• Categories

  • Archives

  • Join Bangladesh Army

    "Ever High Is My Head" Please click on the image

  • Join Bangladesh Navy

    "In War & Peace Invincible At Sea" Please click on the image

  • Join Bangladesh Air Force

    "The Sky of Bangladesh Will Be Kept Free" Please click on the image

  • Blog Stats

    • 277,638 hits
  • Get Email Updates

  • Like Our Facebook Page

  • Visitors Location

    Map
  • Hot Categories

এখন আর আশা করতে ভরসা পাই না

Source : Bangladeshi-Americans Living in New England

স্কুলের শেষের দিকে এবং কলেজেরও গোড়ার দিকে ইংরেজি নতুন বছর এগিয়ে এলে আমরা খুবই ভাবনায় পড়তাম। বন্ধুদের নতুন বছরের উপহার দিতে হবে। জানাই ছিল, সেটা হবে বই। এবং বন্ধুদের কে কী ধরনের বই পড়তে পছন্দ করেন, সেটাও মোটামুটি জানা ছিল। তবে বইয়ের দামও ধর্তব্যে আনতে হতো। পিতা সীমিত আয় থেকে যে হাতখরচের পয়সা দিতেন, সারা বছর তা থেকে কিছু কিছু জমিয়ে জমিয়ে বিশেষ উপলক্ষে বন্ধুদের উপহারের পরিকল্পনা করতে হতো।

আজকাল আর বোধ হয় তরুণ-কিশোরদের তেমন কোনো সমস্যা নেই। আশির দশকের শেষে ঢাকার এক পরিচিত বাড়িতে একটি বালককে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বড় হয়ে কী হতে চাও? খুবই চটপটে ছেলেটি বলেছিল, সে যে সেনাকর্মকর্তা হবে সেটা আমার জানা উচিত ছিল, কেননা টাকাপয়সা আর ক্ষমতা সবই তো সেনাকর্মকর্তাদেরই থাকে। আরো কয়েক বছর পর আরেকটি বালক বলেছিল, পড়াশোনায় তার আগ্রহ নেই, সে মাস্তান হতে চায়, তাহলে টাকাপয়সার অভাব হবে না। এখন তো সমস্যা নেই। এখন টাকাপয়সা, প্রতিপত্তি, এমনকি খুনখারাবি, ডাকাতি, ধর্ষণ যাবতীয় অপরাধেও পরিত্রাণ পাওয়ার সহজ উপায় শাসক দলের কোনো অঙ্গসংগঠনে যোগ দেয়া, না হয় ক্যাডার হওয়া।

পেছনের দিকে তাকিয়ে যত দূর মনে পড়ে আমি বরাবরই আশাবাদী ছিলাম। রাতে ঘুম আসতে দেরি হলে চিন্তা করতাম পর দিন কী কী ভালো ঘটনা ঘটতে পারে। বয়সের যে পর্যায়ে এখন পৌঁছেছি, এখন আর ব্যক্তিগত কিছু পাওয়ার কিংবা আশা করার বাসনা প্রবল নয়। শৈশব থেকে স্বদেশকে ভালোবেসেছি, বাংলাদেশের স্বাধীনতায়ও কিছু ভূমিকা ছিল। এখন পাওয়ার কিংবা আশা করার ব্যাপারগুলো সবই এ দেশ আর এ দেশের মানুষকে ঘিরে।

জীবনের ৫০টি বছর কাটিয়ে দিলাম লন্ডনে এবং সাংবাদিকতায়। ইউরোপ-আমেরিকার একটা রীতি, নতুন বছর এগিয়ে এলে আসন্ন বছরটির সম্ভাবনা সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী করার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায় রাজনীতিক আর সাংবাদিকদের মধ্যে। চৌকস সাংবাদিকেরা ইনিয়ে-বিনিয়ে বলে যান নতুন বছরে কী কী ঘটবে কিংবা ঘটতে পারে। সাধারণ মানুষের তাক লেগে যায়। এই মানুষগুলো কি ভবিষ্যতের চেহারা আগে থেকেই দেখতে পায়? আসলে সাংবাদিকেরা বছরের পর বছর ঘটনাবলি পর্যবেক্ষণ করেন, পরে সেসব ঘটনার পরিণতিও তাদের ঘাঁটাঘাঁটি করতে হয়। লোকে বলে অভিজ্ঞতা থেকে গাধাও অনেক কিছু শিখতে পারে।

বাংলাদেশকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেছি। কিন্তু ওই যে বয়সের কথা বললাম! এখন আশাবাদী হতে, স্বপ্ন দেখতে ভয় হয়। তা ছাড়া আমাদের অনেকের প্রিয় স্বদেশে এখন যা ঘটছে সেটাকে শুধু দু:স্বপ্নই বলা যায়। দু:স্বপ্নের কালরাত্রিতে সুখস্বপ্ন তো সম্ভব নয়। ইংরেজি নতুন বছরের দ্বারপ্রান্তে এসে যদি কেউ প্রশ্ন করেন পরের বছরটি বাংলাদেশে কেমন যাবে, তাহলে কী জবাব দেবো?

গ্রিক ট্র্যাজেডির কোনো কোনো নাটক পড়েছি। সোফোক্লিসের ইডিপাস রেক্স এবং আন্তিগোনি নাটক দুটো অনুবাদও করেছি। সেসব নাটকের চরিত্রগুলো আগে থেকেই জানত তাদের কপালে কী লেখা আছে। একটু ভেবেচিন্তে কাজ করলে নিষ্ঠুর নিয়তিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়তো তাদের জন্য সম্ভবও ছিল। কিন্তু অন্ধ দার্শনিক টাইরেসিয়াসের মতো জ্ঞানী-গুণীদের পরামর্শ তারা মেনে চলেনি। জেট বিমানের গতিতে তারা সর্বনাশের অতল গহ্বরে ঝাঁপ দিয়েছিল। রাজা থেইয়াসকে জ্যোতিষীরা বলেছিলেন, তার নবজাত পুত্র পিতৃঘাতী হবে, মাকে বিয়ে করবে। রাজা এক মন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন নবজাতককে গোপনে হত্যা করতে। মন্ত্রী নিজ হাতে সুদর্শন শিশুটিকে হত্যা করতে পারেননি, মরুভূমির এক পর্বতগুহায় রেখে এসেছিলেন­ এ আশায় যে নেকড়ে, বাঘ কিংবা শেয়াল তাকে খেয়ে ফেলবে।

কিন্তু নেকড়ে, বাঘ কিংবা শেয়াল সে শিশুকে খায়নি, এক মেষপালক তাকে উদ্ধার করে করিন্থ দেশে নিয়ে গিয়েছিল। বড় হয়ে সেই শিশু দিগ্বিজয়ী রাজা হলো, অজান্তে পিতাকে হত্যা করে তার রাজ্যও দখল করেছিল এবং মা রানী জোকাস্ত্রাকে বিয়ে করেছিল। অনেক পরে রাজা ইডিপাস যখন প্রকৃত সত্য জানতে পারেন তখন অনেক বিলম্ব হয়ে গেছে, ইডিপাসের বংশের রন্ধে রন্ধে তখন দেবতাদের অভিশাপ ঢুকে গেছে, সর্বনাশ ঠেকানো তখন আর সম্ভব ছিল না।

একাত্তর সাল বাংলাদেশের জন্য ছিল দু:স্বপ্নের বছর, রক্তদান, নির্যাতন ও অপমানের বছর। আঘাত যখন নেমে আসে নেতাও তখন ছিলেন অনুপস্খিত। কিন্তু জাতি হতোদ্যম হয়নি। কে কোন দলের কিংবা কোন পক্ষের সে প্রশ্ন সে দিন কেউ জিজ্ঞেস করেনি। আমরা সবাই জেনেছিলাম, আমরা সবাই স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি, আমাদের হাতে আছে একতার অমোঘ অস্ত্র। সুতরাং জয় আমাদের হবেই।

কিন্তু যে অমোঘ অস্ত্র বলে আমাদের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল সে অস্ত্রটিই আমরা হেলায় ছুড়ে ফেলে দিয়েছি। ঈর্ষা আর প্রতিহিংসা বাংলাদেশকে কোথায় টেনে নামিয়েছে পেছন ফিরে সে দিকে তাকিয়ে দেখার সময়ও ক্ষমতালিপ্সুদের নেই। বিধাতার সবচেয়ে বিস্ময়কর সৃষ্টি মানুষের মন। উত্তাল সমুদ্রের সাথে যুদ্ধ করে সে বেঁচে থাকে। বিজয় যদি লক্ষ্য হয়, তাহলে মহাশূন্য বিচরণও তার সাধ্যায়ত্ত হয়। কিন্তু জাতি যদি লক্ষ্য হারিয়ে ফেলে, আত্মকলহ আর গৃহবিবাদে গা ভাসিয়ে দেয়, তাহলে কে তাকে টেনে তুলবে?

আজকের বাংলাদেশ সব হারানোর দেশ। এ দেশকে সোনার বাংলা বলা এখন তাকে চূড়ান্ত বিদ্রূপ করারই শামিল। আমরা যুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছি একটি শোষক ও অত্যাচারী শক্তির রাহুমুক্ত হতে। সে দিন যদি বলা হতো, আমরা শুধু শৃঙ্খল পরিবর্তন করছি, প্রভু বদল করে নতুন প্রভুকে ডেকে আনছি, তাহলে আপনি কিংবা আপনার পিতা-মাতা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতেন?

স্বাধীনতার কাছ থেকে কী প্রত্যাশা ছিল জাতির? একটি শোষণবঞ্চিত সমাজ হবে, সে সমাজের মানুষ অবাধে তার গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করবে, দেশে আইনশৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত হবে, মানুষ শান্তিতে নিজের ও পরিবারের জন্য একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারবে­ এটাই কি স্বাধীনতা যুদ্ধের পেছনের চালিকাশক্তি ছিল না? এই লক্ষ্য, এই প্রত্যাশাগুলোর কোনটি বিগত ৪০ বছরে অর্জিত হয়েছে? পরবর্তী ৪০ বছরেও কি লক্ষ্যগুলো অর্জিত হবে?

দুই বছর আগে দেশে একটি সরকার এসেছিল। তারা মানুষের সব প্রত্যাশা রাতারাতি বাস্তবায়িত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তারা বলেছিল দেশ থেকে দুর্নীতি দূর হবে, প্রতিহিংসার পরিবর্তে সমঝোতার রাজনীতি আসবে বাংলাদেশে। শুধু ১০ টাকা কেজি মূল্যের চালই নয়, সব অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়সীমার মধ্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি এরা দিয়েছিল। প্রতিশ্রুতিগুলো অবশ্যই উচ্চগ্রাম ও শ্রুতিমধুর ছিল। কিন্তু দুই বছরের মাথায় এসে সেসব প্রতিশ্রুতির কোনটি পালিত হয়েছে বলে আপনি মনে করেন? ডিজিটাল বাংলাদেশ হবে, বাংলাদেশের অবশিষ্ট জমিটুকুনজুড়ে নতুন নতুন অপ্রয়োজনীয় বিমানবন্দর তৈরি হবে, বাংলাদেশ সারা বিশ্বের অনুসরণীয় দেশ হবে­ এসব বড় বড় কথার ফানুস এবং আকাশকুসুম কল্পনা দিয়ে মানুষকে বোকা বানানোর চেষ্টা চলছে। ওদিকে শুধু সরকারেরই নয়, গোটা দেশের পায়ের তলা থেকে মাটি যে সরে যাচ্ছে সে দিকে কারো খেয়াল নেই।

বিচার যেখানে অত্যাচার মাত্র

বিচার বলতে কী বুঝি আমরা? সাধারণ মানুষ এটাই বোঝে যে, বিচার ন্যায্য হলে সমাজে শৃঙ্খলা বজায় থাকবে, হানাহানি দূর হবে, মানুষ শান্তিতে বেঁচে থাকতে পারবে। কিন্তু বিচার যেখানে দলে-দলে গোষ্ঠীতে-গোষ্ঠীতে হিংসা ও প্রতিশোধ বাসনা ছড়িয়ে দেয়, সমাজকে হানাহানি ও রক্তপাতে জর্জরিত করে, সে বিচার বিচার নয়­ অত্যাচারের চরমতম দৃষ্টান্ত। অথচ আজকের বাংলাদেশে হচ্ছে ঠিক তাই। প্রায় চার দশক পরে নতুন করে মুজিব হত্যার বিচার হয়েছে। বিদেশ থেকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ফিরিয়ে এনে ফাঁসি দেবেন বলে আইনমন্ত্রী যে লম্ফঝম্ফ করছিলেন তার কী হলো? সাধারণ মানুষ দেখছে যে অযথা দেশে সহিংসতা ও হানাহানি বেড়ে গেছে, আর কোনো লাভ হয়নি।

তথাকথিত একটা আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল হলো যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বাহানায়। কিন্তু বাংলাদেশ ছাড়া আর কোন জাতি আছে সেই আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে? কানা ছেলের পদ্মলোচন নাম একেই বলে! এখন আবার সে ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধের বিচার হবে না, বিচার হবে মানবতাবিরোধী অপরাধের। বিচার করবে কারা? সরকারের ঘাতকদের তথাকথিত ক্রসফায়ারে হাজার প্রাণ বিনাশ করাকে যারা অন্যায় মনে করে না, তারা। সাধারণ মানুষ দেখছে নানা অজুহাতে সরকারের রাজনৈতিক বিরোধীদের ধরে ধরে জেলে পোরা হচ্ছে, জেলে তাদের স্খান করার জন্য আওয়ামী লীগের ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তদেরও কারাগার থেকে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। বিরোধীদলীয় নেতানেত্রীদের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ সাজানো হচ্ছে, ওদিকে খোদ প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ১৫টি দুর্নীতির মামলাসহ আওয়ামী লীগ সদস্যদের বিরুদ্ধে সাত হাজারের কাছাকাছি দুর্নীতির মামলা, এমনকি প্রমাণিত কয়েকটি খুনের ও ডাকাতির মামলাও তুলে নেয়া হয়েছে। আদালত ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোকে নিয়মিত সরকারের প্রতিশোধ বাসনা চরিতার্থ করার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।

মানুষ শুধু নিজেকে নিয়েই বেঁচে থাকে না। তার প্রত্যাশা ভবিষ্যৎ বংশধর এবং উত্তরসূরিদের ঘিরেও। বাংলাদেশে আজ যারা উঠতি প্রজন্ম, ভবিষ্যতে নেতৃত্ব যাদের হাতে বর্তাবে বলে আশা করা হয়, তাদের আমরা কী শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছি আজ? এ প্রবন্ধের গোড়ার দিকেই দু’টি বালকের উদ্ধৃতি দিয়েছিলাম। পরিস্খিতি এখন তার চেয়ে অনেক বেশি শোচনীয়। তরুণ সমাজের একাংশকে এখন শিক্ষা দেয়া হয়েছে একটি ফ্যাসিবাদী শক্তিকে গদিতে বহাল রাখার বিনিময়ে যেকোনো অবৈধ পন্থায় অর্থোপার্জন, চুরি-ডাকাতি, খুন, রাহাজানি ও ধর্ষণও গ্রহণযোগ্য বিবেচিত। এই প্রজন্ম যে দিন দেশকে নেতৃত্ব দেবে সে দিন বাংলাদেশে বাস করার অভিরুচি আপনার হবে কি?

নতুন প্রজন্মকে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে যে বাস্তবে কী ঘটেছে সেটা ইতিহাস নয়, ইতিহাস হচ্ছে নির্যাতন-নিপীড়ন করে, লগি-লাঠি-বৈঠা দিয়ে মানুষের মাথা ফাটিয়ে জোর করে একটা মতবাদকে জাতির ঘাড়ের ওপর চাপিয়ে দেয়া। যে সত্য তাদের গায়ে লাগে সে সত্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখার জন্য বাজার থেকে বই তুলে নেয়া হচ্ছে, বিদেশ থেকে বই ছেপে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে, মিডিয়াকে নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।

বিচারের সাহস ওদের নেই

আদালত এখন সরকারের হাতের লাঠি। সে লাঠি উদারভাবে প্রহার বৃষ্টি করে সরকারের বিরোধী দলের মাথায়, শাসক দলের সমর্থকদের দিয়ে। ভারাক্রান্ত আদালত এখন সংবিধান পরিবর্তনের কাজে ব্যবহার হয়। কিন্তু সত্য ও ন্যায়নীতি বর্জিত রায়ে পরস্পর বিরোধিতা থাকবেই। আদালত পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করেছে, এক লাফে ফিরে গেছে বায়াত্তরের সংবিধানে। কিন্তু স্বৈরাচারী বাকশালী চতুর্থ সংশোধনী, রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী তৃতীয় সংশোধনী এবং জননির্যাতক দ্বিতীয় সংশোধনী যে অন্যায় ছিল সে কথা স্বীকার করার সৎসাহস আজকের শাসকদের নেই। একই আদালত যখন বলছে যে, বাঙালি জাতীয়তাবাদ বলে কিছু নেই, আছে শুধু ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, তখন সে কথায় তারা কান দেয় না।

সপ্তম সংশোধনী বাতিল করে হাইকোর্ট রায় দিয়েছিল ২৬ আগস্ট। রায়ে আরো বলা হয়েছিল যে, নির্বাচিত সরকারকে ভয় দেখিয়ে ক্ষমতা হাতিয়ে নেয়ার জন্য এরশাদের বিচার করতে হবে। এরশাদ তখনই চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলেন হাইকোর্টকে এবং সরকারকে, বলেছিলেন কে তার বিচার করে তিনি দেখে নেবেন। এত দিন পরে সে রায়ের পূর্ণ বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু হাইকোর্টের যে রায় সরকারের স্বার্থের অনুকূলে যায় শুধু সে রায়ই সরকার গ্রহণ করে। জনসাধারণ জানে যে, এরশাদের বিচার করার সৎ সাহস এ সরকারের হবে না।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যার ষড়যন্ত্রে কে কতখানি জড়িত ছিলেন আজো প্রমাণিত হয়নি। মাথায় গুলি করে জেনারেল মঞ্জুরকে হত্যা করা হয়েছে প্রকৃত ষড়যন্ত্রকারীদের সংরক্ষণ দেয়ার লক্ষ্যে। কিন্তু দেশ ও জাতির সন্দেহ আছে। তা ছাড়া আওয়ামী লীগ নেত্রী এরশাদের সামরিক অভ্যুথানকে সমর্থন দিয়েছিলেন, এরশাদের সাজানো নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন এবং ভুয়া সংসদে যোগ দিয়েছিলেন, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সারা দেশ যখন স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, আওয়ামী লীগ নেত্রী তখন প্রধানত সে আন্দোলনে বিভক্তি সৃষ্টিরই চেষ্টা করেছেন। অন্যথায় সে সামরিক স্বৈরতন্ত্র ৯ বছর স্খায়ী হতে পারত না। এরশাদের বিচার হলে শাক দিয়ে ঢেকে রাখা বহু মাছ আবার লাফ দিয়ে বেরিয়ে আসবে।

সত্যকে মিথ্যা প্রচারণার আড়ালে ঢেকে দেয়ার নতুন প্রয়াস শুরু হয়েছে এখন। প্রচার হচ্ছে যে, মোশতাক আর জিয়ার কাছ থেকে এরশাদ তার সামরিক অভ্যুথানের অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন। এরশাদ পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে উচ্চপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন, আইয়ুব খান ও ইয়াহিয়া খানের স্বৈরতন্ত্রে সেনাকর্মকর্তাদের প্রচণ্ড দাপট তিনি দেখেছেন। তার পরও যদি তাকে নির্বোধ শিশু বলে দেখানোর চেষ্টা হয় তাহলে সে চেষ্টার পেছনে কিছু সত্যতা থাকা অবশ্যই প্রয়োজন ছিল।

সত্যবিকৃতি ও শুভঙ্করের ফাঁকি

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট অভ্যুথান করেছিল কয়েকজন সেনাকর্মকর্তা। সেনাবাহিনীকে বঞ্চিত করে রক্ষী বাহিনীকে প্রাধান্য দেয়ায় সেনাবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা অংশ খুবই ক্ষুব্ধ ছিল। রিপ্যাট্রিয়ট অফিসারদের নিয়েও আরো অভ্যন্তরীণ টানাপড়েন ছিল সেনাবাহিনীতে। সবচেয়ে বড় কথা, দেশব্যাপী কুশাসন, অর্থনৈতিক সঙ্কট, দুর্ভিক্ষ এবং দুর্নীতি নাগরিক হিসেবেও সেনাবাহিনীকে ক্ষুব্ধ করেছে। সবচেয়ে বড় কথা, বাকশালী পদ্ধতি জারি করে স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ অনুসারী সেনাসদস্যরা মেনে নিতে পারেননি। অভ্যুথান হয়েছিল সে জন্য। সে অভ্যুথান খন্দকার মোশতাক করেননি। সে দিন সকাল ৮টায় বিদ্রোহী অফিসাররা মোশতাককে তার বাড়ি থেকে শাহবাগের ব্রডকাস্টিং হাউজে নিয়ে আসে। কিন্তু সোয়া ১১টার আগে তিনি প্রেসিডেন্ট হতে রাজি হননি। তার আগে সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল শফিউল্লাহ, নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম এইচ খান, বিমান বাহিনীর প্রধান এ কে খন্দকার, বিডিআর প্রধান জোনারেল খলিলুর রহমান এবং পুলিশ প্রধান ও রক্ষী বাহিনীর উপপ্রধান ব্রডকাস্টিং হাউজে এসে মোশতাককে দায়িত্ব নিতে রাজি করান। তারা তার প্রতি আনুগত্যের শপথ নেয়ার পরই মোশতাক রেডিওতে ঘোষণা দেন যে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার হাতে নিয়েছেন। উপরোল্লিখিত অফিসাররা জানতেনই না কারা অভ্যুথান ঘটিয়েছিল। তখনকার সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহ কখনো দাবি করেননি যে মোশতাক সে অভ্যুথান ঘটিয়েছিলেন। তা ছাড়াও মফিজ চৌধুরী ও মনোরঞ্জন ধরসহ মুজিবের মন্ত্রিসভার আটজন সদস্য মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন।

সরকারের সঙ্কীর্ণ দৃষ্টির প্রচারবিদরা এ সত্যও চাপা দিতে চাইছেন যে, মোশতাক আর জিয়ার মাঝে আরেকটি সামরিক অভ্যুথান করেছিলেন ভারতপন্থী বলে বিবেচিত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফ এবং সেদিন দিল্লিতে উল্লাস সৃষ্টি হয়েছিল, সাউথ ব্লকে মিষ্টি বিতরণ করা হয়েছিল। সরকারের প্রচারবিদরা আরো গোপন করার চেষ্টা করছেন যে, জেনারেল জিয়াউর রহমান কোনো অভ্যুথান করেননি। খালেদ মোশাররফ ৩ নভেম্বর তাকে গৃহবন্দী করে কড়া সামরিক পাহারায় রেখেছিলেন। খালেদ মোশাররফের হত্যার পর ৭ নভেম্বর সিপাহিরা বিদ্রোহ করে জিয়াকে মুক্ত করে এবং সেনাসদর দফতরে নিয়ে যায়। প্রকৃত সত্য এই যে, দিল্লিতে পৌনে ছয় বছর অবস্খানের পর দেশে ফিরে এসে আওয়ামী লীগ নেত্রী তার পিতার হত্যার পর যারাই সে সঙ্কটপূর্ণ সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন তাদের সবাইকেই (একমাত্র ভারতপন্থী খালেদ মোশাররফ ছাড়া) খুনি বলে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছিলেন, গালাগালি করেছেন।

আওয়ামী লীগের প্রচারবিদরা কিভাবে ইতিহাসকে বিকৃত করেন এই হচ্ছে তার দুয়েকটি নমুনা। এবং সে বিকৃত ইতিহাসই তারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শেখাতে চান। সন্দেহ নেই, যে ঘৃণা আর প্রতিহিংসা দিয়ে তারা বর্তমানের বাংলাদেশের আকাশ-বাতাস বিষাক্ত করে তুলেছেন, সে হানাহানি তারা ভবিষ্যতের জন্যও পাকাপোক্ত করে রেখে যেতে চান। কথা হচ্ছে, ভুল ইতিহাস যাদের শেখানো হচ্ছে তারা ইতিহাসের প্রকৃত মূল্যায়ন করবে কী করে? এবং ইচ্ছাকৃত কতগুলো মিথ্যার বোঝা জাতির ঘাড়ের ওপর চাপিয়ে রাখার পরিণতি কোনোমতেই শুভ হতে পারে না। নিমগাছ রোপণ করে আম ফল পাওয়ার আশা কিছুতেই করা যায় না।

এ জন্যই বলছিলাম, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হওয়ার ভরসা এখন আর পাই না। আমার প্রজন্মের আমরা যারা এ অবস্খার প্রতিকারের সময় আর বেশি পাবো না আজ তাদের মনে বহু সংশয়। ফল যেখানে শূন্য সেখানে অন্তবিহীন ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতার কি সত্যি কোনো প্রয়োজন ছিল? তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দুয়েকটা হক কথা বলে যেতে পারি। সত্যিকারের স্বাধীনতাকে ফিরে পেতে হলে আবার একাত্তরে ফিরে যেতে হবে, জাতীয় ঐক্যকে ফিরিয়ে আনতে হবে। ঐক্যে ভাঙন সৃষ্টির চেষ্টা যারা করছে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।

লেখক : বিবিসি বাংলা বিভাগের সাবেক প্রধান

**************************************************************************************

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: