুন্দরবনে জেলেরা ডাকাতদের হুমকির মুখে থাকে। চাঁদা, মুক্তিপণ ও নানা উপঢৌকন দিয়ে উপকূলের মৎস্যজীবীরা সশস্ত্র দস্যু বাহিনীর হাত থেকে জান-মাল বাঁচিয়ে সাগর ও জঙ্গলের নদী-খালে মাছ ধরার সুযোগ পায়। পশ্চিম উপকূলের বিশাল সুন্দরবন, পাথরঘাটা, দণি উপকূলের মহিপুর, কুয়াকাটা, সোনারচর, ভোলা থেকে পূর্ব উপকূলের হাতিয়া, সন্দ্বীপ, বাঁশখালী, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, কক্সবাজার, টেকনাফ, সোনাদিয়া, শাহপুরা এ বিরাট অঞ্চলে হাজার হাজার জেলে মাছ শিকারে ব্যস্ত থাকে। নিরাপত্তার অভাবে জেলেদের সাগর মোহনায়, নদী এবং সুন্দরবনে মাছ ধরা ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, লোকালয়ের প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহল, প্রশাসন, পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রাকারী বাহিনী এবং বন প্রশাসনের প্রত্য ও পরো সহযোগিতায় সাগর-নদী-বনে ডাকাতরা এখন বেপরোয়া।
কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে পশ্চিম সুন্দরবনের রায়মঙ্গল মোহনা পর্যন্ত ডাকাতদের অবাধ রাজত্ব। বিশ্বঐতিহ্য সুন্দরবন এখন ডাকাতদের অভয়াশ্রম। বিভিন্ন মৎস্যবন্দর, লোকালয়ের জেলেপল্লী, শীত মওসুমে সুন্দরবনের দুবলার চর ও সন্নিহিত অস্থায়ী জেলে বসতি এবং খুলনা-সাতীরা-বাগেরহাটের মংলা-রামপাল-শরণখোলা-পিরোজপুরের জিয়ানগর-ভা-ারিয়াসহ উপকূলের শহর-বন্দর-গ্রামগুলোতে এখন সক্রিয় ডাকাত
বাহিনীগুলোর এজেন্টরা। এসব এলাকায় এখন সুন্দরবনে ঢুকতে বন বিভাগের পাশাপাশি বনদস্যুদের এজেন্টদের দেওয়া টোকেন বিক্রি হচ্ছে ৫ থেকে ৫০ হাজার টাকায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চলতি বছর উপকূল এলাকার তিন হাজার ফিশিং বোট থেকে টোকেন দিয়ে ২০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা নেয়া হয়েছে। সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরে ১৫-১৬টি ছোট-বড় বনদস্যু বাহিনী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এর মধ্যে রাজু বাহিনী, জুলফিকার বাহিনী, মোতালেব বাহিনী, আব্বাস বাহিনী, কৃষ্ণ-সাগর বাহিনী, গামা বাহিনী, বাদল বাহিনী সবচেয়ে বেশি তৎপর। এসব বাহিনী স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রসহ রাইফেল, বিদেশি বন্দুক, দেশি পাইপগান ইত্যাদি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত।
কক্সবাজার থেকে সুন্দরবন উপকূল পর্যন্ত বিভিন্ন লোকালয়ের জেলেদের অপহরণের পর সুন্দরবনের ভেতরে জিম্মি করে রেখে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করা হয়। নগদ অর্থ, স্বর্ণালঙ্কার, মোবাইল সেট, খাদ্য, ফল, সিগারেট, ওষুধ, মিনারেল ওয়াটার, কোমলপানীয় এমনকি মদও মুক্তিপণ তালিকায় থাকে। সুন্দরবনে সরাসরি অর্থসহ দ্রব্যাদি গ্রহণ করা ছাড়াও ব্যাংকের অনলাইনে ও টিটির মাধ্যমে মুক্তিপণের অর্থ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর ১শ ৭ জেলেকে গত নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে অপহরণ করা হয়েছিল। তাদের ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে তিনজন ট্রলার মালিক ডাকাতদের হাত থেকে মুক্ত করেন। অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে খুলনায় এ টাকা পাঠানো হয় বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ট্রলার মালিকরা জানান।
সর্বশেষ খবর হচ্ছে, সুন্দরবনের দুবলার চরের শুঁটকিপল্লীসহ বিভিন্ন চরে ২৩ ডিসেম্বর থেকে তিনদিন ধরে বনদস্যু জুলফিকার বাহিনী ও গামা বাহিনী বেপরোয়া তা-ব চালিয়েছে। এ সময় দস্যুদের হামলায় শতাধিক জেলে-বহদ্দার ও বনজীবী আহত হন। বনদস্যুরা কোটি টাকা মুক্তিপণের দাবিতে  কক্সবাজারের বিশিষ্ট হোটেল ব্যবসায়ী ‘হোটেল সেন্টমার্টিন’-এর মালিকের ছেলে দিদারুল ইসলামসহ দুবহদ্দার ও ১৫ জেলেকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে। এ সময় বনদস্যুরা জেলেদের ব্যবহৃত প্রায় ৫০ লাখ টাকার মালামাল লুট করার ঘটনায় দুবলাসহ ওই এলাকার ৯টি চরে শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণে নিয়োজিত সহস্রাধিক জেলে-বহদ্দারের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
দুবলা ফিশারম্যান গ্র“পের চেয়ারম্যান মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন জানান, গত ২৩ ডিসেম্বর থেকে ২৫ ডিসেম্বর সুন্দরবনের শুঁটকিপল্লী দুবলার চর, শ্যাওলার চর, নারকেলবাড়িয়া, আলোরকোল, মেহেরআলীর চর, মাঝেরখাল, অফিসকেল্লাসহ বিভিন্ন শুঁটকিপল্লীতে বনদস্যু জুলফিকার বাহিনী ও গামা বাহিনীর কয়েক দফা হামলায় শতাধিক জেলে ও বনজীবী আহত হয়। এদের মধ্যে পিরোজপুর জেলার তুষখালীর সোহরাব এবং খুলনার পাইকগাছা উপজেলার অলিয়ার ও কৃষ্ণপদের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাদের খুলনার একটি বেসরকারি কিনিকে ভর্তি করা হয়েছে। এ ঘটনার পর দস্যুরা আলোরকোল ও মেহেরআলীর চর জেলেপল্লীতে হামলা চালিয়ে জেলেদের গণপিটুনি দিয়ে মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। এ সময় দস্যুরা মৎস্য ব্যবসায়ী শিবপদ বিশ্বাসের কাছ থেকে নগদ সাড়ে ৬ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় এবং মৎস্য ব্যবসায়ী খোকনের ম্যানেজার কুতুবউদ্দিনকে বেধড়ক মারপিট করে আহত করে। পরে তারা ‘দুবলা ফিশারম্যান গ্র“পের’ অফিসে হামলা চালিয়ে কর্মচারীদের মারধর করে মালামাল নিয়ে যায়। এছাড়া এক সপ্তাহের মধ্যে শুঁটকিপল্লীর প্রতিটি ঘর থেকে ৩০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেছে।
দুবলা শুঁটকিপল্লীর বহদ্দার সিরাজুল ইসলাম জানান, বনদস্যুদের হামলা ও গণডাকাতির পর তাদের কয়েক কোটি টাকার পুঁজি খাটিয়ে স্থাপিত দুবলার শুঁটকিপল্লীতে আতঙ্ক ও হতাশার ছায়া নেমে এসেছে। এদিকে অব্যাহত তা-বে দুবলা শুঁটকিপল্লীর কয়েক হাজার জেলে ও বহদ্দার তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে তিনি জানান।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মিহির কুমার দে জানান, সম্প্রতি সুন্দরবনের গহিনের চর এলাকাগুলোর শুঁটকিপল্লীতে বনদস্যুদের বেপরোয়া মারপিটে অনেক জেলে-বহদ্দার আহত ও দিদারুল ইসলাম নামের কুতুবদিয়া এলাকার এক বহদ্দারকে অপহরণ করেছে বলে তিনি সংবাদ পেয়েছেন।
কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের স্টাফ অফিসার লে. বদরুদ্দোজা জানান, দুবলার চরের শুঁটকিপল্লীসহ বিভিন্ন এলাকায় তিনশতাধিক জেলের ঘরে বনদস্যুরা ডাকাতি, লুটপাট, হামলা ও অপহরণের খবর পেয়ে কোস্টগার্ডের একটি টিম সিজিএস-বগুড়া নামের একটি জাহাজ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বনদস্যুদের দমনে অভিযান শুরু করেছে।
কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের কমান্ডার মোঃ শহীদ জানান, সুন্দরবনের শুঁটকিপল্লীতে হামলার ঘটনা জানতে পেরে তাদের একটি দল ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছেন। পরিস্থিতি মোকাবেলায় দুবলার চরে তাদের
আরেকটি ইউনিট বাড়ানো দরকার বলে তিনি জানান।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: